রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘ওই মহামানব আসে’

প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারী ২০১৫
  • ড. হারুন-অর-রশিদ

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ৪৩ বছর পূর্বে এ দিন তিনি পাকিস্তানের বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তিলাভ করে লন্ডন, দিল্লী হয়ে তাঁর আজীবনের স্বপ্নলালিত সদ্য স্বাধীন প্রিয় মাতৃভূমি, বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১০ জানুয়ারি বাঙালীর জাতীয় মুক্তির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয়, ঐতিহাসিক দিন।

বাঙালীর জাতীয় মুক্তির ইতিহাস কম করে হলেও হাজার বছর ধরে বিস্তৃৃত। এ সময় পরিসরে প্রাচীনকালে বিভিন্ন জনপদে বিভক্ত আজকের বাংলাদেশ বঙ্গ থেকে বঙ্গাল বা বাঙ্গালা, সুবে বাংলা, নিজামত, বেঙ্গল, পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান ইত্যাদি নামে ভৌগোলিক সংযোজন-বিয়োজন প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডগত রূপ পরিগ্রহ করে। আর এ অঞ্চলের ‘পাঁচমিশালী’ জনগণ পরস্পরের নৈকট্যে এসে কালক্রমে একক বাঙালী জাতিসত্তায় পরিণত হয়। চার শ’ বছরব্যাপী পাল ও প্রায় পৌনে দু’শ’ বছরব্যাপী দাক্ষিণাত্য থেকে আগত সেন বংশের শাসন ব্যতীত ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু থেকে ১৯৭১ সালের পূর্ব পর্যন্ত এরা তুর্কি, আফগান, মুঘল, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী প্রভৃতি বিদেশী-বিজাতীয় বা ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন হয়। মধ্যযুগে মুসলিম সুলতানী আমল (১৩৩৮-১৫৩৮) এবং মুঘল শাসনের শেষ ভাগে নবাবী আমলে (১৭০৭Ñ১৭৫৭) বাংলা প্রায় স্বাধীন একটি প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল সত্যি, তবে তা স্থায়িত্ব পায়নি এবং শাসক-নৃপতিরা ছিলেন বহিরাগত। ইতিহাসে সর্বপ্রথম বাঙালীদের স্বাধীন জাতি হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে ১৯৭১ সালে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, আন্দোলন-সংগ্রাম-লড়াই আর স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে তাদের ’৭১-এ পৌঁছতে হয়েছে। যার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও বিরামহীন সংগ্রামের ফলে সেটি সম্ভব হয়, তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, ইতিহাসের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বাঙালীর জাতীয় মুক্তির দীর্ঘ আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে তিনি পাকিস্তানী শাসনের ২৩ বছর কঠিন সংগ্রাম করেছেন। শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে ১২ বছর (কখনও একনাগাড়ে ৩ বছর পর্যন্ত) কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়েছেন। দুবার ফাঁসির মঞ্চের অতি কাছ থেকে ফিরে এসেছেন। বাঙালীর জাতীয় মুক্তি অর্জনে ১৯৬৬ সালে ঘোষণা করেন তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচী, যা বাঙালীর ‘বাঁচার দাবি’ বা মুক্তিসনদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বঙ্গবন্ধুকে নিশ্চিহ্ন ও তাঁর ৬ দফা কর্মসূচীকে চিরতরে নিঃশেষ করার উদ্দেশ্যে ১৯৬৮ সালে আইয়ুব সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে আগরতলা মামলা দায়ের করলে সংঘটিত হয় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল বাঙালীদের সব সময়ের জন্য পদানত করে রাখা। বাঙালীরা কখনও পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসক হোক, এটি কিছুতেই তাদের নিকট কাম্য ছিল না। তাই শুরু থেকেই তারা ‘বল প্রয়োগের শাসন’ নীতি অনুসরণ করে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে লৌহ শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের পতনসহ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১৯৭০ সালে নতুন শাসকগোষ্ঠী দেশে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। এটি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রথম সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ নিয়ে হাজির হন। ইতিহাসখ্যাত ৭ই মার্চের ভাষণ। ১৮ মিনিটের ঐ ভাষণের চেতনামূলে ছিল বাঙালীর লালিত জাতীয় মুক্তির আকাক্সক্ষা বা স্বপ্ন ও তা পূরণে দীর্ঘ সংগ্রাম-লড়াই। স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে ভাষণে বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনা ছিল সুষ্পষ্ট। শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা ছিল কৌশলমাত্র। কেননা, বঙ্গবন্ধু বিশ্ববাসীর কাছে বিছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা হিসেবে নিজেকে কোনক্রমে তুলে ধরতে চাননি। স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিশ্ব পরিস্থিতিতে সেটি হত আত্মঘাতী, যেমনটি ঘটেছিল নাইজেরিয়ার বেয়াফ্রার (১৯৬৭-১৯৭০) ক্ষেত্রে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লে এবং মধ্যরাতে তাদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে (ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী তখন ২৬শে মার্চ) বঙ্গবন্ধু সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় ন’ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে প্রধান করে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের (যা ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিত) নেতৃত্বে পরিচালিত ঐ যুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় অর্জিত হয়। যুদ্ধের ন’ মাস বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে বন্দী অবস্থায় থাকলেও, তাঁর নামেই মুক্তিযোদ্ধারা শপথ নেন, যুদ্ধ করেন, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা, বাংলাদেশ সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। অন্যকথায়, তিনি হলেন স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা কোন আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এ ছিল তাঁর জীবন-স্বপ্ন। এ স্বপ্ন পূরণে তিনি একের পর এক সংগ্রাম করেছেন, সর্বপ্রকার নির্যাতন ভোগ করেছেন, এর মধ্যেও সঠিক ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করেছেন। ঘবংিবিবশ ম্যাগাজিনের ভাষায় :

When Sheikh Mujibur Rahman proclaimed the Independence of Bangladesh last week some of his critics declared that ......... But Mujib’s emergence as the embattled leader of a new Bengal “nation” is the logical outcome of lifetime spent fighting for Bengali nationalism, his presence there is no accident.

(Newsweek, 5 April 1971)

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন আমার ঢাকায় উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। যুদ্ধে অংশগ্রহণ শেষে দুই বন্ধুসহ (উভয়ে পরলোকগত) বরিশাল থেকে ঢাকা আসি। কাঠের তৈরি দেড়তলা যে লঞ্চটিতে মেঘনা-পদ্মা বেয়ে গন্তব্যে এসে পৌঁছি এর নাম ছিল যগনু। এরূপ একটি লঞ্চে ঢাকা আসাটা ছিল রীতিমতো এ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু সে দিন তা আদৌ মনে হয়নি। ঢাকা পৌঁছে পরের দিন ১০ জানুয়ারি সকালেই বর্তমান জাহাঙ্গীর গেট সংলগ্ন তেজগাঁ পুরাতন বিমানবন্দরে জড়ো হই। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অতি সম্প্রতি ছেড়ে দেয়া ভবনটি (বর্তমানে বিমানবাহিনীর ব্যবহারাধীন) ছিল বিমানের টার্মিনাল। সেখানে যাওয়ার পথে বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাইরে নাখালপাড়ার সমগ্র এলাকায় বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বিমান আক্রমণে বড় বড় কূপের মতো সৃষ্ট গর্ত ও ছড়িয়ে থাকা গোলা দেখতে পেলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা ছেড়ে যাওয়া লোকজন তখনও ফিরে আসেনি। এতদ্সত্ত্বে¡ও বিমানবন্দরে লাখো জনতার সমাবেশ ঘটে। বেলা আনুমানিক দেড়টার দিকে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের একটি প্লেন ইতিহাসের মহানায়ক ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিমানবন্দরে অবতরণ করে। চতুর্দিক প্রকম্পিত করে স্লোগান ওঠে : জাতির পিতার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তিনি ফিরে এলেন সদ্য স্বাধীন, প্রিয় স্বদেশে।

স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় অর্জিত হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে চতুর্দিকে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল; আমাদের স্বাধীনতা যেন তখনও নিরাপদ ছিল না। কিন্তু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাংলার মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সব শঙ্কা নিমিষে দূর হয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিরাপদ ও পূর্ণতালাভ করে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত ঞযব এঁধৎফরধহ পত্রিকার এক সম্পাদকীয় মন্তব্য ছিল :

Once Sheikh Mujibur Rahman steps out of Dacca Airport the new republic becomes a solid fact.

(The Guardian, 10 January 1972)

অন্যকথায়, আমাদের জাতীয় জীবনে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং জনমানসে এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া তুলে ধরতে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ লেখা কাব্যের ‘ওই মহামানব আসে’ কবিতাটির উদ্ধৃতি যথার্থ হবে। পাঠ করলে মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশেই যেন এটি রচিত। কবিতাটি এরূপ :

ওই মহামানব আসে।

দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে

মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে ॥

সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ,

নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক-

এল মহাজন্মের লগ্ন।

আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত

ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন।

উদয় শিখরে জাগে ‘মাভৈ: মাভৈ:’

নবজীবনের আশ্বাসে।

‘জয় জয় জয়রে মানব-অভ্যুদয়’

মন্দ্রি-উঠিল মহাকাশে ॥

(রবীন্দ্র রচনাবলী, ক্রয়দশ খণ্ড, ঐতিহ্য, পৃ: ১২০)

বিমান থেকে অবতরণের পর জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং অন্যরা একের পর এক তাঁকে পুষ্পমাল্যে ভরিয়ে দেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে ক্ষণিকের তরে বুকে জড়িয়ে ধরিয়ে তাঁদের আবেগ ও আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অতঃপর শুরু হয় রমনা রেসকোর্স মাঠের সংবর্ধনা সভার উদ্দেশ্যে যাত্রা। চতুর্দিক থেকে জনতার বাঁধভাঙ্গা ঢল নামে। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ একটি খোলা ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে জনতার অভিবাদন ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করছেন আর ধীরগতিতে তাঁকে বহনকারী ট্রাকটি সভাস্থলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আমরা জনতার সঙ্গে মিশে গিয়ে ট্রাকের পেছনে পেছনে চলতে থাকলাম। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালকে সামরিক পোশাকে (মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে লেফটেন্যান্ট র্যাংক দেয়া হয়) ট্রাকের এক কর্নারে দ-ায়মান দেখলাম। মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘চরমপত্র’ পাঠক ও পরবর্তীতে আমি বিজয় দেখেছি গ্রন্থের লেখক এম আর আক্তার মুকুলকে দেখলাম বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ট্রাকের সামনে অগ্রসরমান জনতার মাঝ থেকে বাইসাইকেল চালিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সময় নেয় প্রায় আড়াই ঘণ্টা।

জনতার উদ্দেশে সভামঞ্চ থেকে বক্তৃতাদানকালে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ বার বার বাকরুদ্ধ হয়ে আসছিল। রুমাল দিয়ে তিনি চোখ মুছে নিচ্ছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল সংক্ষিপ্ত। পাকিস্তানের কারাগারে সাড়ে ন’ মাস বন্দী ও মানসিক পীড়নের কারণে তাঁর শরীর ভেঙ্গে গিয়েছিল। শারীরিকভাবে তাঁকে অনেক দুর্বল মনে হচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বীর জনতাকে সালাম-অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।” ইয়াহিয়া জান্তা সরকারের তাঁর ফাঁসির হুকুম এবং সে সময়ে নিজের মনের অবস্থা কিরূপ ছিল, তা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন :

... আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের কাছে নতি স্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালী, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। ... তোমরা মারলে ক্ষতি নাই। কিন্তু আমার লাশ বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল মুক্তিযুদ্ধে বিজয় শেষে বীর বাঙালীর স্বগৃহে প্রত্যাবর্তনের অনুরূপ এক দৃশ্য। যে জনগণ বিদেশী-বিজাতীয় দীর্ঘ শাসন-শোষণ-নিয়ন্ত্রণের নাগপাশ ছিন্ন করে জাতীয় মুক্তির আকাক্সক্ষায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লড়াই-সংগ্রাম করতে জানে, যে জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রের বিপরীতে দাঁড়িয়েও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পারে, যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সে জনগণ ও জাতির ক্ষয় নেই। সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে পদ্মা সেতু নির্মাণ তাদের জন্য কোন ঘটনাই নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা হবে বিশ্বজয়ী। বিশ্বের বুকে উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে চির অম্লান হয়ে থাকবে। জয়তু বঙ্গবন্ধু। জয়তু বাংলাদেশ।

লেখক : উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারী ২০১৫

১০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: