আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বইপড়া

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • সাঈদ আখন্দের শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘জলের আগুনে জ্বলে পড়শীর মুখ’
  • মাহবুব রেজা

‘যে কবিতা তোমায় নিয়ে- সেই কবিতার লাশ/কফিন খুলেই দেখি তাতে আমার সর্বনাশ’- ভাবলেই শিউরে উঠতে হয় এই ভেবে যে, কবিতায় কী করে এমন সর্বনাশের আগাম খবর অনুমান করা যায়! হ্যাঁ, কবি সাঈদ আখন্দ সম্ভবত নিজের আসন্ন সর্বনাশের বিষয়টি আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তা না হলে অমন অলক্ষুণে কথা কী করে উঠে এসেছিল তাঁর কবিতায়? বিষয়টি ভাবলে অবাক না হয়ে পারি না।

নব্বই দশকের উজ্জ্বলতম কবি হিসেবে সাঈদ আখন্দ নিজের জায়গাটি পোক্ত করে নিয়েছিলেন তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায়, ভিন্ন স্রোতের কবিতায়। আর দশজনের মতো প্রচার প্রিয় ছিলেন না তিনি, কিন্তু কবিতাকে নিজের জীবনের মতোই ভালবেসেছিলেন। কবিতাকে করে তুলেছিলেন বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কেউ ভাল কবিতা লিখলে তাঁর চেয়ে খুশি আর কাউকে দেখাত না। কবিতায় অন্তপ্রাণ ছিলেন এই কবি।

‘জলের আগুনে জ্বলে পড়শীর মুখ’ তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ। এর আগে প্রকাশিত হয়েছেÑ বৃষ্টিধারায় রক্তের স্রোত, প্রেমিক ও বিপ্লবী, পুড়ে যাই প্রেমে ও আগুনে, বেঁচে আছি সন্তাপে-সম্ভোগে, স্বপ্ন ভাসে রক্তজলে কাব্যগ্রন্থ। এই বইয়ের প্রথম কবিতা ‘কষ্ট এবং তুমি’র প্রথম দু’লাইনে সাঈদ আখন্দ ভয়ঙ্কর সত্যের পূর্বাভাস দিয়েছেন যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও গভীর রেখাপাত তৈরি করেছিল। কবিরা তাঁদের অলৌকিক ক্ষমতার গুণে আগাম বার্তা পেয়ে যান। সতর্ক সঙ্কেত দিয়ে মানুষকে সচেতন করে তোলেন- সাবধানীও করে তোলেন। সাঈদ আখন্দের কবিতায় ঘুরে ফিরে দেশ-কাল রাজনীতি, সমাজের সঙ্গতি-অসঙ্গতি, মানবিক মূল্যবোধ, প্রেম ও দ্রোহ উঠে এসেছে। সহজ-সরল ভাষা অথচ সেখানে তিনি তাঁর নিজস্ব ভাবধারা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর কবিতার শরীরে স্নিগ্ধ ভালবাসা, বাঙালীর হৃত গৌরবের ঘ্রাণ থাকত। ‘কবির কোনো জন্ম-মৃত্যু নেই’ কবিতায় তিনি বলছেন, ‘কবির কোন জন্মদিন নেইÑ/মৃত্যু বলেও নেই কিছু তার অভিধানে/কবি ও কবিতা অনন্তকালের বিম্বিত মুখ/ছায়ার বিপরীতে দাঁড়ানো/ঝলমলে পৃথিবীর আলো-আঁধারিতে/কবি নিজেই অসীমের দীর্ঘ এক ছায়া।’

সাঈদ আখন্দ গত ১ জানুয়ারি রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। ঘাতক কাভার্ডভ্যান তাঁকে পিষ্ট করে চলে যায়। এই কবিতার মাত্র পঞ্চাশ বছরের বর্ণিল জীবনের পুরোটাই কবিতায় সমর্পণ করেছিলেন। সদাহাস্য, সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সাহিত্য মহলে তিনি পরিচিত। নব্বই দশকের কবিতার উৎকর্ষ ও কাব্য আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে তাঁর। সুকান্ত সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব, জসীমউদ্দীন পরিষদের সভাপতি, অনুপ্রাসের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম, জাতীয় কবিতা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য হিসেবে নিজের সাংগঠনিক ক্ষমতার পরিচয় রেখেছেন। কবিতায় অবদানের জন্য জসীমউদ্দীন পুরস্কার, দক্ষিণ বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি পদক, কবি জীবনানন্দ দাশ পুরস্কার, খুলনা রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার পেয়েছেন।

একজন কবি নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে কঠিন সত্যকেই উপস্থাপন করেন। সাঈদ আখন্দও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন। তাঁর কবি সত্তায় তিনি সেই সত্যের প্রতিধ্বনি তুলে, নিজের জীবন সমর্পণ করে দিয়ে আমাদের সাবধানী করে দেন এই উচ্চারণ তুলে, ‘বারবার ফিরে দেখি ফেলে আসা দিন/বারবার পরাজয়-গ্লানি মুছে/জয়ের আকাক্সক্ষায় বেড়ে উঠি পরজীবী হয়ে;/আমার নিজের বলে শেষাবধি কিছুই থাকে না।’ অমোঘ সত্যি কথা। কবির জীবনে নিজের বলে কিছুই থাকে না শেষাবধি। কবি সাঈদ আখন্দ তাঁর কবিতায়, তাঁর চেতনায় যে স্বপ্ন আঁকতে চেয়েছিলেন তা একদিন বাস্তবায়িত করবে নতুন দিনের কবিরাÑ এমন প্রত্যাশা সবার।

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: