মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত মণিপুরী নারী ও শিশুরা

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • আলম শামস

লেইপাক সেনা সিন্হা, স্বামী-অনিল সিংহ, গ্রাম-রাসনগর, উপজেলা- ছাতক, জেলা-সুনামগঞ্জ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গলাজ্বলা, নাভির নিচে চাকা, পা জ্বালাপোড়াসহ আরও অনেক জটিল রোগে আক্রান্ত। একই এলাকার চন্দলেইমা দেবী গ্যাসট্রিক, অনিদ্রা, মাথা ঘুরানো, দুর্বলতা ইত্যাদি রোগে ভুগছেন। শুধু লেইপাক বা চন্দলেইমাই নয় ছাতকের ইসলামপুর ইউনিয়নের রাসনগর, ধনীটিলা ও রতনপুর এলাকার স্বপ্না সিনহা, গিথানী দেবী, অমলা দেবী, শেফালী সিনহা, কুসুম সিন্হা, ইন্দ্রানী দেবী, ভানু দেবীসহ শত শত মণিপুরী নারী বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত। সুনামগঞ্জ জেলাধীন ছাতক উপজেলার রাসনগর, ধনীটিলা ও রতনপুর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মণিপুরী অধ্যুষিত ৩টি গ্রাম। এ এলাকায় সরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক, পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র বা চিকিৎসাসেবা পাওয়ার মতো কোন ব্যবস্থা নেই। উপজেলা সদরের সঙ্গে কোন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও নেই।

ঘরে ও বাইরে উদয়াস্ত খেটে চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এই নারীরা। একদিকে স্বামীর সঙ্গে ফসলের মাঠে অন্যদিকে ঘরে প্রেমময়ী স্ত্রী ও স্নেহময়ী মা, সমানভাবে ভূমিকা রাখেন। দেশের প্রতিটি মানুষের মতো তাঁরও রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকার। নারী হওয়ার সুবাদে কতিপয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেমন প্রজনন ও মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা। রাষ্ট্রীয় পরিম-লে এমনিতেই নারীর অবস্থান প্রান্তিক। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মণিপুরী নারীর অবস্থান আরও শোচনীয়। নৃগোষ্ঠী নারী হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তাঁর যে নির্ধারিত অবস্থান সেই অবস্থান সমাজে বিদ্যমান পারিপার্শ্বিকতার পরিপ্রেক্ষিতে অন্য দশটি মূল ধারার নারীর অবস্থান থেকে অনেক নিচে।

সিলেটের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বসবাস করে মণিপুরী জাতিগোষ্ঠী। শহর এলকার মণিপুরীরা শিক্ষা-দিক্ষা অর্থ-বিত্তে বেশ ভাল আছে। তারা নগর জীবনের সকল নাগরিক সুবিধা ভোগ করে। ব্যতিক্রম শুধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে বসবাসকারী এ নৃগোষ্ঠীদের। প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে বসবাসকারীদের মৌলিক চাহিদা যেমন : শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, উন্নত যোগাযোগ একেবারেই নাজুক।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণেই নৃগোষ্ঠী নারীর স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ সঙ্কুচিত। স্বাস্থ্য অধিকার থেকে বঞ্চনার ফলে নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার ব্যাপকতা, প্রজনন সমস্যা, শিশু মৃত্যুর হার রীতিমতো অস্বাভাবিক। উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে সিলেটের পাহাড়ী জনপদে প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকির পাশাপাশি রোগ-বালাই, অসুখ-বিসুখ বৃদ্ধির প্রবণতা অনেক বেশি দৃশ্যমান। পরিবারে ও সমাজে উপেক্ষিত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এ নারী বিভিন্ন রোগ-ব্যাধির সহজ শিকার।

যুগ যুগ ধরে এ নৃগোষ্ঠী নারী শ্রমে ঘামে পরিবার-পরিজনকে আগলে রাখলেও নিজের সুস্থ স্বাভাবিক জীবন আজও নিশ্চিত হয়নি।

রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত ডিজিল্যাব মেডিক্যাল সার্ভিসেসের সার্জন ডা. জিএম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করা মণিপুরীসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীরা অবহেলিত। উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে তারা বিভিন্ন রোগ-শোকে ভোগে। জেলা ও উপজেলা শহরের কাছাকাছি যারা বসবাস করে তারা কিছু সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকে। ইউনিয়ন পর্যায়ে এ সেবা একেবারেই অপ্রতুল। কিন্তু যারা নিতান্তই প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে তাদের কাছে এনজিও স্বাস্থ্যকর্মীরাও যেতে পারে না। তাই দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীরা স্বাস্থ্য সমস্যা ও রোগ-ব্যাধি নিয়েই জীবন-যাপন করে।

দেশের সমতল ও পাহাড়ী অঞ্চলে বসবাসরত এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষেরা নানা রকম কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাকায় তারা সরকারের শিক্ষা ও গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম সঠিকভাবে গ্রহণ করছে না এবং অনেকে আবার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরী, বাল্যবধূ নববিবাহিতা নারী, গর্ভবতী মা এবং সন্তানকে দুগ্ধদানকারী মায়েরা রক্ত স্বল্পতাসহ নানা রকম জটিল ও কঠিন রোগে ভোগেন।

ভূ-প্রকৃতির কারণে তারা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। সচেতনতার অভাবে তারা টাইফয়েড, জন্ডিস, যক্ষ্মা, ক্যান্সার, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, রক্তশূন্যতায়, মাতৃকালীন জটিলতায় ভোগে। প্রসবকালীন সমস্যা, নবজাতকের মৃত্যু ও কৃমি রোগসহ নানা রকমের রোগ-ব্যাধিতেও আক্রান্ত হয়।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ডক্টরস এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডাঃ পরেশ চন্দ্র সিংহ বলেন, মণিপুরীসহ প্রায় সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারী সব সময় ঘরে-বাইরে সমানভাবে কাজ করে থাকে। তাই নারী হিসেবে তার জন্য কিছু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রজনন ও মাতৃকালীন স্বাস্থ্যসেবা। কেননা, দেশের প্রতিটি মানুষের মতো তারও রয়েছে চিকিৎসাসেবা পাবার অধিকার। দেশকে আরও এগিয়ে নিতে নারীদের মৌলিক সুবিধাসহ সকল নৃগোষ্ঠী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের অন্ধকারে রেখে কখনও উন্নয়ন অগ্রগতি আশা করা সমচীন নয়। তাই মণিপুরী নারীসহ নৃগোষ্ঠী নারীদের সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: