আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

লেখকদের লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • মাসুদুজ্জামান

‘যে কোন লেখার আগে আমি একটা স্কিম করি। এমনকি জায়গাটার একটা ম্যাপ এঁকে নিই; কোন কোন চরিত্রের মুখ আঁকি। সবই ঠিক। কিন্তু লেখা শুরু করলে স্কিম ভেসে যায়। চরিত্ররা বাহাদুর হয়ে ওঠে, তাদের সামলাতে হিমসিম খাই। স্কিম করা ও স্কিম ভাঙ্গা- দুটোই আমার কাছে সমান গুরুত্ব পায়।’

-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস [সাক্ষাতকার]

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমাদের প্রধান কথাসাহিত্যিক। শুধু আমাদের নয়, সমগ্র বাংলাসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে যদি বিবেচনা করি, তাহলে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র পাশাপাশি তাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারণ করতে হবে। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর স্থান এখন প্রায় শীর্ষে। অথচ ভাবতে অবাক লাগে, কটা উপন্যাস আর গল্পই বা লিখেছিলেন তিনি? উপন্যাসের সংখ্যা মাত্র দুটি, গল্পের সংখ্যা সবমিলিয়ে সাতাশ আটাশটি। এর বাইরে ইলিয়াসের আছে একটি প্রবন্ধ সঙ্কলন আর কিছু কবিতা। সবমিলিয়ে তাঁকে স্বল্পপ্রসূ লেখকই বলা যায়। কিন্তু সংখ্যায় নয়, গুণগত বিচারে তিনি সবাইকে প্রায় ছাড়িয়ে গেছেন। উপন্যাস রচনায় সমকালে তাঁর সমতুল্য একজন লেখককেও খুঁজে পাওয়া যাবে নাÑ কী বাংলাদেশে, কী পশ্চিমবঙ্গে। গল্প রচনাতেও তিনি প্রথাগত পথ পরিত্যাগ করে একেবারেই নিজস্ব একটি ঘরানা তৈরি করে নিয়েছিলেন।

তাঁর আবির্ভাবের কালটিও আমাদের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যে বছর জন্মগ্রহণ করেন তার চার বছরের মাথায় ভারত-বিভক্তি ঘটে যায়। এই বিভক্তি, বলাবাহুল্য, এই অঞ্চলের মানুষকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল নতুন এক পরিস্থিতির মুখে। বিভক্তির আগেও সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই বঙ্গভূমিতে যে আলোড়ন তুলেছিল, তাঁর দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিল এই অঞ্চলের মানুষের জীবন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তখন যেমন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল, তেমনি প্রধান দুটি সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল তীব্র টানাপড়েন। রাজনৈতিকভাবে ‘স্বাধীনতা’র নামে তখন দেশভাগ হয়ে যায় ঠিকই, তবে অমানবিক বিপর্যয়ের শিকার হতে হয় পূর্ব আর পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু আর মুসলমানদের। ইলিয়াসের রচনাসমগ্রেও এর তীব্র, গভীর প্রভাব পড়েছে।

ইলিয়াস আমাদের মধ্যে আরেক বিস্ময়কর গৌরবদীপ্ত অনুভবের জন্ম দিয়েছেন। সেটি হলো, তিনিই হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রথম সচেতন কথাশিল্পী রাজনৈতিক পটভূমিতে যার রচনায় উপজীব্য হয়েছে বৃহত্তর জনমানুষের জীবন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি যখন লেখালেখি শুরু করেন, ততদিনে বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্প সাবালকত্ব অর্জন করে ফেলেছে। বাংলাদেশের প্রথম দিককার উপন্যাসগুলো লেখা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে কিংবা তার ঠিক পরপর। ইতিমধ্যে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র পেরিয়ে আবির্ভাব ঘটে গেছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তিন আধুনিক ঔপন্যাসিক ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর। বাঙালী মুসলমান লেখকদের পদচারণায় বাংলাদেশের কথাসাহিত্য তখন মুখরিত। প্রচ- না হলেও বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে যুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তরের ধাক্কা বেশ ভালভাবেই এসে লাগে। সেই সঙ্গে তীব্রতা পায় পাকিস্তান আন্দোলন, বেধে যায় দাঙ্গাহাঙ্গামা, ঘটে দেশভাগ। কিন্তু ওই সময়ে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে যাঁরা উপন্যাস লিখছিলেনÑ আবুল ফজল, শওকত ওসমান, আবু রুশদ, আবু ইসহাক, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, রশীদ করীম, সরদার জয়েনউদ্দিনÑ তাঁদের কারও রচনাতেই ওই সময়ের তীব্রমোথিত ঘটনার প্রতিফলন পড়েনি। গ্রামের যে চেহারা পাওয়া গেল তা সামন্তশাসিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন, বিবর্ণ, দুর্ভিক্ষপীড়িত, স্থবির গ্রাম। দ্বন্দ্ববিক্ষুব্ধ রাজনীতির পটভূমিতে ব্যক্তিক অস্তিত্বের অন্তর্গত সঙ্কটকে কোন ঔপন্যাসিকই তাঁদের রচনার বিষয় করে করে তুলতে পারলেন না। ইলিয়াসের ছিল এই সচেতন অভিপ্রায়Ñ বিস্ময় এইখানেই। দুটি উপন্যাসেই তাঁর প্রতিভার অবিস্মরণীয় বিচ্ছুরণ ঘটলÑ কী বিষয়বস্তুতে, কী শৈলীসম্পাতে। চলমান রাজনীতির ধারাপ্রবাহের পটভূমিতে ব্যক্তির অস্তিত্বমোথিত এমন গাথা তিনি রচনা করলেন, যা শুধু বাংলা সাহিত্যেই অনন্য হয়ে ওঠেনি, বিশ্বসাহিত্যেরও হয়ে উঠেছে প্রতিস্পর্ধী।

মিলান কু-েরা একবার বলেছিলেন, উপন্যাসে ‘ব্যক্তির আত্মসত্তার অন্তর্গত জীবনের উন্মোচন’ ঘটিয়ে থাকেন ঔপন্যাসিক। ইলিয়াসও এটা জানতেন, ‘কথাসাহিত্য চর্চার সূত্রপাত মানুষ যখন ব্যক্তি হয়ে উঠছে এবং আর দশজনের মধ্যে বসবাস করেও ব্যক্তি যখন নিজেকে ‘একজন’ বলে চিনতে পারছে তখন থেকে।’ ইলিয়াসের উপন্যাস আলোচনা প্রসঙ্গে হাসান আজিজুল হক জানাচ্ছেন, এই শূন্যতার মাঝে উপন্যাস রচনায় সাহিত্যতত্ত্ব যেমন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে সাহায্য করেনি, তেমনি ‘উপন্যাসের বুর্জোয়া মডেল’ও নয়। বাংলা ঔপন্যাসিকদের কাছ থেকেও কোন সাহায্য পাননি তিনি। উপন্যাস রচনার বিকল্প পথের ধারণাটা তাঁর এসেছিল লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকার কথাসাহিত্য থেকে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ রচনার সময়ে যেমন, তেমনি ‘খোয়াবনামা’র সময়েও। এই আখ্যানদ্বয়ে পশ্চিমী ঘরানার ব্যক্তি নয়, ইতিহাস নয়, জনপদই হয়ে উঠল উপন্যাসের নায়ক। খোয়াবনামা আর চিলেকোঠার সেপাই এই প্রেক্ষাপটেই হয়ে উঠেছে এপিক। আখ্যানের বুনন আর ভাষারীতিই যে কথাশিল্পের মূলকথা নয়, সে তো অনেক আগেই জেনে গেছি আমরা জেমস জয়েসের সূত্রে। সমকাল কীভাবে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে, দেখিয়ে গেছেন জয়েস। একারণেই চিলেকোঠার সেপাইয়ের বয়ানভঙ্গি ও চরিত্রচিত্রণের সঙ্গে জয়েসের ‘ইউলিসিস’র মিল খুঁজে পাওয়া যায়Ñ এর ডিটেইলস ও মনোজাগতিক জৈবরসায়নে। এরপর মার্কেজের মধ্য দিয়ে কিংবদন্তি আর ইতিহাস কিভাবে আঁশটে নোনাধরা অতীত থেকে উঠে এসে সমকালকে স্পর্শ করতে পারে, সেও তো জানা হয়ে গিয়েছিল। ‘খোয়াবনামা’য় তো ঘটল এই বয়ানভঙ্গি ও আখ্যানগঠনের মৌলিক দ্যুতিময় বিচ্ছুরণ। এ কারণেই আমরা অবাক হই না যখন শওকত আলীর স্মৃতিচারণায় শুনি, জয়েস ছিলেন ইলিয়াসের একজন প্রিয় লেখক, তেমনি ছিলেন মার্কেজও।

ইলিয়াস এভাবেই ইতিহাসমোথিত সময়, মানুষ আর সমাজকে উপজীব্য করেছেন তাঁর উপন্যাসে। তিনি যথার্থই জানতেন ঔপন্যাসিকের এটাই মূল কাজ, ‘সমাজের বাস্তব চেহারা তাঁকে তুলে ধরতে হয় এবং শুধু স্থিরচিত্র নয়, তার ভেতরকার স্পন্দটিই বুঝতে পারা কথাসাহিত্যিকের প্রধান লক্ষ্য।’ কিন্তু কিসের টানে এই কাজটি করবেন তিনি? লক্ষ্য সেই ‘ব্যক্তির স্বরূপসন্ধান’ আর সমকালকে এই সময়ের পাঠকের কাছে মূর্ত করে তোলা। তবে ব্যক্তির যে বিকাশ ও পরিণতি তাঁর অনিষ্ট ছিল, তার সবই ঘটেছে ‘ব্যক্তিপ্রেক্ষিত, সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতি’র প্রেক্ষাপটে। ইলিয়াস মনে করেছেন, যে সমাজ অনড়, অচল, স্থবির, গতি নেই, সেই ধরনের স্পন্দনহীন সমাজের রূপকার নন ঔপন্যাসিক। সমাজ উপন্যাসে ‘রক্তমাংস নিয়ে হাজির হয়’ কিনা, আর ব্যক্তি সেই সমাজের মধ্যে ‘উপযুক্ত প্রেক্ষিত পায়’ কিনা, সেই দিকগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এই ভাবনার প্রেক্ষাপটেই তিনি মনে করেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই ছিলেন ‘আন্তর্জাতিক’ মাপের কথাসাহিত্যিক। লক্ষণীয়, ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’য় বিভিন্ন চরিত্রের সামাজিক জীবন এবং ব্যক্তির জীবন-যাপনের যে অনুসূক্ষ্ম ডিটেইলসমৃদ্ধ গতিশীল বর্ণনা পাই, তার পূর্বসূত্র শুধু খুঁজে পাওয়া যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে। এরই সঙ্গে তাঁর উপন্যাসে এসে মিশেছিল মার্কহের মহাকাব্যিক মেজাজ। কিংবদন্তি, লোককথা, লোকগান, প্রবাদ-প্রবচন, পুরাণ আর সমাজের অনুপুঙ্খ বর্ণনার সঙ্গে অবিমিশ্র হয়ে গিয়েছে ইতিহাস ও রাজনীতি।

শুধু কী উপন্যাস রচনায় অদ্বিতীয় হয়ে আছেন ইলিয়াস? একেবারেই নয়। তাঁর গল্পগুলোও বাংলা গল্পঘরানার উল্টো দিক থেকে রচিত। বাংলা কথাসাহিত্য সামগ্রিকভাবে মধ্যবিত্তের রচনা, মধ্যবিত্তই এর পাঠকÑ মধ্যবিত্তের রুচি, মনমানসিকতাই প্রতিফলিত হয়ে আসছে বাংলা ছোটগল্পে। কী এর ভাষা, কী এর বিষয়আশয়, মধ্যবিত্তের গ-ি ছাড়িয়ে কখনও কখনও নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষ বা কৃষকজীবনকে স্পর্শ করলেও বাংলা ছোটগল্প ওই মধ্যবিত্তের গ-িতেই আটকে ছিল। কিন্তু ইলিয়াসই প্রথম ভেঙে দিলেন সেই বৃত্ত। ইলিয়াস নিম্নবিত্তের সেই স্তরে নেমে এসেছেন, যেখান থেকে চরিত্রগুলোকে তাঁদের নিজস্ব পরিম-ল থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তাঁদের একজন হয়ে ওঠা যান। বাংলা ছোটগল্পে যে ‘রূপকথা-লোলুপতা’ ছিল, সেখান থেকে তিনি সরে এসে কর্কশ, তিক্ত, ‘ফাঁস-লাগানো’ বাস্তবতাকেই গল্পের পর গল্পে উপস্থাপন করে গেছেন। বিষয়ের এই টানে নতুন এক ভাষারীতি ও বর্ণনাভঙ্গিও তিনি আবিষ্কার করে নিয়েছিলেন। এই কারণেই অনেকের কাছেই মনে হতে পারে তাঁর গল্পের ভাষা অশ্লীল, খিস্তিখেউরে ভরা, অমার্জিত, শ্লেষমিশ্রিত।

ভাষাই হচ্ছে তাঁর গল্পের প্রধান শক্তি। যে মানুষ তাঁর গল্পের বিষয় হয়ে এসেছে, তাদের মুখের ভাষা সেইভাবে তুলে না আনলে চরিত্রগুলোই তো ফুটত না। এরা হচ্ছে আসলে সেই নিম্নবিত্তের মানুষ যাদের ভাষাপরিবেশই এরকম, মধ্যবিত্ত রুচির কাছে তা অমার্জিতই মনে হবে। কিন্তু ওই মানুষগুলোর কাছে এটা সহজ এক ধরনের প্রকাশভঙ্গি মাত্র। বিষয়, চরিত্র আর ভাষার এই অবিমিশ্রতা সম্পর্কে ইলিয়াস ছিলেন বেশ সচেতন, ‘ভাষা-ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর বৈশিষ্ট্য মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করা দরকার।’ ইলিয়াস ঠিকই বুঝেছিলেন, ‘আধুনিককালে শিল্প ঠিক প্রাকৃতিক নিয়মে গড়ে ওঠে না, শিল্পীর সচেতন ভাবনা ও তৎপরতার ফল আধুনিক শিল্প-সাহিত্য।’ এই সচেতন প্রয়াসই মূলত তাঁকে বাংলা ছোটগল্পের এক মহান রূপকার করে তুলেছে।

ইলিয়াসের এই অবস্থান বিস্ময়কর হলেও ইতালির প্রখ্যাত মার্কসবাদী ভাবুক আন্তোনিও গ্রামসির ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। গ্রামসিও চেয়েছিলেন নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে বুদ্ধিজীবীরা যদি যুক্ত না হতে পারেন, তাদের জীবনযাপনের সমতলে যদি নেমে না আসতে পারেন, তাহলে জনমানুষের সার্বিক মুক্তি অর্জন করা কখনই সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য, এই শিল্পচর্চার জন্য কোন শিল্পীকে আনুষ্ঠানিক মার্কসবাদের আশ্রয় নিতে হবে এমনটা কখনই মনে হয়নি ইলিয়াসের। নান্দিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে তিনি ছিলেন একেবারেই নির্মোহ। ব্যক্তিজীবন ক্ষয়ে ক্ষয়ে একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, মানবিক সম্পর্কশূন্য এক ধরনের ক্লেদাক্ত দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছে মানুষÑ এসব নিয়ে তাঁর কোন সংশয় ছিল না। কিন্তু আরোপিত মার্কসীয় পথে যে এই মানুষের মুক্তি ঘটবে, ইলিয়াসের কথাসাহিত্যে সেই মতাদর্শ কখনই প্রকট হয়ে ওঠেনি। এই ধরনের আরোপণ থেকে বিস্ময়করভাবে মুক্ত তাঁর রচনা। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প প্রসঙ্গে খালেকুজ্জামান ইলিয়াস যথার্থই বলেছিলেন, ‘ইলিয়াস তাঁর গল্পের বিভিন্ন বিচিত্র মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের বিশ্বাস, সংস্কার, দুঃখ, শোক, আনন্দ, আহ্লাদ, অনুভূতি, উপলব্ধি, ভঙ্গি, সংলাপ ইত্যাদি যে স্বচ্ছন্দ অথচ তীর্যক ও কৌতুকবহ ভঙ্গিতে সৃষ্টি করেন তাতে তাঁর লেখা যেমন জীবনের সামগ্রিক, পূর্ণবৃত্ত বাস্তবতা তৈরি করে, তেমনি তাঁর স্বকীয় ধাঁচও প্রতিষ্ঠিত হয়।’ বিস্মিত হতে হয় এই ভেবে যে গল্পরচনার প্রায় শুরু থেকেই তিনি একজন পরিণত লেখক। অনেক প্রস্তুতি নিয়ে, দীর্ঘদিনের নেপথ্য অনুশীলনীর মাধ্যমে পরিণতির একটা পর্যায়ে পৌঁছার পরেই যে তিনি গল্পরচনায় হাত দিয়েছিলেন, সেটা তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ থেকে ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ পর্যন্ত সঙ্কলিত গল্পগুলো পড়লেই তা বোঝা যাবে। ‘জীবনের শেষ গল্পের শেষ বাক্যে কলম থামা পর্যন্ত তিনি সর্বাংশে প্রস্তুত পরিণত এবং অমোঘ একটি কলমের অধিকারী ছিলেন।’ তার ন্যারেটিভের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, চরিত্রের ক্রিয়াশীলতা, ভাবনা, পরিপ্রেক্ষিত, সংলাপ, বর্ণনা এবং মতাদর্শ সামগ্রিক ঐক্যে গ্রোথিত হয়ে এক-একটা রচনাকে মহৎ শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করেছে। বাংলাসাহিত্যে তাঁর মতো লেখক তাই সত্যি বিরল।

এই আলোচনার শুরুতেই বলেছিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রচনার সংখ্যা বেশি নয় কিন্তু গভীরতার দিক থেকে অতলস্পর্শী। তাঁর প্রবন্ধ সম্বন্ধেও এই একই কথা বলা যায়। জীবদ্দশায় তাঁর একটি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। মৃত্যুর পর অপ্রকাশিত নানা ধরনের রচনা নিয়ে বেরিয়েছে আরও একটি বই। তবে দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যে আর তীক্ষè মতাদর্শিক গভীরতায় তাঁর প্রতিটি প্রবন্ধ উজ্জ্বল। বাংলাসাহিত্য তো বটেই বিশ্বসাহিত্যও ছিল তাঁর নখদর্পণে। তাঁর প্রবন্ধ পড়লেই বোঝা যায়, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তিনি বিশ্বসাহিত্য পড়েছিলেন। সেই সঙ্গে তাঁর আগ্রহ ছিল সমাজতত্ত্ব, সংস্কৃতি, দর্শন, ইতিহাস ইত্যাদি নানা বিষয়ে। এই পঠনপাঠনের সূত্রেই গড়ে উঠেছিল তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর যে পক্ষপাত ছিল, সেকথা তাঁর প্রবন্ধে সুস্পষ্ট। ইলিয়াস কবিতাও লিখেছেন কিছু। ব্যক্তিক অনুভবের কারণে ওই কবিতাও আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তবে ইলিয়াসের সৃজনীপ্রতিভা মূলত গভীর হয়ে উঠেছে তাঁর কথাসাহিত্যে। দুই বিপরীত বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে উপন্যাস ও ছোটগল্পের মধ্য দিয়ে পৌঁছুতে চেয়েছেন ব্যক্তিসত্তার গভীরে। মানুষকে তিনি গভীরভাবে ভালবাসতেন, তাঁর রচনায় এই বিষয়টি সুস্পষ্ট।

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: