রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নবরূপে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারী ২০১৫
  • ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেল

মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী থেকে ॥ ইতিহাসসমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংগ্রহশালা রাজশাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর এখন আরও আধুনিক। ঐতিহ্য আর আধুনিতার মিশেলে নতুন রূপে। জাদুঘরের নতুন ভবনে তাই আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে দর্শনার্থীর সংখ্যা।

এক বছর আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ তহবিলের অর্থায়নে ঢেলে সাজানো হয়েছে ঐতিহ্যের স্মারক এ জাদুঘর। বিশেষজ্ঞ স্থপতি ও প্রকৌশলীরা ভবনের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, নতুন প্রদর্শনী ব্যবস্থা স্থাপন এবং কার্যকরী নতুন আলোকব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে অষ্টাদশ শতাব্দীর ভবনের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে এখন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর অনন্য এক সংগ্রহশালা। যুক্তরাষ্ট্রের ৯৪ হাজার ৯৩৩ ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রায় ৭৫ লাখ টাকায় এ কাজ করা হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জাদুঘরের ১ থেকে ৭ নম্বর গ্যালারির মধ্যে বেশ কয়েকটিতে কাচের ফ্রেম বানিয়ে বিভিন্ন মৃৎপাত্র, পুতুল ও ছোট ছোট মূর্তি সাজিয়ে রাখা হয়েছে পরিপাটি করে। এক বছর আগেও এসব মৃৎপাত্র ও মূর্তিগুলোর কোন পরিচয় লিখিত আকারে না থাকলেও তা এখন সংযোজন করা হয়েছে। ফ্রেমগুলোর ওপর ছাদের সঙ্গে সাঁটানো হয়েছে সুরম্য বৈদ্যুতিক বাতি। জাদুঘরের সব মূর্তি ধুয়েমুছে সাফ করা হয় সার্বক্ষণিক। এখন দর্শনার্থীদের সেরা আকর্ষণীয় একটি সংগ্রহশালা।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এই জাদুঘরটির সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ২০১০ সালের শেষের দিকে বড় অঙ্কের অনুদান দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যার পরিমাণ ৯৪ হাজার ৯৩৩ ডলার। সেই টাকায় ২০১১ সালের জুলাই মাস থেকে জাদুঘরের আধুনিকায়নের কাজ শুরু করা হয়। গত দুই বছরে জাদুঘরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক সুলতান আহমেদের তত্ত্ববধায়নে এর কাজ করা হয়।

এই অর্থে জাদুঘরের কয়েকটি ভবনের ছাদ নতুন করে তৈরি করা হয়, মূর্তির জন্য বানানো হয়েছে আধুনিক মঞ্চ। প্রতিটি গ্যালারিতে বৈদ্যুতিক বাতি ও ইলেক্ট্রিসিটির সংযোজন করা হয়। ভবনের মেঝে কংক্রিটের কাজ করা হয়। এছাড়া ভবনের বেশ কয়েকটি দরজায় গ্রিল লাগানো হয়। এতে গবেষণা জাদুঘর অনেকটা ছোঁয়া পেয়েছে আধুনিকতার। জাদুঘরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সুলতান আহমদ বলেন, জাদুঘরের আধুনিকায়নের জন্য যে অনুদান দেয়া হয়েছিল আমরা এরই মধ্যে তার কাজ শেষ করেছি।

দুর্লভ সংগ্রহ : বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সংগ্রহ সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। এখানে হাজার বছর আগের সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। মহেনজোদারো সভ্যতা থেকে সংগৃহীত প্রতœতত্ত, পাথরের মূর্তি, খিস্ট্রীয় একাদশ শতকে নির্মিত বুদ্ধমূর্তি, ভৈরবের মাথা, গঙ্গা মূর্তিসহ অসংখ্য মূর্তি এই জাদুঘরের অমূল্য সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। মোঘল আমলের রৌপ্যমুদ্রা, গুপ্ত সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের গোলাকার স্বর্ণমুদ্রা, সম্রাট শাহজাহানের গোলাকার রৌপ্যমুদ্রা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এখানে প্রায় ৫ হাজার পুঁথি রয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৬৪৬টি সংস্কৃত আর বাকিগুলো বাংলায় রচিত। পাল যুগ থেকে মুসলিম যুগ পর্যন্ত পরিধিতে অঙ্কিত চিত্রকর্ম, নূরজাহানের পিতা ইমাদ উদ দৌলার অঙ্কিত চিত্র এখানে রয়েছে। জাদুঘরটিকে ৭টি প্রদর্শনকোষ্ঠে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম প্রদর্শনকোষ্ঠে নওগাঁর পাহাড়পুর থেকে উদ্ধারকৃত ২৫৬টি ঐতিহাসিক সামগ্রী রয়েছে। দ্বিতীয় প্রদর্শনকোষ্ঠে আছে হিন্দু ও বৌদ্ধদের তৈরি কাঠ ও পাথরের নানা ভাস্কর। তৃতীয় ও চতুর্থ প্রদর্শনকোষ্ঠে রয়েছে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি। পঞ্চম প্রদর্শনকোষ্ঠে আছে বৌদ্ধমূর্তি। ষষ্ঠ প্রদর্শনকোষ্ঠে রয়েছে বিভিন্ন ভাষায় লিখিত পাথরের খ- এবং সপ্তম গ্যালারিতে সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিদর্শনসমূহ। এই জাদুঘরে ১৪ হাজার গ্রন্থ’ সমৃদ্ধ একটি সংগ্রন্থশালাও রয়েছে।

জাদুঘরের ইতিহাস : বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রাজশাহী শহরে স্থাপিত বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। এটি প্রতœ সংগ্রহে সমৃদ্ধ। ১৯১৩ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠলেও বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরটি পরিচালনা করছে।

জাদুঘরটি রাজশাহী মহানগরের কেন্দ্রস্থল হেতেম খাঁয় অবস্থিত। প্রতœতত্ত্ব সংগ্রহের দিক থেকে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংগ্রহশালা। বরেন্দ্র জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় নাটোরের দিঘাপাতিয়া রাজপরিবারের জমিদার শরৎ কুমার রায়, আইনজীবী অক্ষয়কুমার মৈত্র এবং রাজশাহী কলিজিয়েট স্কুলের শিক্ষক রামপ্রসাদ চন্দ্রের উল্লেখযোগ্য আবদান রয়েছে। ১৯১০ সালে তারা বাংলার ঐতিহ্য ও নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গঠন করেন। ওই বছরে তাঁরা রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে ৩২টি দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন সংগ্রহ করেন। এই নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করার জন্য শরৎ কুমার রায়ের দান করা জমিতে জাদুঘরটির নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। নির্মাণ শেষ হয় ১৯১৩ সালে। একই বছরের ১৩ নবেম্বর বাংলার তৎকালীন গবর্নর কারমাইকেল জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন।

এদিকে ১৯১১ সালে কলকাতা জাদুঘর অকস্মাৎ এতে সংরক্ষিত সকল নিদর্শন দাবি করে বসে। তবে তৎকালীন গবর্নর কারমাইকেলের প্রচেষ্টায় ১৯১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বরেন্দ্র জাদুঘরকে এর নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যাপারে স্বাধীকার প্রদান করা হয়। ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবরে জাদুঘরটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে আসে। সেই থেকে পরিচালিত হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। ১৯১৩ সালের ১৩ নবেম্বর বাংলার তৎকালীন গবর্নর কারমাইকেল জাদুঘর উদ্বোধন করেন।

ওই সময় এ জাদুঘরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। এ প্রেক্ষাপটে তৎকালীন রাজশাহী বিভাগের কমিশনার এফজে মোহনের প্রচেষ্টায় বাংলার গবর্নর লর্ড কারমাইকেল বরেন্দ্র জাদুঘর পরিদর্শনে এসে সংগ্রহ দেখে মুগ্ধ হন। ১৯১৪ সালে প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘তারাতন্ত্রম’, ১৯১৯ সালে প্রকাশিত ‘ধাতু প্রদীপ’, ১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘অলঙ্কার কৌস্তুভ’ আজও রক্ষিত আছে এই জাদুঘরে। যা গবেষণার কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাদুঘরটি পরিদর্শন করে ধন্য করেছেন মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

বরেন্দ্র জাদুঘর থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে একটি গ্রন্থাগার উন্মুক্ত রেখে শিক্ষানুরাগী রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল, পিএইচডি ও সাধারণ ছাত্রছাত্রী এবং লেখক, গবেষকদের গবেষণাকর্মে সহায়তা করছে এ জাদুঘর।

প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারী ২০১৫

১০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: