কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ধনী-গরিবের ব্যবধান হ্রাসে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ ॥ বৈষম্য হ্রাস

প্রকাশিত : ৮ জানুয়ারী ২০১৫
  • প্রবৃদ্ধি অর্জনে অনন্য দৃষ্টান্ত
  • চরম দারিদ্র্য ১৭.৬% থেকে কমে ১২.৪%
  • সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও খাদ্য উৎপাদন- এই চার কারণে দারিদ্র্য হ্রাস
  • প্রশংসা বিশ্বব্যাংকের

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে দেশ। শুধু দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রেই নয়, ধনী-দারিদ্র্যের বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশের যে কয়েকটি অর্জন তার মধ্যে এটি অন্যতম হচ্ছে। কেননা যে হারে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে এটি অন্যান্য দেশের কাছে উদাহরণ বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, দেশের দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশে, যা ২০১০ সালে ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। এ সময়ে চরম দারিদ্র্যের হারও হ্রাস পেয়েছে অনেকটাই। চরম দারিদ্র্যের হার ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৪ শতাংশে।

দেশে দারিদ্র্য হ্রাসের কারণ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বর্তমান সরকার গত মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন বাজেটে সরকারী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট ছিল ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০১৪ সালে এসে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। এটি টাকার অঙ্কে এযাবতকালের সর্ববৃহত সরকারী বিনিয়োগ। তাছাড়া দেশজ আয় ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকার অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল ৭১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সেটি হয়েছে ১০২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরে তা উন্নীত হয়েছে ১৭৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। গত পাঁচ বছর গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশের ওপরে। সার্বিক বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দুটি দেশ জার্মানি ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেই কেবল বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল অবস্থায় অব্যাহত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে যাচ্ছে। তাই দারিদ্র্য কমছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ দারিদ্র্য নিরসনে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জনের চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হাউসহোল্ড ইনকাম এ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভেতেও (হেইজ)। এই জরিপে খানার আয়-ব্যয়, ভোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ জরিপের মাধ্যমে সংগৃহীত খানার ভোগ ব্যয় তথ্য ভোক্তার মূল্যসূচকের ওয়েট নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয় যা দেশের মূল্যস্ফীতি পরিমাপে সাহায্য করে এবং এ তথ্য ব্যয়ভিত্তিক মোট দেশজ উৎপাদন হিসাব নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।

বিবিএস পরিচালিত ২০০০ সালের জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক নয় শতাংশ। ২০০৫ সালের জরিপে সেটি কমে দাঁড়িয়েছিল ৪০ শতাংশে। ২০১০ সালের জরিপে সেটি আরও কমে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক পাঁচ শতাংশে। অবশেষে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের জরিপের প্রাথমিক ফলে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সেটি হয়েছে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীদের সংখ্যাও কমে এসেছে। ২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ সাল পর্যন্ত পর্যায় ক্রমে চরম দারিদ্র্যের হার হচ্ছে ৩৪ দশমিক তিন শতাংশ, ২৫ দশমিক এক শতাংশ, ১৭ দশমিক ৬ এবং ২০১৩-১৪ সালে প্রাথমিক ফলে ছিল ১৩ দশমিক এক শতাংশ, যা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে হয়েছে ১২ দশমিক চার শতাংশ।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ১৯৭৩-৭৪ সাল হতে খানার ব্যয় নির্ধারণের জন্য একটি জরিপ চালিয়ে আসছিল। ২০০০ সালে এ জরিপের প্রশ্নপত্রে অনলাইন মডিউল বিশদভাবে সংযোজন করা হয়, ফলে ২০০০ সাল হতে এ জরিপ ‘হেইজ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এ পর্যন্ত ১৫ বার এ জরিপ হয়েছে। ২০১০ সালে সর্বশেষ এ জরিপ হয়। প্রাথমিকভাবে অনিয়মিত হলেও এ জরিপ ১৯৯৫ হতে ৫ বছর পর হয়ে আসছে। পরবর্তী হেইজ চলতি ২০১৫ সালে হবে। হেইজ তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ও সমাদৃত। বিশ্বব্যাংক ১৯৯৫ সাল থেকে এ জরিপ পরিচালনায় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি ১৯৯৫ থেকে জরিপের ফলের ওপর পোভার্টি দিয়ে বাংলাদেশ পোভার্টি এ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট প্রণয়ন ও প্রকাশ করে আসছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচীতে সবসময় বরাদ্দ বাড়িয়ে চলছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দের প্রাক্কলিত জিডিপির দুই দশমিক ১৮ শতাংশ এবং বাজেটে ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ করা হয়েছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ব্যয় ছিল ১১ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা, যা. ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরও বেড়েছে।

বলা হয়েছে সরকারের দারিদ্র্য্যবান্ধব নীতি ও বিচক্ষণ কর্মসূচীর কারণে বাংলাদেশে এখন খাদ্যাভাব নেই। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার সুলভ মূল্যে খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে নানামুখী আয়বর্ধক কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। তুলনামূলকভাবে অতিদরিদ্র এলাকাসহ (উত্তরাঞ্চল, উপকূলবর্তী এলাকা ও যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চল ইত্যাদি) এলাকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতি-দরিদ্রের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচীর আওতায় প্রতিবছর গড়ে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে ৮ লাখ লোকের ৮০ দিনের কর্মসংস্থান করা হয়েছে। এতে গত পাঁচ বছরে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে মঙ্গা উধাও হয়ে গেছে। চালের মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, গত চার বছরে শ্রমিকদের মজুরি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। একদিনের মজুরি দিয়ে একজন শ্রমিক প্রায় সাড়ে ৮ কোটি চাল কিনতে পারছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে শ্রমিকের এক দিনের মজুরি দিয়ে ৫ দশমিক ৭ কোটি চাল কেনা যেত।

২০১৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ইকোনমিক আপডেট প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দারিদ্র্য নিরসনে ও মানব উন্নয়ন অগ্রগতি এখনও বজায় আছে। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে, তবে যে তুলনায় হওয়ার কথা ছিল সে তুলনায় হয়নি। গত বছরের জানুয়ারি মাসের যে রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়েছিল দেশের অর্থনীতি তা পুনরুদ্ধার হচ্ছে। এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আছে, কিন্তু অনিশ্চয়তাও আছে। প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমেছে। ফলে বেসরকারী বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মানে হচ্ছে না। দারিদ্র্যের হার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যে হারে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে সেই ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে ২০০০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেখানে দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বর্তমানে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসার যে হিসাব সরকারীভাবে পাওয়া গেছে তা যুক্তিসঙ্গত।

অন্যদিকে সদ্যসমাপ্ত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ এশিয়ায় বৈষম্যবিষয়ক বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে (এ হিসাব আর্থিক সূচকে নির্ণীত) বলা হয়েছেÑ ধনি-গরীবের বৈষম্য পরিস্থিতির উন্নতির ক্ষেত্রে ভারতকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, পেছনে আছে আরও চারটি দেশ। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থান দখল করেছে। ধনী-গরিবের বৈষম্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এ অবস্থানকে তুলনামূলক ভাল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আট দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পেছনে। বাংলাদেশের পেছনে থাকা দেশগুলো হচ্ছে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপ। প্রতিবেদন বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বৈষম্য পরিস্থিতি শূন্য দশমিক ৩১, বৈষম্য সবচেয়ে কম আফগানিস্তানে, প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ আর সবচেয়ে বেশি ভুটানে শূন্য দশমিক ৩৬। এ সূচকে ভারতের অবস্থান শূন্য দশমিক ৩২।

প্রতিবেদন বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশে এখনও অসমতা রয়েছে। কেননা ১০ শতাংশ ধনী লোকের হাতে মোট ৩৫ শতাংশ সম্পদ আছে আর ১০ শতাংশ গরিব লোকের কাছে আছে দুই শতাংশ সম্পদ। এটা কাম্য হতে পারে না।

প্রকাশিত : ৮ জানুয়ারী ২০১৫

০৮/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: