মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

একুশ শতক ॥ জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনা

প্রকাশিত : ১১ জানুয়ারী ২০১৫
  • মোস্তাফা জব্বার

॥ ছয় ॥

উইকিপিডিয়ায় জ্ঞানভিত্তিক সমাজকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, A knowledge society generates, processes, shares and makes available to all members of the knowledge that may be used to improve the human condition. (http://en.wikipedia.org/wiki/ Knowledge_society)

এর সহজ মানে হলো, জ্ঞানভিত্তিক সমাজে মানুষের জীবনমান উন্নত করার জন্য জ্ঞান উৎপন্ন হয়, সকলে সেই জ্ঞানের অংশীদারি হয় এবং সকলের জন্য সেটি সহজলভ্য হয়। এতে খুব স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, এটি তথ্য সমাজও নয়। তথ্য সমাজের সঙ্গে এর পার্থক্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজের আরও একটি সংজ্ঞা পাওয়া যায় বিশ্ব বিজ্ঞান ফোরামের ওয়েবসাইটে। সেখান বলা আছে, A knowledge-based society is an innovative and life-long learning society, which possesses a community of scholars, researchers, engineers, technicians, research networks, and firms engaged in research and in production of high-technology goods and service provision. It forms a national innovation-production system, which is integrated into international networks of knowledge production, diffusion, utili“ation, and protection. Its communication and information technological tools make vast amounts of human knowledge easily accessible. Knowledge is used to empower and enrich people culturally and materially, and to build a sustainable society.

(http:/ww/w.sciforum.hu/previous-fora/2003/permanent-update/knowledge-based-society.html)

সাইটটিতে খুব স্পষ্ট করে বলা আছে যে, প্রাচীনকাল থেকেই জ্ঞানকে সীমিত করে বন্দী করে রাখা হতো। জ্ঞানভিত্তিক সমাজে সেই ব্যবস্থার বিপরীত অবস্থা সৃষ্টি করছে। সাইটটিতে আরও বলা হয়, In a knowledge-based society 1) all forms of knowledge (scientific, tacit, vernacular, embedded; practical or theoretical, multisensorial or textual, linearly/hierarchically organi“ed or organi“ed in network structures) are communicated in nwe ways; 2) as the use and misuse of knowledge has a greater impact than ever before, equal access to knowledge by the population is vital; 3) information accessibility should not be a nwe form of social inequality; 4) closing the growing gap between developed and developing countries must be a top political priority—no one can be left behind; 5) as knowledge cannot be understood without culture, research on the interface between vernacular and scientific knowledge must be developed; 6) access to knowledge should be considered as a right and should be protected from short-term industrial interests limiting this access; 7) there must be a continuous dialogue between society and science, thus promoting scientific literacy and enhancing the advising role of science and scholarship; 8) scientific discourse should stop being gender-blind, barriers that prevent more women from choosing science careers and reaching top positions should be overcome; 9) the young generationÕs interest in science and commitment to the knowledge-led future of their countries should be stimulated by introducing innovative teaching methods, and by changing the image of the scientist, with the help of the media and through involved mentorship

মোট নয়টি বিষয়ে খুব স্পষ্ট করে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। এর মাঝে লুকিয়ে থাকা শঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। ওয়েবসাইটটিতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের নৈতিকতার বিষয়টি নিয়েও কথা বলা হয়েছে। ১) Knowledge and society form a partnership: science needs to work in harmoû with and for society; science and scientific knowledge must remain ÒhumanÓ regarding community and environment, including moral responsibility and safeguarding humanityÕs cultural and linguistic heritage as well as diversity in creativity. 2) The call is for global ethics in the pluralist society, to enable the individual to exist in a local/regional as well as in a national community at the same time, inclusive of using his/her vernacular, national, and the international language. 3) It is also an ethical dimension of research to concern ourselves with the rights of and obligations towards other living beings in the biosphere.

ইউনেস্কো যারা ২০০৩/২০০৫-এর তথ্যসমাজ সম্মেলনের অন্যতম সহায়ক তারা ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের রূপরেখার একটি খসড়া প্রকাশ করেছে। এর গ্রন্থিক হলেনÑ রবিন ম্যানসেল ও গ্যাটেন টেমব্লে।

http://en.unesco.org/post2015/sites/post2015/files/UNESCO-Knowledge-Society-Report-Draft—11-February-2013.pdf wj‡¼ i‡q‡Q, Aû vision of knowledge societies must affirm the core aspirations for peaceful and sustainable knowledge societies in a way that acknowledges the interests of all stakeholders. It is essential to recall that knowledge societies are concerned with human development, not only with technological innovation and its impacts.

বস্তুত পক্ষে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নিয়ে সুদীর্ঘ আলোচনা করার সুযোগ আছে। আইটিইউ-এর তথ্য সমাজ সম্মেলন থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল রূপান্তর পর্যন্ত সকল বিষয়ই এর আওতায় আসবে। একইসঙ্গে ২০০৩ সালের তথ্য সমাজ ঘোষণা থেকে শুরু করে এই সমাজ গঠনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করতে হবে। আমরা ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করতে পারব।

যে কেউ বিস্মিত হতে পারেন যে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার মতো একটি লক্ষ্য শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক দলিলে কেমন করে যুক্ত করলেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের অনুচ্ছেদ ১১ তে টেলিমেডিসিন প্রচলনের কথা বলা হয়েছে। তবে এর বিস্তারের সময়সীমা বা অন্যান্য প্রসঙ্গ তাতে আলোচিত হয়নি।

২০০৮ সালে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে আরও অনেক কথা বলা হয়েছিল। সরকারের করণীয় বিষয়গুলো বস্তুত অনেক বেশি স্পষ্ট ছিল। এবার সেই ধারাটি অব্যাহত নেই। মাত্র দুটি উপ অনুচ্ছেদে তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিষয় বর্ণিত হবার কথা নয়। সরকারের বহমান কার্যক্রমগুলোর কিছুটা বিবরণ ইশতেহারে থাকতে পারত। যাহোক ইশতেহারে খুব সংক্ষেপে যেসব প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে সেগুলোর প্রায় সবগুলোই দৈনন্দিন কাজের কথা। হাইটেক পার্ক করা, সফটওয়্যার রফতানিতে সহায়তা করা, থ্রিজির পর ৪ জি চালু করা এসব একটি সরকারের রুটিন কাজ। ক্ষমতায় থাকলে এসব রুটিন কাজ সরকারকে করতেই হবে। বরং সরকারের কোন কোন কাজ যে করা হয়ে গেছে সেটি ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়নি। আওয়ামী লীগের জানা উচিত ছিল যে, ইতোমধ্যেই সরকার ৪ জির লাইসেন্স প্রদান করেছে এবং এটি চালু করা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

২০০৮ সালে যেহেতু আওয়ামী লীগ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার কথা বলেছিল এবং বিগত ৬ বছর ধরে সেই কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে সেহেতু এটি অব্যাহত থাকবে এই কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধন্যবাদ যে, এই কথাটি নতুন করে বলা হয়েছে। কিন্তু গত ৫ বছরে যে প্রশ্নটির উত্তর পুরো দেশের মানুষ খুঁজেছে সেটি হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে দলটি সাধারণ মানুষের সামনে কি বোঝাতে চেয়েছে। সাম্প্রতিককালে সংসদ নির্বাচনের আগে প্রচারিত আওয়ামী লীগের কিছু নির্বাচনী বিজ্ঞাপন দেখে মানুষ এই ধারণা হয়ত করতে পারছে যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে হচ্ছে দ্রুত সেবা পাওয়া এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে পারা। কিন্তু সরকারের মন্ত্রী-নেতারা ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে ক্ষুধা-দারিদ্র্য-দুর্নীতিমুক্ত বৈষম্যহীন যে দেশটির কথা বলেছেন যাকে বঙ্গবন্ধুর একুশ শতকের সোনার বাংলা বলা হয়েছে তার প্রতিফলন পুরো ইশতেহারে হওয়া উচিত ছিল। ডিজিটাল বাংলাদেশ সেøাগান দিয়ে আমরা যেসব পরিবর্তনের কথা বলতে চেয়েছি সেটিও ইশতেহারে উল্লেখ থাকা আবশ্যক ছিল। ডিজিটাল শিক্ষা, ডিজিটাল সরকার, ডিজিটাল জীবনধারা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে স্পষ্ট করে কোন বক্তব্য ইশতেহারে নেই।

ছয় বছরের শাসনকাল-ডিজিটাল বাংলাদেশ কতটা : শেখ হাসিনার তৃতীয়বারের প্রধানমন্ত্রীত্বের এক বছর পার হয়েছে। এই সময়েই তিনি দেশকে সোনার বাংলা বানিয়ে ফেলেছেন এমন দাবি কেউ করবে না। কিন্তু যে ভয়ঙ্করতম সময় আমরা বেগম জিয়া ও মঈন ইউ আহমেদের সময়ে অতিক্রম করেছি তার চাইতে একটি ভিন্ন দিক নির্দেশনা আমরা চারপাশে দেখতে পাচ্ছি। তিনি যখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য বিদ্যুত, নিরাপত্তাসহ প্রতিটি মৌলিক বিষয় নাজুক অবস্থায় ছিল। বিদ্যুত উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং লোডশেডিং সহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে দেশের সর্বত্রই উন্নয়নমুখী প্রকল্পগুলো সচল হয়েছে এবং বিশেষত ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণা বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু হয়েছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যে দেশটিকে আমরা একটি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে দেখতে চাই সেই দেশটির জন্য আমাদের স্বপ্নটা ভীষণ সুন্দর এবং উচ্চাভিলাষী। সেই সুন্দর স্বপ্নটার শেষ প্রান্ত হলো একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি সেই কথাটিই বলেছেন।

আমি ২০২১ সালের বাংলাদেশটাকে এমন দেখি, ‘তখন; স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমি দেখতে পাই, সমাজে জ্ঞানই শক্তির কেন্দ্র হয়েছে বলে অর্থের-বিত্তের চাইতে জ্ঞানের প্রভাব কেবল বেশি নয়, নিরঙ্কুশভাবে সর্বত্র বিরাজ করবে। এখন থেকে সেদিন পর্যন্ত বিদ্যমান সমাজে, রাষ্ট্রে, সংস্কৃতিতে, জীবনাচারে বা জীবনধারায় একটি বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। প্রচণ্ড রূপান্তরের মাঝে সামনে গেছে দেশ-সমাজ। সমাজে জ্ঞানী ও প-িত ব্যক্তিরা সর্বত্র সম্মানিত হচ্ছেন। শারীরিক শক্তিবান ও আর্থিকভাবে ধনবানদের চাইতে মেধার ধারসম্পন্ন জ্ঞানীদের মর্যাদা হয়েছে অনেক বেশি। এই সময়ের মাঝে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই নতুন একদল জ্ঞানকর্মী তৈরি হয়ে গেছে। এই জ্ঞানকর্মীরা সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র নেতৃত্ব দিচ্ছে। পেশিশক্তিও অর্থবিত্তের আধিপত্য বিলীন হয়ে গেছে। জ্ঞানীদের সংখ্যা বেশি হয়েছে বলে সাধারণভাবে বাংলাদেশের একুশ শতকের ইতিহাস তারাই রচনা করছেন। অর্থনীতি ডিজিটাল ও জ্ঞানভিত্তিক হয়েছে বলে কৃষি ও শিল্পের চাইতে মেধাভিত্তিক সেবা ও শিল্প-কারখানার প্রসার বেশি হচ্ছে। কৃষিতে কাজ করছে শতকরা বড়জোর সাত ভাগ লোক। তবে তারাও প্রচলিত অর্থে কেউ অশিক্ষিত নেই। কৃষি তাদের পেশা হয়েছে বটে, কারণ সেই খাতে তারা অনেক বেশি উপযোগ যুক্ত করতে সক্ষম হচ্ছেন। তখন শতকরা ৬০ ভাগের বেশি লোক কাজ করছে সেবাখাতে। সেই সেবাখাত আবার প্রধানত আইসিটিনির্ভর। তবে এই সেবাখাতের পরিধি হয়েছে অনেক সুবিস্তৃত। পর্যটন থেকে শুরু করে গার্মেন্টস পর্যন্ত সকল সেবাখাতের মূল ভিত্তি হয়ে পড়েছে আইসিটি। দেশের কর্মক্ষম জনশক্তির বাকিরা কাজ করছে ২০১০ সালের ধারণার শিল্প-কল কারখানায়। ২০২১ সালের দেশটার মেধাভিত্তিক সৃজনশীলতার রূপটির প্রকাশ ঘটবে আরও নানাভাবে।

ঢাকা, ১০ জানুয়ারি ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক ॥

ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com, ওয়েবপেজ:ww w.bijoyekushe.net,ww w.bijoydigital.com

প্রকাশিত : ১১ জানুয়ারী ২০১৫

১১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: