কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ শান্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সা.)

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

আল্লাহ তা’আলার সিফাত বা গুণবাচক নাম সালাম। সালাম অর্থ শান্তি। ইসলাম শব্দ ব্যুৎপন্ন হয়েছে সলম থেকে- যার অর্থ শান্তি। জান্নাত হচ্ছে দারুস্্ সালাম- শান্তি নিকেতন। জান্নাতের অভিবাদন-সালাম, সালাম-শান্তি, শান্তি। বিচার শেষে জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন তাদেরকে সংবর্ধনা জানানো হবে সালাম জানিয়ে। কালাম মজীদে ইরশাদ হয়েছে : পরম দয়ালু রব্্-এর পক্ষ হতে তাদেরকে বলা হবে সালাম। (সূরা ইয়াসীন : আয়াত ৫৮)।

সেই সালামের বাণী, শান্তির বাণী, শান্তির পথের দিশা নিয়ে এই পৃথিবীতে তশরীফ আনেন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। তিনিই তো রাহাতুল আশেকীন সাইয়েদুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্্সম, খাতামুন নাবীয়্যিন। তাঁর আবির্ভাবে অন্ধকার, অজ্ঞতা ও ধর্মহীনতায় নিমজ্জিত দুনিয়ায় নেমে আসে আলোর সমুজ্জ্বল ধারা, জাহিলিয়াতের শেকড় উপড়ে যায়, শিরক ও কুফরের ভিত চৌচির হয়ে যায়। হানাহানি, কাটাকাটি আর অশান্তির পৃথিবীতে উচ্চারিত হয় শান্তির বাণী, ঘোষিত হয় তওহীদী কালাম : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ। - আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্্র রসূল।

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে হযরত আদম আলায়হ্সি সালাম থেকে হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম পর্যন্ত অসংখ্য নবী রসূল পৃথিবীতে তশ্রীফ এনেছেন। তাঁরা এসেছেন কোনো নির্দিষ্ট কওম বা জনগোষ্ঠীর হিদায়েতের জন্য, বা বিশেষ কোনো জনপদের পথহারা মানুষকে পথ দেখানোর জন্য। কিন্তু প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তা‘আলা এই পৃথিবীতে প্রেরণ করলেন সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতরূপে। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : আমি তো আপনাকে প্রেরণ করেছি বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ। (সূরা আম্বিয়া : ১০৭) আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে ঘোষণা দিতে নির্দেশ দেন : বলুন, হে মানব জাতি, আমি তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর রসূল (সূরা আ’রাফ : আয়াত ১৫৮)।

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন ইতিহাসের প্রতিটি ক্ষণ শান্তি স্থাপনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে ভরপুর। সেই দুধমাতা হালিমা সাদিয়ার গৃহে লালিত পালিত হবার সময়ও হযরত হালিমা সাদিয়া অবাক হয়ে অবলোকন করেছেন যে, এই শিশু প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর একটি স্তন পান করেন আর একটি স্তন রেখে দেন হালিমার নিজের সন্তানের জন্য। শান্তির অন্যতম সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা। সেই বাল্যকালেই মক্কার মানুষ অবলোকন করে যে, বালক প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সব সময় সত্য বলেন, তাঁর মতো বিশ্বস্তজন দ্বিতীয়টি আর নেই, যে কারণে তাঁরা বালাক প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে নাম ধরে না ডেকে তাঁকে আল-আমীন আস্-সাদীক বলে ডাকে। তাঁর আখলাক, তাঁর ব্যবহার ও আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করে, এমন কি বারো বছর বয়সে তিনি চাচা আবু তালিবের সঙ্গে সিরিয়ায় বাণিজ্য করতে গেলে পথিমধ্যে এক খ্রিস্টান সাধু তাঁকে দেখে প্রাচীন গ্রন্থে বর্ণিত শেষ নবীর লক্ষণাদি তাঁর মধ্যে প্রত্যক্ষ করেন এবং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। সিরিয়া থেকে ফিরে আসার কয়েক বছর পর মক্কা দুটি গোত্রের মধ্যে নিষিদ্ধ মাসে ভীষণ যুদ্ধ প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয়ের দুই বছর পর বিদায় হজের ভাষণে বিশ্ব শান্তির অনুপম নীতিমালা ঘোষণা করলেন। তিনি তাঁর ভাষণে বলেন : হে লোক সকল, তোমরা শোনো, আইয়ামেজাহিলিয়াতের সকল কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, অনাচার আমার পায়ের তলে পিষ্ট হলো। তিনি বলেন : তোমাদের একের ধন-দৌলত, ইয্্যত ও রক্ত অপরের জন্য আজকের এই দিনটির মতো, এই মাসটির মতো আর এই জনপদটির মতো পবিত্র। কোন অনারবের ওপর কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন আরবের ওপর কোন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন কালোর ওপর কোন সাদার শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোনো সাদার ওপর কোনো কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সবাই আদম থেকে এবং আদম মাটি থেকে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া।

শান্তির দূত প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যে শান্তিময় জীবন ব্যবস্থা প্রচার করলেন তাঁর নাম ইসলাম। ইসলাম হচ্ছে সত্য সুন্দর জীবন ব্যবস্থা, পরিপূর্ণ জীবন বিধান। ইসলাম আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একমাত্র দীন। কালাম মজীদে ইরশাদ হয়েছে : নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন হচ্ছে ইসলাম। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ৯ জিলহজ হজের দিনে আরাফাত ময়দানে প্রায় দেড় লাখ হজ পালনকারীর সামনে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বিদায়ী হজের ভাষণ শেষে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বললেন : আমি কি আল্লাহর পয়গাম যথাযথভাবে পৌঁছিয়েছি? আল্লাহ জিজ্ঞেস করলে তোমরা কি জবাব দেবে? তখন অযুত কণ্ঠে সমস্বরে ধ্বনিত হলো : হ্যাঁ, আপনি যথাযথভাবে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, আপনার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আপনি যথাযথভাবে পালন করেছেন- আমরা এই সাক্ষ্যই দেব। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তখন আসমানের দিকে শাহাদত আঙুল দ্বারা ইঙ্গিত করে আঁসুভরা চোখে তাকিয়ে বললেন : হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থেকো, হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থেকো।

আল্লাহর তরফ থেকে ইরশাদ হলো : আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম আর আমার নিয়ামত তোমাদের ওপর পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীনরূপে সানন্দে অনুমোদন দান করলাম। (সুরা মায়িদা : আয়াত ৩)।

এই ইসলাম যারা গ্রহণ করে তারাই মুসলিম। কালাম মজীদে ইরশাদ হয়েছে : ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো ভয় করার মতো এবং তোমরা মুসলমান না হয়ে মরো না।

আরও ইরশাদ হয়েছে : তোমরা আল্লাহর রজ্জু সম্মিলিতভাবে শক্ত করে আঁকড়ে ধরো এবং তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। মুসলমানদের পারস্পরিক অভিবাদন হচ্ছে পরস্পরের জন্য শান্তি কামনা করা। একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে দেখলে বলে : আসসালামু আলায়কুম- তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, জবাবে বলা হয় : ওয়া আলাইকুমুসসালাম- তোমাদের ওপরও শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করে তারা যখন তোমার নিকট আসে তখন তাদেরকে তুমি বলবে আস্্সালামু আলাইকুম। (সূরা আন’আম : আয়াত ৫৪)।

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম শান্তির জন্য যে দু’আ করতেন তা লক্ষণীয় : আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম। -হে আল্লাহ তুমি শান্তি এবং তোমার থেকেই শান্তি, তুমি বরকত দান কর, হে মহিমাময় ও মহানুভব।

শান্তির দূত প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম শান্তির দুনিয়া গড়ার জন্য যে নীতিমালা রেখে গেছেন তা সর্বকালে সবার জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। বিদায়ী হজের ভাষণে তিনি বলেছিলেন : আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি আর তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসূলের সুন্নাহ, তোমরা যদি দুটোকে আঁকড়ে ধরো তা হলে পথভ্রষ্ট হবে না। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যে জীবন বিধান রেখে গেছেন তা পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করে এবং সর্বক্ষেত্রে তাঁর বাস্তবায়ন ঘটিয়েই কেবল মুক্তি আসতে পারে, প্রকৃত সুখ ও শান্তি আসতে পারে, দুনিয়া ও আখিরাতের সত্যিকার ভালাই আসতে পারে। জর্জ বার্নাড শ’র - ভাষায় বলা যায় : If all the world was united under one leader, Muhammad would have been the best fitted man to lead the Peoples of Various creeds, dogmas and ideas to peace and happiness. -সমগ্র দুনিয়াটাকে যদি একত্র করে একজনের নেতৃত্বে আনা যেতো, তাহলে নানা ধর্মমত, ধর্ম বিশ্বাস ও চিন্তার মানুষকে শান্তি ও সুখের পথে পরিচালনার জন্য প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামই হবেন সর্বোত্তম যোগ্য নেতা।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহাম্মদ (সা.) সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: