রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ক্রিকেট কোচের হকি ভাবনা!

প্রকাশিত : ৭ জানুয়ারী ২০১৫
  • ইমতিয়াজ আহ্্মাদ

হকি খুব একটি উত্তেজনাপূর্ণ খেলা। ফুটবল খেলার সঙ্গে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন ১১ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে একজন গোলকিপার, গোল, এগুলো ছাড়াও আরও কিছু। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, দ্রুত গতি খেলাটিকে খুবই আকর্ষণীয় করে তোলে।

প্রতিটি খেলারই একটি শারীরিক, একটি কৌশলগত ও একটি মানসিক দিক থাকে। সেদিক থেকে শারীরিক যোগ্যতার বিবেচনায় হকি খেলাটির জন্য গতি বা স্পীড এবং দম বা এন্ডুরেন্স খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একজন খেলোয়াড়কে তার সর্বোচ্চ গতিতে দৌড়ে আক্রমণ করতে হয়। নতুবা বিপক্ষের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা তাকে প্রতিহত করে বল কেড়ে নেবে। আবার, বিপক্ষ দল যখন আক্রমণ করছে তখন তাদের প্রতিহত করার জন্য রক্ষণভাগে এসে বাধা দিতে হবে। ফলে এ খেলায় গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হকি খেলাটি ৩৫ মিনিটের দুই অর্ধে মোট ৭০ মিনিট ধরে চলে। ফলে খেলাটিতে আক্রমণ আর প্রতি আক্রমণ চলতে থাকে ৭০ মিনিট ধরে। ফলে এই ৭০ মিনিট ধরে গতি নিয়ে খেলতে গেলে দমের প্রয়োজন। আর তাই এই খেলাটিতে গতি আর দম অর্থাৎ স্পীড আর এন্ডুরেন্স শারীরিক সক্ষমতার এ দুটো নিয়ামক খুবই জরুরী। সেইসঙ্গে আছে এজিলিটি বা ক্ষিপ্রতার বিশেষ ভূমিকাÑ যেমন ডজিং করা বল, কাটানো ইত্যাদি। আর কৌশলগত দিক বিবেচনা করলে কৌশলের কিন্তু বিশেষ ভূমিকা রয়েছে হকি খেলায়। যেমন স্টিক ওয়ার্ক, পাসিং, রিসিভিং, স্কুপ, হিত ইত্যাদি। তবে আগে যখন ঘাসের মাঠে হকি খেলা হত তখন হকি খেলায় টেকনিক বা কৌশলের যে ভূমিকা ছিল কৃত্রিম মাঠে খেলা চলে যাওয়ার পর টেকনিকের গুরুত্ব বেশ খানিকটাই কমে গেছে। কৃত্রিম মাঠে বল চলে দ্রুত। ফলে একজন খেলোয়াড়কে বলের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই খুব দ্রুত দৌড়াতে হয়। আর দ্রুত দৌড়াতে হলে স্পীড বা গতির প্রয়োজন। আবার অনেকক্ষণ ধরে দ্রুত দৌড়াতে হলে দমেরও প্রয়োজন রয়েছে। আর এভাবেই শারীরিক সক্ষমতা প্রাধান্য বেড়ে গেছে। কৃত্রিম মাঠ খেলাতে গতি বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। গতির জন্যই খেলাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। যে কোন খেলার মূল পৃষ্ঠপোষক কিন্তু দর্শক। গতিপূর্ণ খেলা যে কারোরই পছন্দ। ভেবে দেখুন আক্রমণ ভাগের একটি খেলোয়াড় বল নিয়ে ছুটে চলেছে, কিন্তু তার বল নিয়ে ছুটে চলার মধ্যে কোন গতি নেই। তবে কি তার খেলা উপভোগ্য হবে নাকি নির্জীব মনে হবে? অবশ্যই উপভোগ্য হবে না। আর তাই সেই গতিই দর্শক টেনে নিয়ে আসবে। কৃত্রিম মাঠ খেলাকে গতি দিলেও টেকনিক বা কৌশল বেশ খানিকটা অবদমিত বা উপেক্ষিত হয় কৃত্রিম মাঠে। এটা আমার নয় হকি বিশেষজ্ঞদের মতামত। আরেকটি বিষয় খেলাকে উপভোগ্য করে তোলে আর সেটা হলো ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। অর্থাৎ একজন খেলোয়াড়ের বল রিসিভ, পাস করা, ডজ দেয়া, ট্যাকল করা, বল নিয়ে ছুটার কায়দা বা কৌশল এগুলোকেই দর্শক বেশি পছন্দ করে। যেমন ফুটবলার মেসির কথাই বলি। মেসির খেলা দর্শক পছন্দ করে কেন? তার ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আর কলাকৌশলের জন্য। যেমন শচীন টেন্ডুলকর বা আমাদের তামিম ইকবাল যখন ব্যাটিং করে তখন দর্শক তাদের খেলা উপভোগ করে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের কারণে। যেখানে টেকনিক বা কলা কৌশল প্রয়োগের সুযোগ সীমিত সেখানে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য প্রদর্শনের সুযোগও কম। ফলে সেদিক দিয়ে কলা কৌশলের সীমাবদ্ধতাটা দর্শক প্রিয়তার জন্য নেতিবাচক।

যাই হোক, আলাপ করছিলাম টেকনিকের কথা। আবারও বলছি কৃত্রিম মাঠে যে টেকনিক প্রদর্শনের সুযোগ কম আর এটা বিশেষজ্ঞদের মতামত। তারা যুক্তি দেন এভাবে। অলিম্পিকে কৃত্রিম মাঠ আসার আগে ভারত পাকিস্তানের আধিপত্য ছিল। কারণ এই অঞ্চলের হকি খেলোয়াড়দের কবজি বা রিস্টের নমনীয়তা, ক্ষিপ্রতা ও শক্তি অসাধারণ। তারা টেকনিকের দিক থেকে অসামান্য ছিল। এ জন্যই অলিম্পিকে পাকিস্তান ৪ বার আর ভারত হকিতে স্বর্ণ জিতেছিল ৮ বার। কিন্তু কৃত্রিম মাঠ আসার পরপরই বিশ্ব হকিতে উপমহাদেশের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে। অন্তত পরিসংখ্যান তাই বলে। বর্তমানে বিশ্ব হকিতে ভারত ও পাকিস্তানের সেই দুর্দান্ত প্রতাপ তো দূরে থাক অবস্থা ওরা এক্কেবারে নগণ্যের ঘরে।

প্রকৃতপক্ষে আমার জানা নেই ঠিক কি কারণ কাজ করে ছিল হকিকে কৃত্রিম মাঠে বন্দী করার পেছনে। তবে অন্যদিক থেকে চিন্তা করলে আন্তর্জাতিক হকি সংস্থার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কিছুটা অবিবেচকের পরিচয় দিয়েছে। কারণ হকির মূল শক্তি ভারত ও পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ নয়। আর কৃত্রিম মাঠ বেশ একটা ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। যেটা নাকি ভারত পাকিস্তানের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশের পক্ষে বহন করা কঠিন ছিল। ফলে তাদের দেশে মাঠের সংখ্যা কমে যাবে। আর মাঠ অপ্রতুল হলে খেলার প্রসার ঘটবে না। ফলে হকি খেলার বিকাশ বিঘিœত হবে।

এমতাবস্থায় একটি বিশেষ উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। আমার মনে হয় উদ্যোগটি নিয়ে বিশ্ব হকির বিশেষ উন্নয়ন ঘটবে। চলুন একটু লন টেনিসের দিকে আলোকপাত করি। লন টেনিসের বিভিন্ন টুর্নামেন্ট বিভিন্ন কোর্ট অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের সারফেসে হয়ে থাকে। যেমন ক্লে কোর্ট, গ্রাস কোর্ট ইত্যাদি। এবার একটু চোখ বুলাই ক্রিকেটের উপর। টুয়েন্টি টুয়েন্টি ক্রিকেট আজ ক্রিকেট খেলাকে চরম উত্তেজনাকর ও জনপ্রিয় করে দিয়েছে। এই টুয়েন্টি টুয়েন্টি কিন্তু আইসিসি উদ্ভাবিত ফরম্যাট নয়। ইংলিশ ক্রিকেট বোর্ড নিজেদের ঘরোয়া ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করেছিল। এই ফরম্যাটের জনপ্রিয়তা ও কার্যকারিতা দেখে আইসিসি সুবিবেচকের মতো এই ফরম্যাটটিকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজের অধীনে বিশ্ব টুয়েন্টি টুয়েন্টি চালু করে। আমার চিন্তার অনুপ্রেরণা এই ক্রিকেট আর লন টেনিস। আর চিন্তাটা হলো পূর্বের ন্যায় ঘাসের মাঠেও হকি খেলা হবে। আইস হকি কিন্তু কৃত্রিম মাঠে খেলা হয় না। আইস হকির সারফেসটা বরফের তৈরি। বরফের তৈরি মাঠে যদি হকি খেলা হতে পারে তবে ঘাসের মাঠে হকি খেলতে দোষের কি আছে? লন টেনিসতো ভিন্ন ভিন্ন সারফেসে হয়ে থাকে। ঠিক অনুরূপভাবে হকিও ঘাসের মাঠে খেলা হবে। ভারতে কিন্তু এখনও কিছু কিছু জায়গায় ঘাসের মাঠে বিভিন্ন হকি টুর্নামেন্ট হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যাপারটির কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। সেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য আমাদের হকি ফেডারেশন প্রাথমিকভাবে উপমহাদেশীয় হকি ফেডারেশনগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কাজ শুরু করতে পারে। উপমহাদেশীয় দেশগুলো ঐক্যমত্যে পৌঁছালে এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে এবং পরবর্তীতে আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গেও ব্যাপারটা আলোচনা করা হবে। আসলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো এই ব্যাপারে সহজেই একমত হবে। প্রস্তাবনা খুবই সহজ ও সরল। হকি খেলা ঘাসের মাঠেও অনুষ্ঠিত হবে এবং একে এই আইচ এফ স্বীকৃতি দেবে। দেশগুলো তাদের মধ্যে বিভিন্ন সিরিজ আর টুর্নামেন্ট খেলবে। আর যখন অনেকগুলো দেশের সম্মতি থাকবে তখন আই এইচ এফ বেশি সময় ব্যয় না করেই স্বীকৃতি দিয়ে দিবে। আর ব্যাপারটি তখনই সম্ভব হবে যখন অনেকগুলো দেশ এই ব্যাপারে একমত হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের হকি খুব একটা ভাল সময় পারি দিচ্ছে না। যদিও সাম্প্রতিককালে জাতীয় দল উন্নতির ছাপ রেখেছে। হকি ফেডারেশনের কারণেই আজ আমাদের হকি কঠিন সময় পারি দিচ্ছে। ঘাসের মাঠে হকিকে ফেরানোর উদ্যোগ এদেশের হকিকে দিতে পারে নতুন প্রাণ। ঘাসের মাঠে হকি হলে এদেশে হকির ব্যাপক প্রসার ঘটবে এবং বাহফেকে কৃত্রিম মাঠের জন্য ব্যয় সঙ্কুলানোর দুশ্চিন্তা থেকে কিছুটা হলেও নিষ্কৃতি মিলবে, দেশে হকি খেলার প্রসার ঘটবে। এমনকি বাহফে চলে আসতে পারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আর এরই ফলস্বরূপ আকর্ষণ, জনপ্রিয়তা, আর্থিক স্বচ্ছলতা এ সবই ছুটে আসতে পারে বাংলাদেশের হকিতে।

লেখক : সাবেক ক্রিকেটার, কোচ

প্রকাশিত : ৭ জানুয়ারী ২০১৫

০৭/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: