মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলার জাগরণ

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • কাজী আবদুল ওদুদ

আমাদের দেশের অনেক শিক্ষিত ব্যক্তির ধারণা এই যে, বাংলার জাগরণ পাশ্চাত্য প্রভাবের ফল। কথাটা মিথ্যা নয়। কিন্তু পুরোপুরি সত্যও যে নয় সে দিকটা ভেবে দেখবার আছে। যাঁরা এই জাগরণের নেতা তাঁরা কি উদ্দেশ্য আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ও এই জাগরণের ফলে দেশের যা লাভ হয়েছে তার স্বরূপ কি, এই সমস্ত চিন্তা করলে হয়ত আমাদের কথা ভিত্তিশূন্য মনে হবে না। রাজা রামমোহন রায়ের ব্রহ্মজ্ঞান প্রচার থেকে আরম্ভ করে বাজনা ও গো-হত্যা নিয়ে হিন্দু-মুসলমানদের দাঙ্গা পর্যন্ত আমাদের দেশের চিন্তা ও কর্মধারা, আর ডিইস্ট এনসাইক্লোপিডিস্ট থেকে আরম্ভ করে বোলশেভিজম পর্যন্ত পাশ্চাত্য চিন্তা ও কর্মধারা এই দুইয়ের উপর চোখ বুলিয়ে গেলেও বুঝতে পারা যায়- আমাদের দেশ তার নিজের কর্মফলের বোঝাই বহন করে চলেছে পাশ্চাত্যর সঙ্গে তার পার্থক্য যথেষ্ট লক্ষ্যযোগ্য। এই পার্থক্য এই সঙ্গে আমাদের জন্য আনন্দের ও বিষাদের। আনন্দের এই জন্য যে, এতে করে আমাদের একটা বিশিষ্ট সত্তার পরিচয় আমরা লাভ করি অসভ্য বা অর্ধসভ্য জাতির মতো আমরা শুধু ইউরোপের প্রতিধ্বনি মাত্র নই; আর বিষাদের এই জন্য যে আমাদের জাতীয় চিন্তা ও কর্ম-পরম্পরার ভেতর দিয়ে আমাদের যে ব্যক্তিত্ব সুপ্রকট হয়ে ওঠে সেটি অতীতের অশেষ অভিজ্ঞতা পুষ্ট অকুতোভয় আধুনিক মানুষের ব্যক্তিত্ব নয়, সেটি অনেকখানি অল্প পরিসর শাস্ত্রশাসিত মধ্যযুগীয় মানুষের ব্যক্তিত্ব।

২.

বাংলার নবজাগরণের প্রভাত-নক্ষত্র যে রাজা রামমোহন রায় সে সম্বন্ধে কোন মতভেদ নাই। কিন্তু তাকে জাতীয় জাগরণের প্রভাত নক্ষত্র না বলে প্রভাত সূর্য্য বলাই উচিত, কেননা, জাতীয় জীবনের কেবল মাত্র একটি নব চৈতন্যের সাড়াই তার ভেতরে অনুভূত হয় না, সেইদিনে এমন একটি বিরাট নব আদর্শ তিনি জাতির সামনে উপস্থাপিত করে গেছেন যে, এই শত বছরেও আমাদের দেশে আর দ্বিতীয় ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেন নাই যার আদর্শ রামমোহনের আদর্শের সঙ্গে তুলিত হতে পারে। এমন কি, এই শত বছরে আমাদের দেশে অন্যান্য যে সমস্ত ভাবুক ও কর্মী জন্মেছেন তাঁদের প্রয়াসকে পাদপীঠরূপে ব্যবহার করে তার উপর রামমোহনের আদর্শের নবপ্রতিষ্ঠা করলে দেশের জন্য একটা সত্যিকার কল্যাণের কাজ হবে এই আমাদের বিশ্বাস। এই রামমোহন যে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান, পাশ্চাত্য জীবনাদর্শ ইত্যাদির দিকে যথেষ্ট শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নাই। তবু এ কথা সত্য যে, এই পাশ্চাত্য কৃষ্টির সংস্রবে তিনি এসেছিলেন পূর্ণযৌবনে। তার আগে আরবী-ফার্সী ও সংস্কৃত অভিজ্ঞ রামমোহন পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে পিতা ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বাদানুবাদ করেছেন, গৃহত্যাগ করে তিব্বত, উত্তর ভারত ভ্রমণ করেছেন, আর সেই অবস্থায় নানক, কবীর প্রভৃতি ভক্তদের ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন- যাঁরা হিন্দু-চিন্তার উত্তরাধিকার স্বীকার করেও পৌত্তলিকতা, অবতারবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ৩.

রামমোহন জাতীয় জীবনে যে সমস্ত কর্মের প্রবর্তনার সঙ্কলন করেছিলেন তার মধ্যে শিক্ষার ক্ষেত্রে হিন্দু কলেজ অনতিবিলম্বে ফল প্রসব করতে আরম্ভ করে। হিন্দু কলেজের সঙ্গে ডিরোজিও’র নাম চিরদিনের জন্য একসূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে। এই ডিরোজিও যে গুরুর শিষ্য ‘ফরাসী’ বিপ্লবের চিন্তার স্বাধীনতা বহ্নি তাঁর ভেতরে প্রজ্বলিত ছিল। ডিরোজিও’র সেই বহ্নি-দীক্ষা হয়েছিল। অল্প বয়সে যথেষ্ট বিদ্যা অর্জন করে কবি ও চিন্তাশীলরূপে তিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন। বিশ বছর বয়সে তিনি হিন্দু কলেজের চতুর্থ শিক্ষকরূপে নিয়োজিত হন, আর তিন বছর শিক্ষকতা করার পর সেখান থেকে বিতাড়িত হন। এরই ভেতর তাঁর শিষ্যদের চিত্তে যে আগুন তিনি জ্বালিয়ে দেন তাঁর কলেজ পরিত্যাগের পরও বহুদিন পর্যন্ত তাঁর তেজ মন্দিভূত হয় নাই। শুধু তাই নয়, নব্যবঙ্গের গুরুদের ভেতর এই ডিরোজিত্ত’র এক বিশিষ্ট স্থান আছে। এর শিষ্যরা অনেকেই চরিত্র, বিদ্যা, সত্যানুরাগ ইত্যাদির জন্য জাতীয় জীবনে গৌরবের আসন লাভ করেছিলেন, এরইসঙ্গে হিন্দু সমাজের আচার-বিচার, বিধি-নিষেধ ইত্যাদির লঙ্ঘন দ্বারা সুনাম বা কুনাম অর্জন করে সমস্ত সমাজের ভেতরে একটা নব মনোভাবের প্রবর্তনা করেন।

৪.

রামমোহনের শ্রেষ্ঠ দান কী তা নিয়ে আগেও বাংলাদেশে তর্ক-বির্তক হয়েছে, ভবিষ্যতের জন্যও যে সে তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজনীয়তা চুকে গেছে তা নয়। তবে যে সমস্ত বাদ প্রতিবাদ হয়েছে তার মধ্যে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অক্ষয় কুমার দত্তের বাদানুবাদই সুবিখ্যাত। দেবেন্দ্রনাথ ঈশ্বর-প্রেমিক পরুষ ছিলেন। হাফেজের যেসব লাইন তাঁর অতি প্রিয় ছিল তার একটি এই- হরগিজম মোহরে তু আজ লওহে দিল ও জাঁ না বরদ। তাঁর জীবনের সমস্ত সম্পদ বিপদের ভেতর দিয়ে তাঁকে এই প্রেমের পরিচয় তাঁর দেশবাসীরা পেয়েছেন। প্রথম জীবনেই যে পরীক্ষায় তাঁকে উত্তীর্ণ হতে হয়েছিল তা কঠোর-সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে সর্বস্ব দানে তিনি পিতৃঋণ হতে উদ্ধার পাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। সত্যের যাত্রাপথে ‘মহান মৃত্যু’র এমননিভাবে সম্মুখীন হওয়া সমস্ত বাঙালী জীবনে এক মহা ঘটনা যাকে বেষ্টন করে বাংলার ভাবস্রোতের নৃত্য চলতে পারে হয়ত চলেছে। কিন্তু গুহাপথের যাত্রী হয়েও দেবেন্দ্রনাথ গভীরভাবে জ্ঞানানুরাগী ও সৌন্দর্যানুরাগী ছিলেন। তবু সংসারনিষ্ঠা, জ্ঞানানুশীলন, সৌন্দর্যস্পৃহা, সমস্তের ভেতরে ঈশ্বরপ্রেমই ছিল তার অন্তরের অন্তরতম বস্তু। তাই তিনি যে রামমোহনকে মুখ্যত ব্রহ্মজ্ঞানের প্রচারকরূপে দেখবেন এটাই স্বাভাবিক।

৫.

আমরা বলেছি বাংলায় এ পর্যন্ত যে চিন্তা ও কর্মধারার বিকাশ হয়েছে তাতে মধ্যযুগীয় প্রভাব বেশি। দেবেন্দ্রনাথের কাব্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি, তিনি মানুষের চিত্তকে বহ্ম পাদপীঠ বলে সম্মান দিয়েছেন। শুধু প্রাচীন ঋষিদের যে কেবল সে অধিকার ছিল তা তিনি মানেন নাই। কিন্তু এই আবিষ্কৃত সত্যের পুরো ব্যবহারে তিনি যেন কেমন সঙ্কোচবোধ করেছেন। এই ‘আত্মপ্রত্যয়-সিদ্ধ জ্ঞানোজ্জ্বলিত বিশুদ্ধ হুদয়’ কথাটি তিনি পেয়েছিলেন উপনিষদ থেকে- নিজের জীবনের ভেতরে এ কথার সায় তিনি নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন। কিন্তু অন্তত প্রয়োজনতাড়িত মানুষকে এই অমৃতের সাধনা জীবনের সমস্ত কর্ম সমস্ত অবসর, সমস্ত প্রার্থনা, সমস্ত অপ্রার্থনার ভেতর দিয়ে করতে হবে শুধু বিধিবদ্ধ প্রার্থনার ভেতর দিয়েই নয়- এতটা অগ্রসর হতে তিনি যেন পশ্চাদপদ হয়েছেন। হয়ত বৃহত্তর মনীষা নিয়ে তিনি যদি অক্ষয় কুমারকে আত্মসাত করতে পারতেন তাহলে ব্রাহ্ম সমাজ তাঁর হাতে যে রূপ লাভ করত তা দেশের পক্ষে আরও কল্যাণদায়ক হতো।

৬.

সব ধর্মই কি সত্য? এ প্রশ্নের মীমাংসায় রামমোহন বলেছিলেন, বিভিন্ন ধর্মের ভেতরে পরস্পরবিরোধী অনেক নিত্যবিধি বর্তমান। তাই সব ধর্মই সত্য এ কথা মানা যায় না। তবে সব ধর্মের ভেতরেই সত্য আছে। দেবেন্দ্রনাথ রামমোহনের এই মীমাংসা মেনে চলেছিলেন বলতে পারা যায় যদিও উপনিষদের দিকে তিনি বেশি ঝুঁকে পড়েছিলেন। কিন্তু কেশবচন্দ্রের ভক্তি প্রধান প্রকৃতির কাছে রাজার এ মীমাংসা ব্যর্থ হলো। তিনি বললেন-‘Our position is not that there are truths in all religions, but that all established religions of the world are true.’ এই কথাই রামকৃষ্ণ আরও সোজা করে বললেন- ‘যত মত তত পথ’। যত মত তত পথ তা নিশ্চয়ই; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- সেসব পথ একই গন্তব্য স্থানে নিয়ে যায় কিনা। রামকৃষ্ণ বললেন- ‘হাঁ তাই যায়।’ তিনি সাধনা করে দেখেছেন, শাক্ত, বৈষ্ণব, বেদান্ত, সুফী, খ্রীস্টান ইত্যাদি সব পথই এক ‘অখ- সচ্চিদানন্দের অনুভূতিতে নিয়ে যায়। এসব কথার সামনে তর্ক বৃথা। তবে একটি কথা বলা যেতে পারে যে, মানুষ অনেক সময়ে বেশি করে যা ভাবে চোখেও সে তাই দেখে।

৭.

বাংলার ঊনবিংশ শতাব্দীর ধর্মচর্চার উপরে যে একটা মধ্যযুগীয় ছাপ মারা রয়েছে তা আমরা দেখেছি। কিন্তু বাংলার নব বিকশিত সাহিত্যে যেন এই ত্রুটির স্খলনের চেষ্টা প্রথম থেকেই হয়ে আসছে। বাংলার নব সাহিত্যের নেতা মধুসূদন আশ্চর্য উদারচিত্ত নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জাতি ধর্ম ইত্যাদির সংকীর্ণতা যেন জীবনের ক্ষণকালের জন্যও তাঁকে স্পর্শ করতে পারে নাই; আর এই উদারচিত্ত কবি ইউরোপের ও ভারতের প্রাচীন কাব্যকলার শেষ্ঠ সম্পদ যেভাবে অবলীলাক্রমে আহরণ করে তাঁর স্বদেশবাসীদের উপহার দিয়েছেন সে কথা বাঙালী চিরদিনই বিস্ময় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। বাঙালী তাঁর পরে সাহিত্যের যে নেতা বাঙালী জীবনের ওপর একটা অক্ষয় ছাপ রেখে গেছেন তিনিও প্রথম জীবনে শিল্পী, সুতরাং, সাম্প্রদায়িকতার দ্বারা অস্পৃষ্ট। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের ভেতর কবিজনসুলভ স্বপ্ন কম। তিনি বরং নিপুণ চিত্রকর ও বাস্তববাদী স্বদেশ প্রেমিক। তাই তাঁর যে অমর কীর্তি ‘আনন্দ মঠ’ তাতে হয়ত নায়ক নায়িকার গূঢ় আনন্দ-বেদনার রেখাপাত নাই, হয়ত এমন কোন সৌন্দর্য মূর্তি আঁকা হয় নাই, যা শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধরে’ মানুষের নয়নে প্রতিভাত হবে অ ঃযরহম ড়ভ নবধঁঃু আর সেই জন্য ধ লড়ু ভড়ৎ বাবৎ কিন্তু তবু এটি আমর এই জন্য যে, এতে যেন লেখক কি একটা আশ্চর্য ক্ষমতায় পাঠকের সামনে প্রসারিত করে ধরেছেন, দেশের দুর্দশা মথিত তাঁর রক্তাক্ত হৃদয়- যে হৃদয় তাঁর সুগভীর বাস্তবতার জন্যই সৌন্দর্যের এক রহস্যময় খনি। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র শেষ পর্যন্ত শিল্পের ক্ষেত্রে থাকতে পারেন নাই; শেষ বয়সে ধর্মের ক্ষেত্রে তিনি অবতরণ করেছিলেন। তাঁর চরিতাখ্যায়করা বলেন, শেষ বয়সে আত্মীয় বিয়োগে অধীর হয়ে তিনি ধর্মে মনোনিবেশ করেন।

সূত্র : শিখা চিরন্তন

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: