কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শুরু হলো শেখ হাসিনার এবারের সরকারের দ্বিতীয় বছর

প্রকাশিত : ১২ জানুয়ারী ২০১৫

উত্তম চক্রবর্তী ॥ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতার এক বছর পূর্ণ করল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। ভয়াল সহিংসতা ও শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ আর দেশকে অগ্রগতির মিছিলে শামিল করার পাশাপাশি সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়েই ক্ষমতার দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করল দলটি। সাফল্য-ব্যর্থতার বিচারে দ্বিতীয় মেয়াদের এই একটি বছর বেশি সময় না হলেও পার্থক্য হচ্ছে অতীতে কোন সরকারকে ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই এমন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে হয়নি। তবে এই এক বছরে সাফল্য-ব্যর্থতার পরিমাপে সরকারের ঝুলিতে সাফল্যের পরিমাণ যে কয়েকগুণ বেশি, তা চরম সমালোচকও মানতে বাধ্য হচ্ছেন। মাত্র এক বছরেই বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে স্থাপিত করেছেন শেখ হাসিনার সরকার।

ঠিক এক বছর আগের আজকের এই দিনে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের সময় দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, বরং ছিল অত্যন্ত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। আওয়ামী লীগ সরকারকে বছরের শুরুতে বিএনপি-জামায়াত সৃষ্ট দুর্যোগের ঝড়ের মুখেই যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল। দেশের গণতন্ত্র থাকবে, নাকি অসাংবিধানিক শাসন আসবেÑ জনমনে সৃষ্ট এমন প্রশ্ন-শঙ্কা আর বিএনপি-জামায়াতের দানবীয় সন্ত্রাস-সহিংসতার মধ্যে ক্ষমতা গ্রহণ করে বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার মাত্র এক বছরেই দেশের মানুষকে শুধু শান্তি আর স্বস্তিই দেননি, এক বছরেই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে টেনে তুলে প্রগতি ও অগ্রগতির মিছিলে শামিল করতে সক্ষম হয়েছে। সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করে নিশ্চিত অসাংবিধানিক শাসনের হাত থেকে বাঙালী জাতিকে মুক্তি দিতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অতীত সরকারগুলোর এক বছর পূর্তিতে ব্যর্থতা ও অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বিরোধী পক্ষ দেশব্যাপী ঝড় তুললেও এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। দ্বিতীয় মেয়াদের বর্তমান সরকারের প্রথম এক বছরের হিসাব মেলাতে গিয়ে চরম বৈরি বিরোধী পক্ষও বড় ধরনের ব্যর্থতার দালিলিক প্রমাণ হাজির করতে পারেনি দেশবাসীর সামনে। বরং অধিকাংশ মানুষের মূল্যায়নে বেরিয়ে এসেছে, ক্ষমতার বিগত ৫ বছরের মতো বর্তমান সরকার প্রথম থেকেই সঠিক পথে এগুচ্ছে। এক বছরে ব্যর্থতার চেয়ে সরকারের সাফল্যের পাল্লা কয়েকগুণ ভারি। জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধানও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এই এক বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খেরো খাতায় সাফল্যের পাল্লা ভারি হলেও ছাত্রলীগসহ দলের বিশৃঙ্খল কিছু নেতাকর্মীদের অনৈতিক কর্মকা-, নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার এবং লতিফ সিদ্দিকীসহ দলের কিছু সিনিয়র নেতার অতিকথনে ক্ষমতাসীন সরকারকে অনেক সমালোচনা হজম করতে হয়েছে।

এ দেশে সাধ্য ও সাধ্যে, চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা খুব সহজ নয়। তবে দেশবাসী খোলা মনে প্রথম বছরের ভাল কাজের প্রশংসা এবং মন্দ কাজের সমালোচনা করলেও সরকারের ওপর তাদের আস্থা এতটুকুও কমেনি, বরং বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসম সাহস, দক্ষতা, দুরদৃষ্টি ও অসীম ধৈর্যের সঙ্গে দেশ পরিচালনার প্রতিটি পদক্ষেপকে যেমন দেশের মানুষ এখনও অধিকমাত্রায় সমর্থন করছে, ঠিক তেমনি এক বছরে শক্তহাতে বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতা-নাশকতা দমন করে দেশে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, দেশ-বিদেশের সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মাত্র এক বছরেই ছয় শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা এবং সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ দমনে শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানকে দেশের জনগণ নিরঙ্কুশভাবেই অনুমোদন দিয়েছেন। প্রথম থেকেই সঠিক পথে চলায় শেখ হাসিনার সরকারের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে কয়েকগুণ। বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সকল চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে বাকি চার বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণকে দেয়া সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে দেশকে বিশ্বসভায় ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শান্তিময় দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেনÑ এমন আশায় বুক বেঁধেছেন দেশের মানুষ।

আজ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন চৌদ্দ দলীয় সরকার মেয়াদের এক বছর পূর্ণ করে দ্বিতীয় বছরে পা রাখল। বর্ষপূর্তির দিন আজ ঐতিহাসিক সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে জাতির সামনে ঘোষণা করবেন তাঁর সরকারের পরবর্তী বছরের কর্মপরিকল্পনা। তবে যে ক্রান্তিকাল নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল, দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণের দিবসটিতে অন্যরকম এক অস্বস্তিকর পরিবেশে পালন করতে হচ্ছে। পুরো এক বছর রাজনীতির মাঠে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারলেও সরকারের দ্বিতীয় বছর পদার্পণের শুরুতে টানা অবরোধের নামে ফের নাশকতা-সহিংসতা শুরু করেছে বিএনপি-জামায়াত জোট।

ফের বিষবাষ্প ছড়াতে চাইছে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। বিএনপির নেতৃত্বে সকল সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গীবাদী অপশক্তি একাট্টা হয়ে শুরু করেছে সরকারবিরোধী নতুন ষড়যন্ত্র। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভয়াল ষড়যন্ত্র শেখ হাসিনা যেমন শক্তহাতে মোকাবেলা করেছেন, ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপি-জামায়াতের নতুন সরকার উৎখাতের নতুন ষড়যন্ত্রও ভেস্তে দিতে সক্ষম হয়েছে। আজ সরকারের এক বছরপূর্তির দিনে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাপকভাবে উদযাপনের পরিকল্পনা থাকলেও টানা অবরোধের কারণে তা সীমিত করতে হয়েছে সরকারকে।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় গ্রহণের এই এক বছর কেমন ছিল বাংলাদেশ? দশম সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চরম রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বর্তমান সরকার। গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষায় শত প্রতিকূলতা ও বিএনপি-জামায়াতের দানবীয় সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেন শেখ হাসিনার সরকার। ওই নির্বাচনের বর্জনের ডাক দিয়ে বিএনপি-জামায়াত দেশজুড়ে অভাবনীয় সহিংসতা চালায়। কিন্তু ২০১৪ সালের এই দিনে শপথ গ্রহণের পরপরই শক্তহাতে সরকারের হাল ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর সাহসী পদক্ষেপ ও দৃঢ় নেতৃত্বে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের পালে টান পড়ে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ধীরে ধীরে পায়ের নিচে শক্ত মাটির সন্ধান পায়। আর এই একটি বছর ধরেই পুরো রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিল কার্যত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতেই। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট বছরজুড়ে আন্দোলনের হুমকি-ধমকি জারি রাখলেও জনসমর্থন না পাওয়ায় সরকারের ওপর সামান্য চাপ সৃষ্টি করতেও ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ বিএনপি-জামায়াত জোট বছরটি পার করেছে বক্তৃতা-বিবৃতিতে। শেষ সময়ে টানা অবরোধ ডেকে জোটের নেতাকর্মীরা ঘরে বসে থাকায় তাও কার্যত ব্যর্থ হয়ে গেছে।

৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে অস্বস্তি ছিল, ক্ষমতা গ্রহণ করেই প্রধানমন্ত্রীর সফল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ সফরের মাধ্যমে তা দূর করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু তাই নয়, সিপিএ ও আইপিইউ’র মতো বিশ্বের শীর্ষ দুটি সংস্থার প্রধানের পদে বাংলাদেশের দুই প্রার্থীকে বিজয়ী করে সারাবিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বের ১৮৮টি দেশ বাংলাদেশের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে বর্তমান সরকারের প্রতি তাঁদের আস্থার বহির্প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে যে ১৫টি রায় হয়েছে, তার মধ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রথম বছরেই রায় হয়েছে ছয়টি। আর ছয়টি রায়েই একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী কামরুজ্জামানের মৃত্যুদ- আপীল বিভাগে বহাল থাকলেও রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ না হওয়ায় অপেক্ষমাণ আছে দ- কার্যকর। তবে সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একে একে আদালতের সব রায় কার্যকর করবে, দ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিতে ঝুলতে হবে, এ নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে কোন শঙ্কা নেই।

বর্তমান সরকারের এক বছর পূর্তির সাফল্যে-ব্যর্থতার খেরো খাতায় উঠেছে এসেছে- বছরটি ছিল বাংলাদেশের সাফল্যের বছর। সরকারের গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের ফলে গত মেয়াদের পাঁচ বছর এবং এই মেয়াদের প্রথম বছরে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিশ্বের সামনে রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া পাঁচটি দেশের একটি-বাংলাদেশ। দেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের ওপরে, মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯০ ডলারে। ৫ কোটি মানুষ নিম্ন আয়ের স্তর থেকে মধ্য আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে। ছয়গুণ রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে। রফতানি আয় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। বিদ্যুত উৎপাদনের সক্ষমতা এখন ১৩ হাজার ৩৮৩ মেগাওয়াট। নিজস্ব অর্থায়নই বর্তমান সরকার বহুল আলোচিত পদ্মা সেতুর নির্মাণ করছে। দেশকে গড়ে তুলেছে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে। সব মিলিয়ে মাত্র এক বছরেই বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে।

এতো সাফল্যে সত্ত্বেও পুরো এক বছরে বিএনপি-জামায়াত মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারলেও নিজ দলের মধ্যে সৃষ্টি কোন্দল-দ্বন্দ্ব আর সিনিয়র নেতাদের লাগামহীন মন্তব্যে শুধু অস্বস্তিই নয়, প্রায়শই বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। এই এক বছরে সরকারবিরোধী বিএনপি-জামায়াত জোটের জোরালো কোন আন্দোলন ছিল না, ছিল না রাজপথে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ। তা সত্ত্বেও সরকারী দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মকা- আর মন্ত্রী-এমপিদের একের পর এক লাগামহীন বেফাঁস মন্তব্যে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে সরকারকে। একটি সঙ্কট কাটতে না কাটতেই মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য আর নিজ দলের মধ্যে বিবাদমান দু’গ্রুপের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ জন্ম দিয়েছে সরকারের জন্য নতুন সঙ্কটের। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে খোদ নিজ দলের ভেতর থেকেই। তাই দ্বিতীয় বর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধান চ্যালেঞ্জই হচ্ছে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিজদের দলে চেইন অব কমান্ড গড়ে তোলা।

প্রকাশিত : ১২ জানুয়ারী ২০১৫

১২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: