কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

৪৪ বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত : ১১ জানুয়ারী ২০১৫

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন আগামীকাল। ১২ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পা দিচ্ছে ৪৪ বছরে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারি ৪টি বিভাগ পরিসংখ্যান, গণিত, ভূগোল ও অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে। তবে ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি এর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। তাই ১২ জানুয়ারি দিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক সদস্যের কাছে অত্যন্ত আনন্দের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর এ দিনটি বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে উদ্যাপন করে। এ দিনে বিভিন্ন কর্মসূচী ছাড়াও প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা বসে।

অবস্থান ॥ ঢাকা মহানগরী থেকে প্রায় ২০ মাইল (প্রায় ৩২ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। নাগরিক সকল সুযোগ-সুবিধা সংবলিত এ ক্যাম্পাস সাভার ও নবীনগরের মাঝ বরাবর অবস্থিত। ক্যাম্পাসের গা ঘেঁষে দক্ষিণে দিকে রয়েছে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, উত্তরে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, সম্মুখে ডেইরী ফার্ম ও যুব উন্নয়ন কেন্দ্র।

ইতিহাসের পাতা থেকে ॥ ১৯৬৭ সালে মোট ৭৪৮.১৪ একর জমি নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের। ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ৪ জানুয়ারি ক্লাস শুরু এবং ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত এটি একটি প্রকল্প আকারে পরিচালিত হয়। ১৯৭৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ জারি করা হয়। পরবর্তীতে এর নামকরণ হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষা পদ্ধতি ও বিভাগসমূহ ॥ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ বছর মেয়াদী স্নাতক ও এক বছর মেয়াদী স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। এছাড়া উচ্চতর শিক্ষার জন্য এমফিল, পিএইচডি প্রোগ্রামেরও ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে এখানে ৬টি অনুষদ ৩৪টি বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ কলা ও মানবিক অনুষদ : নাটক ও নাট্যতত্ত্ব, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, দর্শন, প্রতœতত্ত্ব, বাংলা, ইতিহাস, ইংরেজী, জার্নালিজম এ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ ও চারুকলা বিভাগ। গাণিতিক ও পদার্থ বিষয়ক অনুষদ : কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান এবং ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগ। সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ : অর্থনীতি, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা, নৃবিজ্ঞান, ভূগোল ও পরিবেশ, সরকার ও রাজনীতি এবং লোকপ্রশাসন বিভাগ। জীববিজ্ঞান অনুষদ : উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, ফার্মেসি, বায়োটেকনোলজি এ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিয়ারিং, মাইক্রোবায়োলজি এবং পাবলিক হেলথ এ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগ। আইন অনুষদ : আইন ও বিচার বিভাগ। বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ : এ্যাকাউন্টিং এ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং, ফিন্যান্স এ্যান্ড ব্যাংকিং। এছাড়া ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি ও ইনস্টিটিউট অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন রয়েছে।

স্থাপত্য-ভাস্কর্য ॥ লাল সিরামিক ইটের তৈরি ইমারতগুলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাতন্ত্র্যতা দিয়েছে। সাড়ে ৭শ’ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও এক সময় বিশ্ববিদ্যালয় বলতে বুঝাত বর্তমান ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগ ভবনকে যেখানে একাডেমিক, প্রশাসনিকসহ যাবতীয় কর্মকা- পরিচালিত হতো। একমাত্র আবাসিক আল বেরুনী হলে থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী। প্রয়োজনের তাগিদে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ভবন গড়ে উঠেছে ১৫০টি। যার মধ্যে ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে ১৬টি আবাসিক হল, শিক্ষক-অফিসারদের ৫০টি, কর্মচারীদের ২৭টি আবাসিক ভবন, ১৮টি প্রশাসনিক ও ২০টি একাডেমিক ভবন এবং টিএসসি, অডিটেরিয়াম, ক্যাফেটেরিয়া, মসজিদ, ক্লাবসহ আরও ১০/১৫টি ভবন। এছাড়া রয়েছে বাঙালী আন্দোলন সংগ্রামের প্রতীক তিনটি সুদৃশ্য স্থাপনা ভাস্কর্য যা ক্যাম্পাসের শৈল্পিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত হয়েছে অমর একুশে। নির্মিত হয়েছে ৭১ ফুট উঁচু দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনার। শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য সংশপ্তক নির্মিত হয়েছে এখানে। পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগরে রয়েছে প্রায় দুই হাজার দর্শক একত্রে বসার ব্যবস্থা বিশিষ্ট নয়নাভিরাম মুক্তমঞ্চ। রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র।

সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে ॥ বছরের প্রায় সব সময়ই সাংস্কৃতিক উৎসবে মুখরিত থাকে জাবি ক্যাম্পাস। তাই সাংস্কৃতিক রাজধানী নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি দেশব্যাপী। এখানে রয়েছে দেড়শ’র মতো সংগঠন। এর মধ্যে ১০৪টি টিএসসি তালিকাভুক্ত। সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী সংগঠনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার, ধ্বনি, জলসিঁড়ি, আনন্দন, গীতনাট, কালবৈশাখী, ইউনিভার্সিটি সিনে ক্লাব, বটতলার বইচিত্র, সুস্বর, চলচ্চিত্র আন্দোলন, স্টুডেন্টস্ ফিল্ম সোসাইটি, জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ, ফটোগ্রাফিক সোসাইটি। সংস্কৃতি চর্চা ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, জাবি প্রেসক্লাব, রোটারেক্ট ক্লাব অব জাহাঙ্গীরনগর, জাহাঙ্গীরনগর সায়েন্স ক্লাব, লিও ক্লাব অব জাহাঙ্গীরনগর, জেইউডিএস, জুডো প্রভৃতি। সংগঠনগুলো বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে নিজেদের অনুষ্ঠান ছাড়াও সপ্তাহব্যাপী নাট্যোৎসব, নাট্যপার্বণ, সাংস্কৃতিক মেলা, আবৃত্তি উৎসবের আয়োজন করে থাকে। ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে যারা অংশ নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে প্রয়াত বিশিষ্ট নাট্যকার অধ্যাপক ড. সেলিম আল দীন, অধ্যাপক আফসার আহমদ, অধ্যাপক হারুন অর রশীদ, হুমায়ুন ফরিদী, শহীদুজ্জামান সেলিম, হুমায়ুন রশীদ, মেহেদী হাসান, ফারুক আহমেদ, সুমাইয়া সিমু, সজল, হিমেল, মম, বিন্দু প্রমুখ। সংস্কৃতি চর্চার জন্য এখানে রয়েছে ২০০০ আসন বিশিষ্ট সেলিম আল দীন মুক্ত মঞ্চ। রয়েছে ৭০০ আসনবিশিষ্ট সুবৃহৎ জহির রায়হান অডিটেরিয়াম।

আন্দোলন সংগ্রামে ॥ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা এবং মুক্তিযুদ্ধ একই সূত্রে গাঁথা। সে সময় অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ নেয়। এছাড়া পরবর্তীতেও বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখে। ১৯৮২ সালের আন্দোলন, ’৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের আন্দোলন ও ’৯০-এর গণআন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা রাজপথে আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ॥ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধার ঘেঁষে সবুজ বনানীর মাঝে অবস্থিত ক্যাম্পাসটি সহজেই নজর কাড়ে পথচারী ও পর্যটকদের। ক্যাম্পাসের পিচঢালা রাস্তার দু’ধারে বেড়ে ওঠা বৃক্ষ আর লাল ইমারতগুলো গ্রাম ও শহরের মধ্যে এনেছে অপূর্ব সমন্বয়। রয়েছে জানা অজানা অসংখ্য প্রজাতির গাছ গাছালি। রাতের সুনসান নীরবতা ভেঙ্গে চলে পাখ-পাখালির আড্ডা। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ১৬-১৭টি লেক। এসব লেক শীতের সময় থাকে অতিথি পাখির দখলে। এসব দৃশ্য উপভোগ করতে দেশী-বিদেশী অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমায় সারাবছর।

কিছু সমস্যা ॥ দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও সিট সঙ্কট বেড়েই চলেছে। কিছু কিছু বিভাগে রয়েছে সেশনজট। প্রথম বর্ষে ভর্তির আসন সংখ্যা খুবই সীমিত। সময়োপযোগী অনেক বিভাগ এখনও চালু হয়নি। সমস্যায় জর্জরিত মেডিক্যাল সেন্টার। পর্যাপ্ত বইপত্র ও প্রকাশনা নেই লাইব্রেরীতে। এছাড়াও শিক্ষক-ছাত্রদের রাজনৈতিক দলাদলি ও হানাহানির কারণে বেশ কিছু দিন বন্ধ ছিল ক্যাম্পাস। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ হয় বিঘিœত। এ বিষয়গুলোর যাতে পুর্নরাবৃত্তি না ঘটে এমনই আশা শিক্ষার্থীদের।

দীপঙ্কর দাস

প্রকাশিত : ১১ জানুয়ারী ২০১৫

১১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: