রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘যাও, বাচ্চাদের সঙ্গে খেলো!’

প্রকাশিত : ৭ জানুয়ারী ২০১৫
  • মোঃ মামুন রশীদ

নবেম্বর, ১৯৮৯। ভারতীয় ক্রিকেট দলের পাকিস্তান সফর। দলের সঙ্গে আনকোরা দুই ক্রিকেটার। এর মধ্যে ১৬ বছর বয়সী কিশোর শচীন রমেশ টেন্ডুলকর মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে আর ২১ বছর বয়সী পেসার সলিল আঙ্কোলা। তখনও কেউ জানতে পারেননি করাচিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিষেক টেস্ট খেলার পরই সলিল সমাধি ঘটবে আঙ্কোলার টেস্ট ক্যারিয়ারে। কেউ ধারণা করতে পারেননি এখানে যে কিশোর শচীনের অভিষেক হবে তিনিই পরবর্তীতে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে বিশ্বের সর্বাধিক রান ও সেঞ্চুরির মালিক বনে যাবেন। তবে বেশ ভাগ্যবানই ছিলেন তিনি। না হলে হয়ত কিছুটা দেরিতেই টেস্ট ক্রিকেটে যাত্রা শুরু হতো। এত কম বয়সে আন্তর্জাতিক কোন ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা যার নেই, মাত্র ৫ বছর প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া ক্রিকেটে যার পথচলা সেই শচীন সুযোগটা পেয়েছিলেন মূলত দেশের ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সঙ্গে ক্রিকেটারদের ঝামেলা চলার কারণেই। তবু ওয়াসিম আকরাম, ইমরান খান, ওয়াকার ইউনুসের মতো ভয়ঙ্কর পেস আক্রমণ এবং আবদুল কাদিরের মতো বিধ্বংসী লেগস্পিনারে গড়া অন্যতম সেরা টেস্ট দল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শচীনের অভিষেক হওয়াটা বেশ অভাবনীয়ই বলা যায়। শেষ পর্যন্ত অভিষেক হলেও প্রথম ওভারেই ওয়াসিমের ভয়ঙ্কর তিনটি বাউন্সারে বেসামাল হয়ে পড়েছিলেন কিশোর শচীন। তখন পাক দর্শকরা চিৎকার করেছিলেন, ‘স্কুল বালক, ফিরে যাও এবং খেলো বাচ্চাদের সঙ্গে।’ এই একই শব্দগুচ্ছ তাঁকে শুনতে হয়েছিল পরবর্তী সফরেই। এবার ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রাইস্টচার্চে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টেই তাঁকে এ কথাগুলো বলেছিলেন কিউই ক্রিকেটাররাই।

নিজ এলাকা মুম্বাইয়ের বাইরে খেলতে গেলেই শচীন পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা করতেন কিছু না কিছু। মা-মাসীদের জন্য শাড়ি, বাবা-চাচার জন্য শার্ট। যখন প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে গেলেন, তাও আবার রাজনৈতিকভাবে এবং ক্রিকেট মাঠে ভয়াবহ প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের মাটিতে তখনও একই কাজ করতে ভোলেননি। তবে দলের বাকি ক্রিকেটাররা বেশ দুঃশ্চিন্তা ও সমস্যায় ছিলেন। বিসিসিআই বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল এবং প্রতিবাদে পাক সফরের দলে থাকা সিনিয়র ক্রিকেটাররা ম্যাচ ফি বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পর বিসিসিআইকে না জানিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি প্রীতি আসরে খেলতে গিয়েছিলেন ক্রিকেটাররা যার কারণেই ওই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। সেটা আদালত পর্যন্ত গড়ালে নিষেধাজ্ঞা বাতিল হয়েছিল বিচারকের নির্দেশে। কিন্তু বিসিসিআইয়ের সঙ্গে অবস্থার উন্নতি হয়নি। তবে শচীন ও আঙ্কোলাকে তখন ভারতীয় অধিনায়ক কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্ত এসব বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে খেলার প্রতি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। লাহোরে পা রাখার পর সন্ধ্যায় সেখানে কারফিউ জারি থাকায় বের হওয়াতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবু শচীন তাঁর পরিবারের সবার জন্য কিছু কিনতে বেরিয়ে পড়েন এবং জুতা ও সিøপার কিনে আনেন। তবে অনুশীলন ম্যাচে খেলে ভালই করেছিলেন পাকিস্তান বোর্ড প্যাট্রন একাদশের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের হয়ে ৫০ টেস্ট খেলা বাঁ-হাতি অফস্পিনার ইকবাল কাসিমের বলে আউট হওয়ার আগে ৪৭ রানের ইনিংস খেলেন। তখন ক্রিকেট মাঠের চিরশত্রু দেশের স্থানীয় দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তবু তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে সবার ধারণা ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে ধাতস্থ করে তোলা এবং বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দিতেই এ সফরে শচীনকে রাখা হয়েছে দলে। তিনি হয়ত সুযোগই পাবেন না। কিন্তু বিধাতা ঠিকই ভবিতব্য ঠিক করে রেখেছিলেন। শচীনের টেস্ট যাত্রা শুরু হয়ে যাবে সেটাও লিখে রেখেছিলেন।

করাচিতে প্রথম টেস্টের আগের রাতে তাঁকে জানানো হয় একাদশে জায়গা পেয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে আঙ্কোলাকেও অভিষেক ঘটানো হবে। দুজনকে একইকক্ষে থাকতে দেয়া হয় হোটেলে। ওয়াসিম-ওয়াকারদের মোকাবেলা করতে হবে সেটা নিয়ে কোন চিন্তাই ছিল না শচীনের। তিনি চেয়েছিলেন শুধু ভারতীয় জার্সিতে ভাল কিছু করে দেখাতে। যদিও অনভিজ্ঞ শচীনের জন্য সেটা বেশ কঠিনই ছিল। কারণ প্রথম দিনই মধ্যাহ্ন বিরতির পর এক শ্মশ্রƒম-িত লোক মাঠে প্রবেশ করে কপিল দেবকে হেনস্তা করেছিলেন পাকিস্তানে আসার জন্য। তবে মাঠের ভেতরে বাইরে এসব বিষয়গুলো নিয়ে তাঁকে না ভাবার জন্য শ্রীকান্তসহ দলের সিনিয়র খেলোয়াড়রা সবসময়ই পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন। পাকিস্তানের প্রথম ইনিংস ৪০৯ রানে শেষ হওয়ার পর ব্যাট করতে নামা ভারত বেশ শোচনীয় অবস্থার মধ্যে পড়েছিল। ওয়াসিকম-ওয়াকারের দ্বৈত আক্রমণে ৪১ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে বসে ভারত। ৬ নম্বরে ব্যাট করতে নামেন শচীন। কিন্তু নিজের প্রথম বলটিই তিনি মোকাবেলা করেন ওয়াসিমের। খর্বাকায় এবং কিশোর শচীনকে দেখে যেন আরও আগ্রাসী হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি এ পেসার। টানা তিনটি বাউন্সার দিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলেন শচীনকে। তখনই দর্শকরা চিৎকার করে বলেন, ‘স্কুল বালক, ঘরে ফিরে যাও এবং বাচ্চাদের সঙ্গে খেলো!’ শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৮ মিনিট ক্রিজে থেকে ২৪ বল খেলে ১৫ রান করতে পেরেছিলেন শচীন। পাকিস্তানের হয়ে অভিষিক্ত ওয়াকারের ইয়র্কারে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন। অভিষেক টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে আর ব্যাট করার সুযোগ হয়নি তাঁর। ম্যাচ ড্র হয়ে যায়। পরের দুই টেস্টে দারুণ খেলে দুটি হাফসেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন।

পাকিস্তান সফরে অভিষেকেই মেধার ছাপ দেখানোয় পরের সফরেই নিউজিল্যান্ডগামী দলেও ঠাঁই হয় শচীনের। সেবার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরুর পর সবচেয়ে কঠিন ও কঠোর পরিশ্রমের অনুশীলন করেছিলেন লিটল মাস্টার। সর্বকালের অন্যতম সেরা বাঁ-হাতি স্পিনার বিষেন সিং বেদী তখন ভারতীয় দলের ম্যানেজার এবং নিউজিল্যান্ডের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী পরিবেশের সঙ্গে ক্রিকেটারদের মানিয়ে তুলতে ক্রিকেটারদের অনেক পরিশ্রম করিয়েছেন তিনি। প্রথম টেস্টের আগে পাহাড়-পর্বতে ঘেরা প্লাইমাউথ শহরটিতে ক্রিকেটারদের দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত দৌড়ানোর অনুশীলন করিয়েছেন বেদী। এখানে সফরের অনুশীলন ম্যাচ ছিল ভারতের। তাই কিউই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে তুলতে ক্রিকেটারদের এমনকি পর্বতের ওপরে দৌড়ে ওঠা-নামাও করতে হয়েছে। অবশেষে ক্রাইস্টচার্চে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসেই ব্যর্থ শচীন। একেবারে গোল্ডেন ডাক। ড্যানি মরিসনের বলে সাজঘরে ফেরার সময় এবার আর দর্শক নয় স্বয়ং কিউই ক্রিকেটাররা তাঁর ব্যর্থতা নিয়ে কটাক্ষ করতে ভোলেননি। তাঁরা মাথা নিচু করে সাজঘরের দিকে হাঁটা দেয়া শচীনকে উদ্দেশ করে বিদ্রƒপ করে বলেন, ‘খুব ভাল হয় এখানে না খেলে যদি স্কুলে ফিরে যাও এবং বাচ্চাদের সঙ্গে খেলো!’

সূত্র : শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’

প্রকাশিত : ৭ জানুয়ারী ২০১৫

০৭/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: