কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিশ্চিত হোক নারীর নিরাপদ বাহন

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

সকাল সাড়ে নটা পার হতে চলল। অফিসে ১০টার মধ্যে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে। শীতের সকাল। তবুও ঘামছেন রসমা কু-ু। দাঁড়িয়ে আছেন সেই পৌনে নটা থেকে মালিবাগ মোড় বাসস্ট্যান্ডে। থাকেন বাসাবো। অফিস গ্রীন রোড-পান্থপথ মোড়ে। বাসাবো থেকে সরাসরি কোন পাবলিক বাস সার্ভিস নেই। মালিবাগ মোড় পর্যন্তও সরাসরি বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা নেই। ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসতে হয়। তাও কি অফিস টাইমে পাওয়া যায়? ওই রুটে যানবাহন নিয়ে লঙ্কাকা-ের কথা সুবিদিত। রসমাকে অফিসে ঢুকতে হবে কার্ড পাঞ্চ করে। একটি প্রাইভেট কোম্পানির কম্পিউটার অপারেটর তিনি। সেই ভোরে উঠে স্বামী-অসুস্থ শাশুড়ি ও সন্তানের সব কিছু সামলিয়ে অফিসের উদ্দেশে যাত্রা করা মানে রীতিমতো যুদ্ধ। এ যুদ্ধ তাকে করতে হয় প্রতি কার্যদিবসে। অফিসে সঠিক সময়ে ঢুকতে না পারলে বকাঝকাসহ বেতন কর্তনের আতঙ্কে ওর মুখটা শুকিয়ে গেছে। সময় বয়ে যাচ্ছে, প্রতিটি পাবলিক বাসে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মিনতি করে উঠতে গেলেও হেলপারের এক কথা, ‘আপা উইঠেন না মহিলা সিট নাই।’ ওদিকে রসমার সময় বয়ে যায় আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে। এমন করে একে একে চলে যায় ৫/৬টি বাস। উঠতে না পেরে চোখ ফেটে প্রায় জল আসে।

শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড। বেলা প্রায় ১১টা। সাবিহা দাঁড়িয়ে আছেন হাতে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে। সাড়ে ১০টা থেকে সেই যে ঠায় দাঁড়িয়ে। ভীষণ অস্থিরতা কাজ করছে। গন্তব্য শাহবাগ। বারডেম হাসপাতালে রোগী হিসেবে ভর্তি আছেন এক আত্মীয়া। তিনি আবার ঢাকার বাইরের মানুষ। ঢাকার চক্করই বোঝেন না। অনেকটা ভীত মানুষ। হাসপাতালের খাবার খেতে পারেন না। খাবার নিয়ে যেতে হবে তার কাছে, তার জন্য উৎকণ্ঠায় ঘাম ঝরে। বাসে উঠতে পারছেন নাÑ হেলপারের ওই একই কথাÑ মহিলা সিট নেই। সাবিহার দ্রুত আবার বাসায় ফিরতে হবে। মেয়েকে নিয়ে চারটার মধ্যে যেতে হবে কোচিংয়ে। ননদ বিকেলে যাবেন ওই আত্মীয়া রোগীর কাছে। তার জন্য আবার আলাদা রান্না। ‘সময় বয়ে যায় আগুনের মাঝ দিয়ে।’

জোর করেই পুরুষ যাত্রীদের ঠেলে উঠে পড়লেন ১০ বছরের বাচ্চা দ্রোহকে নিয়ে নাজনীন সুলতানা। রাজধানীর শ্যাওড়াপাড়া থেকে বাচ্চাকে স্কুল থেকে নিয়ে ফিরছেন বাসায়। হেলপারের বাধা, ভেতরের পুরুষ যাত্রীদের আপত্তি উপেক্ষা করে বাচ্চাকে নিয়েই উঠে পড়েছেন এ নারী। প্রচ- ভিড়ের মধ্যে পুরুষের সঙ্গে গাদাগাদি করে ‘মহিলা সিট’-এর পাশে কোন রকম দাঁড়ালেন। বাচ্চাকে সিটের রড ধরিয়ে দিয়ে এক হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ, বাচ্চার স্কুল ব্যাগ সামলাচ্ছেন, অন্য হাতে শরীরের ভারসাম্য সামলাতে ব্যস্ত। দু’পাশে পুরুষ যাত্রী। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারছেন পেছন থেকে, পাশ থেকে কিছু শরীর তার দিকে চেপে আসছে। প্রথমে বুঝতে পারেন না এগুলো ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত? নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে থাকেন। শরীরও যতটা সম্ভব সঙ্কুচিত করা যায় ততটাই করেন। অসহায় চোখে আফসোস নিয়ে দেখতে থাকেন সিটে বসা ভাগ্যবান বা ভাগ্যবতীদের দিকে। একসময় বুঝতে পারেন ওই সব পুরুষ শরীর বা শরীরের অংশ এগিয়ে বা চেপে আসা অনিচ্ছাকৃত নয়। শরীরের টাল সামলানো, বাচ্চার মুখ, দ্রুত বাসায় ফেরার তাড়াÑ সব মিলিয়ে ঘামতে থাকেন। এহেন চাপাচাপি যে সদুদ্দেশ্যে নয় তা আর বুঝতে বাকি থাকে না। রক্তে আগুন ধরে যায়। হাত নিশপিশ করে। একবার পায়ের স্যান্ডেল জোড়ার কথা ভাবে। কিন্তু ভিড়! আর ভিড়ের মধ্যে কোন সিনক্রিয়েট করাটা শোভন নয়, নিজের আত্মসম্মানের কথা ভেবে চুপসে যান তিনি।

খিলগাঁও তালতলা এলাকার বাসস্ট্যান্ড। সুভদ্রা রোজারিও দাঁড়িয়ে থাকেন মিনিট পাঁচেক। এরই মধ্যে এসে পড়ে বিআরটিসির ‘মহিলা সার্ভিস’ বাস। কন্ডাক্টরও নারী। বাসে উঠে পড়েন দ্রুত। কারওয়ান বাজার তাঁর কর্মস্থল। ডবল ডেকার এ বাস সার্ভিসের দোতলায় গিয়ে সিট পেয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।

রাজধানীতে কর্মজীবী ও প্রয়োজনে প্রতিদিন কত নারী ঘরের বাইরে বের হন এবং কর্মস্থল আর উদ্দিষ্ট স্থলে যান তার হিসাব মিলানো কঠিন। সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়াও দুষ্কর। এই নারীদের যে কত বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় প্রতিদিনতা কহতব্য নয়। এই রাজধানীতেই নারীর নিরাপদ ও অবাধ যাতায়াতের বাহন যে নেই বর্ণিত চারটি দৃশ্যপটই তার সাক্ষ্য বহন করে। বর্ণিত দৃশ্যগুলো সামগ্রিক চিত্রের খ-মাত্র। সরকারীভাবে একটা ঘোষণা আছেÑ প্রতিটি গণবাহনে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট সিটের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কিছু গণবাহনে দেখা যায় শুধু লিখেই তাদের দায় সারছে। যথাযথভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে না। এমনও দেখা যায় কোন কোন ‘মহিলা সিট’ পুরুষরা দখল করে আছে। সিটে যাদের অধিকার তারা কষ্ট করে, বিড়ম্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করছেন। সিট ছাড়তে বললেও হচ্ছে বাগ্বিত-া। কোন কোন পুরুষ বলে ফেলেন Ñ এখন নারী-পুরুষের সমঅধিকারের যুগ। সিট ছাড়া যাবে না। এসব কান্ডজ্ঞানহীন পুরুষকে কে বোঝাবে ৫২ সিটের বাহনে মাত্র ৯টি সিট নারী, শিশু, প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ। সেখানে নারীর জন্য কয়টা সিট? সেখানে সমঅধিকার রক্ষা পেল কিভাবে? সমঅধিকারের সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা তাকে বোঝানোর চেষ্টা প-শ্রম বৈ অন্যকিছু নয়। তাকে কে বোঝাবে-একজন পুরুষ যেভাবে বাসের হ্যান্ডেল বা রড ধরে ঝুলে, ভিড় ঠেলে যাতায়াত করতে পারবে একজন নারীর পক্ষে তা তো সম্ভব নয়।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কর্মস্থলে ও নানা প্রয়োজনে এখন নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে অতীতের তুলনায়। পাশাপাশি সমান তালে তার নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা বা বাহন বাড়েনি। এক কথায় বলতে গেলে অপ্রতুল। কিছু উদ্যোগ লক্ষণীয়। বিআরটিসির ডবল ডেকার মহিলা বাস সার্ভিস চালু করলেও তা মোট চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

নারী প্রগতির সংগ্রাম চলছে। দেশ রাষ্ট্র সমাজের সবক্ষেত্রেই তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নিরাপদ বিড়ম্বনাহীন যাতায়াত ব্যবস্থা বা বাহন নিশ্চিত না হলে প্রগতির সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। নারী একসময় উৎসাহ উদ্দীপনা হারিয়ে গৃহবাসী হয়ে যেতে পারে বললে কি অত্যুক্তি হবে?

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: