কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

অনলাইন সাহিত্যচর্চা এবং তরুণদের লেখালেখি

প্রকাশিত : ৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • মারুফ রায়হান

খুব বেশিদিন আগের কথা তো নয়। সমমনা সাহিত্যপিপাসু তরুণরা মিলে চাঁদা তুলে পত্রিকা বের করতেন। তাতে থাকত নিজেদেরই লেখা গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ। একটু চালাকচতুর নবীনরা বিজ্ঞাপন যোগাড় করতেন সেসব ছোট কাগজের জন্য। তাতে পকেট অতটা আর খালি হতো না। বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারির সময় ব্যাংক এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থা একটা বাজেট রাখত ছোটকাগজ বা সংকলনের জন্য। এখন সেই আবেগ অনেকটাই প্রশমিত কিংবা বলা চলে অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। উদারভাবে আর তারা অর্থ বরাদ্দ দেয় না সাহিত্যের ছোট কাগজগুলোকে।

নবীন-তরুণ লেখকদের রচনা প্রথম প্রথম জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতায় তেমন ঠাঁই হতো না। এখন নবীন-তরুণদের লেখা নিয়েও সাপ্লিমেন্ট বের হয়। তারপরও তারা আর পরনির্ভরশীল নন। আজকের যুগে ফেসবুকই হয়ে উঠেছে তাদের লেখার সবচেয়ে বড় ধারক। বলতে পারি খোলা খাতা। তবে তার একটা প্রেক্ষাপটও রয়েছে। দেশে অনলাইন বা ইন্টারনেট সুলভ হওয়ার আগে নবনির্মীয়মান নবীনদের লেখার জায়গা ছিল ব্লগ। সামহোয়্যার ইন ব্লগসহ কয়েকটি ব্লগ এক্ষত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। ধর্ম বা রাজনীতি বিষয় নিয়ে লেখা কিংবা অশ্লীল না হলে সে লেখা অতি সহজেই ব্লগে জায়গা করে নিচ্ছে। যদিও সচলায়তনসহ কোনো কোন দায়িত্বশীল ব্লগ সুস্পষ্ট নীতিমালার আলোকে লেখা প্রকাশ করে থাকে। তাদের কিছু নীতিমালা এমন : ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুক্তিসংগ্রাম ও অসাম্প্রদায়িকতার মতো বিষয়গুলোকে আক্রমণ করে লেখা পোস্ট, মন্তব্য বা অন্যান্য উপাদান সচলায়তন যে কোন সময় অপসারণ করতে পারেন। কপিরাইট লঙ্ঘন করে এমন কোন উপাদান সচলায়তন ধারণ করতে সম্মত নয়।...।’ যা হোক কোন কোন দৈনিক পত্রিকাও পত্রিকার নামে ব্লগ ওপেন করে নবীনদের লেখা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। তবে দেশের প্রধান দুটি অনলাইন বার্তা সংস্থা তাদের সাহিত্য বিভাগ সংযুক্ত করলে তরুণ লেখকরা তাতে লেখা দেয়ার সুযোগ পান।

আরও একটি ব্যাপার নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটায়। বিনে পয়সায় নিজের নামে ব্লগ খোলার সুযোগ করে দেয় ব্লগস্পট ডটকমসহ কয়েকটি সাইট। একান্ত নিজের বিবিধ রচনা সেসব ব্লগে রাখার এই সুবর্ণ সুযোগ অনেক তরুণই হাতছাড়া করেননি। তবে আসল কথা হলো একজন যোগ্য সম্পাদকের হাত দিয়ে প্রিন্ট ম্যাগাজিন অর্থাৎ মুদ্রিত পত্রিকায় লেখা ছাপানোর প্রচলিত ব্যবস্থাকে এড়ানোর এহেন পদ্ধতি অনেককে আবার তৃপ্তি দেয়নি। এটা ঠিক যে এখন ফেসবুকে বা কোন অনলাইন পত্রিকায় একটি লেখা প্রকাশের অল্পক্ষণের ভেতরেই পাঠকদের লিখিত প্রতিক্রিয়া লাভের দারুণ সুযোগ চলে এসেছে। নিদেনপক্ষে ফেসবুকে লাইক অপশানের মাধ্যমে একজন নবীন তাঁর লেখার তাৎক্ষণিক ভাললাগার কথাটি জেনে যান। এটা আত্মশ্লাঘার হলেও একুশের বইমেলায় যখন সেই একই তরুণরা বই বের করেন তখন একটা ধাক্কা খান। এদের কেউ কেউ হয়ত অনুধাবনে সক্ষম হন অনলাইনের মতো ভার্চুয়াল ভুবনে লেখা প্রকাশের ফলে তিনি যে পাঠক পেয়েছেন, তাঁরা অদৃশ্য পাঠক; তাঁরা দৃশ্যমান মেলা থেকে দৃশ্যমান বই ক্রয়ে আগ্রহী নন। বরং ফেসবুক লিংক থেকে গিয়ে কোন নোটে বা জার্নালে প্রবেশ করে লেখকদের লেখা পড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে থাকেন।

সাহিত্য পত্রিকা যেমন সাহিত্য প্রকাশের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম, দৈনিকের সাহিত্য পাতা নয়। তেমনি অনলাইনেও ব্লগ বা বিভাগীয় পরিসরও সাহিত্য প্রকাশের উপযুক্ত স্থান হতে পারে না। এজন্যে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ অনলাইন সাহিত্য ম্যাগাজিন। দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন সাহিত্য ম্যাগাজিনটি মাসিক, প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালে। এর নাম বাংলামাটি (বাংলামাটি ডটনেট)। বরেণ্য কাইয়ুম চৌধুরী এটির মাস্ট হেড করেন। এরপর একসঙ্গে আত্মপ্রকাশ করে বেশ কিছু অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা। এগুলোর ভেতর সাহিত্য ক্যাফে অন্যতম।

অনলাইনে লেখা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটু সীমাবদ্ধতা আছে। দেশের অধিকাংশ লেখকই এখনও ছাপানো পত্রিকায় লেখা দিতে আগ্রহী নন। কারণ তাঁরা কম্পিউটার ইউজার নন। তরুণতর লেখকরা কম্পিউটার ব্যবহার করেন, ফেসবুকে প্রায় সবারই এ্যাকাউন্ট আছে। তারা অনলাইন ব্যাপারটি বোঝেন। যদিও এদের খুব অল্পসংখ্যকই ভালমানের সাহিত্যিক। তাই বেশিরভাগ অনলাইন সাহিত্য পত্রিকাগুলো এখনও সাহিত্য বিচারে তার কাক্সিক্ষত মান অর্জন করতে পারেনি। তারপরও নবীন-তরুণ লেখকরা লিখে চলেছেন অনলাইনে। ইতোমধ্যে পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিডিনিউজ, বাংলানিউজ, রাইসিংবিডি, প্রিয়ডটকমসহ কয়েকটি অনলাইন পত্রিকার সাহিত্যবিভাগ। নামে ও ছদ্মনামে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লেখক লিখে চলেছেন গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ। বর্তমানে যাদের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত এবং যাঁরা শ্রম ও মেধার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হয়েছেন তাদের ভেতরে আছেন অনেকেই। কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যায় : কল্যাণী রমা, মুহাম্মদ রাফিউজ্জামান সিফাত, রুবাইয়াৎ সিমিন, তানিয়া কামরুন নাহার, চরম উদাস, দুর্যোধন, জিয়া হাসান, সত্যপীর, মোসতাকিম রাহী, নুসরাত জাহানসহ অনেক তরুণ-নবীন। এদের ভেতর থেকেই বের হয়ে আসবেন আগামী দিনের শামসুর রাহমান, হাসান আজিজুল হক।

এদের লেখায় সমাজসচেতনতার পাশাপাশি সৃষ্টিশীলতার ছাপ সুস্পষ্ট। বিচিত্র ধরনের লেখা লিখে অনলাইনে নিজের অবস্থা শক্ত করেছেন এরা প্রত্যেকেই। এদের ভেতর দু’জনের কথা উল্লেখ করছি এদের গুচ্ছ গুচ্ছ লেখা পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে। মুহাম্মদ রাফিউজ্জামান সিফাত গল্প রচনায় বিশেষ মনোযোগী হলে ভাল করবেন। রুবাইয়াৎ সিমিন আত্মপ্রকাশ করেছেন কয়েক মাস আগে বাংলামাটিতে এবারের নোবেলবিজয়ী লেখক প্যাট্রিক মোদিয়ানোর একটি উপন্যাসের অংশবিশেষ অনুবাদের মাধ্যমে। পরে কবিতা প্রকাশ করেন অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা জগতে সর্বশেষ সংযোগ ‘শব্দকল্প’-তে। কবিতা লিখতে হলে ছন্দকুশলতা জরুরি। এটা কেবল সিমিন নয়, আজকের সব নবীন কবি মনে রাখলে কবিতারই লাভ।

সধৎঁভৎধরযধহ৭১@মসধরষ.পড়স

প্রকাশিত : ৬ জানুয়ারী ২০১৫

০৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: