আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বছরের পথচলা শুভ হোক

প্রকাশিত : ৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

কালের প্রবাহে আরেকটি বছর আমরা হারালাম। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক নিয়ম নিয়ে খুব একটা বেশি কিছু বলার থাকে না। বিশ্ব প্রকৃতির নিয়মে এমনটা প্রতিবছর আসবে যাবে। অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি অনেকেই অপছন্দ করেন। কেননা তা চর্বিত চর্বণ হয়ে যায়। তবে মনে রাখা দরকার আজ যা ঘটে গেল, তা আগামী দিন ইতিহাস। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে অতীতের সাহায্য নিতে হয়, করতে হয় নির্ভর। তবে আগামীর চিন্তাটাই অগ্রগণ্য। আগামী দিনের স্বপ্ন ও এর বাস্তবায়নই এগিয়ে নেয় সমাজ সভ্যতা ও প্রগতি।

নতুন বছরে আশা উদ্দীপনা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এ বিষয়টা একেবারে সহজাত। বাংলাদেশও ভাল থাকবে এ কামনা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের কাম্য। আর এ কথা অনিবার্য যে এ দেশকে ভাল থাকতে হলে সবার আগে ভাল থাকতে হবে দেশের সিংহভাগ নাগরিক যারা সমাজ-জাতির শক্ত মেরুদ- তরুণ সমাজকে। তরুণ সমাজের ওপরই নির্ভর করে বেশিরভাগ উন্নতি, উন্নয়ন আর স্থিতিশীলতা।

তরুণের আগামী পথচলার মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। গত বছর শিক্ষাক্ষেত্রে তারুণ্যের সাফল্য ছিল অব্যাহত। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, ঐতিহ্যবাহী একটি ছাত্র সংগঠনের নেতিবাচক কর্মকা-ে শিক্ষাঙ্গন ছিল অস্থির। তাদের কিছু আত্মঘাতীমূলক সিদ্ধান্ত খোদ সরকারকেও করে বিব্রত। দেশবাসীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। অভিভাবকরাও ছিলেন সমান উৎকণ্ঠিত। এ ছাত্র সংগঠনটির মধ্যে কিছু অনুপ্রবেশকারী বিশেষত ছদ্মবেশী জঙ্গী, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির মদদপুষ্ট শিবির ও প্রতিক্রিয়াশীল নষ্ট তারুণ্য এর জন্য দায়ী। এমন নষ্ট তারুণ্য আগামীতে যে কেউ দেখতে চায় না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শিক্ষাক্ষেত্রে তারুণ্যের যে ইতিবাচক অর্জন সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেছে, তা যেন অব্যাহত থাকেÑ এ প্রত্যাশা তরুণ সমাজের কাছে খুব বেশি চাওয়ার নয়।

শিক্ষার ব্যাপারে যে বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য তা হলো অবশ্যই সুশিক্ষা ও সময়ের দাবি মিটিয়ে গ্রহণ করে তার যথোপযুক্ত প্রয়োগ। বিশ্ব এখন একটা গ্লোবাল ভিলেজ বৈ অন্য কিছু নয়। বিশ্ব হাতের মুঠোয়। আর এটা অবশ্যই ঘটেছে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে। এ প্রযুক্তির শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি, প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বর্তমান সরকার ভিশন-২০২১ রূপকল্পে আইটি সেক্টরকে অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। আইটি সেক্টরে মেধা, প্রতিভার বিকাশে সরকারী বাজেট বা বরাদ্দ অতীতের তুলনায় বর্তমানে বেশি। আগামী দিন এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তরুণ সমাজ দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করবে এ প্রত্যাশা করা যেতেই পারে। সেক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ক্যারিয়ার এ সেক্টরে গড়তে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির স্বার্থে।

একটি বিষয়ের উল্লেখ না করলেই নয়Ñ তরুণ সমাজ আগামী দিনে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে শুধু এ সেক্টরই নয়, দেশে-বিদেশে নিজেকে বিকশিত করবে অধিক দক্ষতা ও সততার সঙ্গে। পরমুখাপেক্ষী হয়ে নয়, প্রয়োজনে স্বল্প পুঁজি নিয়ে হলেও বেকার বসে না থেকে কর্মযাত্রা শুরু করবে। দেশে-বিদেশে এখন আউটসোর্সিং ব্যবস্থা উন্মুক্ত। প্রয়োজনে এ ব্যবস্থার সহযোগিতা নিয়ে আত্মনির্ভরশীলতায় পা দিতে পারে। ক্যারিয়ার গড়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থ আয় একজন তরুণের জন্য শেষ কথা নয়। তাকে সৃজনশীলতার দায় বহন করতে হবে। স্ব স্ব ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবন, সৃষ্টি, আবিষ্কারের মাধ্যমে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনে প্রতিযোগী, আগ্রহী হতে হবে। কারও প্রেরণা, অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী হয়ে নয়; একেবারে স্বপ্রণোদিত হয়েই এমন পদক্ষেপ নেয়া বরং ভাল।

পৃথিবীর কোন প্রান্তেই যে কোন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটুক না কেন, তা বোধকরি প্রথমে আসে তরুণ প্রজন্মের হাতে। আমরা এরই মধ্যে কম্পিউটার, ট্যাব থেকে শুরু করে মোবাইলের ব্যবহার দেখেছি এবং দেখছি। প্রতিটি বস্তুরই ইতিবাচক নেতিবাচক দিক আছে বলে আমরা জানি। প্রযুক্তির ব্যবহার এখন তরুণ প্রজন্মের চরিত্রের ওপর প্রভাব ফেলছে। প্রযুক্তির দোষ নয়, দোষ-গুণ ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারের কুপ্রভাবের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। এর ঢেউ বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে। তরুণ সমাজের অবক্ষয়ও আমরা দেখেছি। তথ্য ও প্রযুক্তির অপব্রবহার দেখে মাঝে মাঝে আমরা আমরা হয়েছি আশাহত ও উদ্বিগ্ন। আমাদের আশা, বিশেষত ইন্টারনেট-ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় অশ্লীল ছবি পোস্ট, কাউকে আহত করে এমন মন্তব্য থেকে বিরত থাকবে এই প্রজন্ম। চলতি বছর ও আগামী দিন আমাদের তারুণ্য এমন নষ্টচক্র থেকে মুক্ত থাকবে বলে প্রত্যাশা।

প্রযুক্তিকে আনন্দ ও মনোরঞ্জনের মাধ্যম হিসেবে না নিয়ে দেশজ সংস্কৃতি চর্চা বা সাংস্কৃতিক আবহে নিজেকে যুক্ত রাখা এক্ষেত্রে আবশ্যক। বিদেশী নয় দেশজ সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেবে বলেই আশা। বাঙালীর হাজার বছরের সংস্কৃতির অনুষঙ্গগুলো ধারণ ও চর্চার বিকল্প নেই। বিদেশী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ কোনভাবেই রোধ করা যাবে নাÑ এ কথা সত্য। সেটা শুধু পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। মনোরঞ্জন বা আনন্দ উপভোগের মাধ্যম যেন না হয়। অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকরের দাবিতে গত বছর তরুণ প্রজন্ম যেভাবে সোচ্চার ছিল তাতে আশাব্যঞ্জক হওয়া যেতে পারে এই ভেবে যে, বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করে এগিয়ে চলেছে। আগামী দিনে এমনি করে তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন, ইতিহাস বিকৃতির প্রতিবাদে মুখর হওয়ার দৃপ্ত শপথে বলীয়ান দেখতে জাতি প্রত্যাশা করে। গণজাগরণ মঞ্চ বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকরের দাবিতে গড়ে ওঠা নিকট অতীতের তারুণ্যময় আন্দোলন এ কথাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়Ñ তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। এ দায়বদ্ধতার প্রকাশ আশান্বিত করে; বেড়ে যায় প্রত্যাশা। রাষ্ট্র, সমাজের যে কোন ক্রান্তিকালে তারা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এটা সময়ের দাবি। পরিবারসহ জ্যেষ্ঠ নাগরিকের প্রতিও রয়েছে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। সাম্প্রতিক একটি প্রবণতা সবাইকে করেছে আহত। দেশের সেই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানীর অলিগলিতে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে ‘ইয়াবা’ নামের এক ঘাতক নেশাদ্রব্য, যা কি না মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক। এর সিংহভাগই সেবন করছে যুবসমাজ। আতঙ্কজনক পরিস্থিতি প্রায়ই উঠে আসছে গণমাধ্যমে। ফেনসিডিল, হেরোইনের জায়গা করে নিয়েছে এই ইয়াবা। কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও জড়িয়ে পড়ছে এই ট্যাবলেট সেবনে। চলতি বছর তারুণ্য এই নষ্টবস্তু শুধু ত্যাগ নয়, এ দেশে প্রবেশ, বিপণন, বিতরণ, সেবন প্রতিরোধ করে দেশ-সমাজ ‘মাদকমুক্ত’ করবে বলে একটু অধিক প্রত্যাশা। তারুণ্যের আগামী চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ হোক। জয়তু তারুণ্য!

প্রকাশিত : ৬ জানুয়ারী ২০১৫

০৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: