আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিদ্যুত বিপর্যয় এবং আমাদের করণীয়

প্রকাশিত : ৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান

(৩ জানুয়ারির পর)

প্রযুক্তির বিকাশের কারণে টেলিমিটারিং ও টেলিকমিউকেশন ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। পাশাপাশি সর্বক্ষেত্রে আমাদের পেশাদারিত্ব ও মানসিকতার অবনতি ঘটেছে। তাছাড়া আজকাল ইন্টারনেট/সোস্যাল মিডিয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে অমনোযোগী হয়ে পড়ার অনেক উদাহরণ আছে। ১/১১ ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে গঠিত তদন্ত কমিটি কারিগরি, ব্যবস্থাপনাগত ও তদারকির গাফিলতি- এই তিনটিকে বিদ্যুতের মহাবিপর্যয়ের কারণ বলে চিহ্নিত করেছে (দৈনিক আমাদের সময়/সমকাল/কালের কণ্ঠ, ১৩ নবেম্বর ’১৪)। ১ নবেম্বর ’১৪-এর পর ৭ এবং ১১ নবেম্বর রাতে এবং এর আগেও কয়েকবার ভেড়ামারা গ্রিড উপকেন্দ্রে একই ধরনের ত্রুটি সংঘটিত হয়, যা কেউ জানতেও পারেনি (আমাদের সময়/সমকাল ১৩ নবেম্বর ’১৪)। প্রশ্ন হচ্ছে ৭ এবং ১১ নবেম্বর পরিস্থিতি সামাল দেয়া গেলে ১ নবেম্বর কেন পারা গেল না? ঐদিন সাড়ে ১১টায় বিদ্যুত বিপর্যয়ের পর বিকাল ২টা নাগাদ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে প্রায় ২১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনে আসার পর আবার বিপর্যয় ঘটে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ঐ সময় ডিপিডিসি এবং ডেসকো এনএলডিসির নির্দেশ অমান্য করে অতিরিক্ত বিদ্যুত নেয়ার চেষ্টা করে। ফলে ফ্রিকোয়েন্সি ডাউন হয়ে সিসটেম আবার কলাপ্স করে। যদিও এনএলডিসির নির্দেশ অমান্যকারীদের কোন শাস্তি দেয়া হয়েছে বলে আমরা জানি না। বরং তদন্ত দলের আমেরিকা প্রবাসী একজন সদস্য আমেরিকায় বিদ্যুত বিপর্যয়ের উদাহরণ টেনে বিষয়টিকে হাল্কা করে দেন বলে জানা যায়। এই সময় সাহায্যের জন্য এনএলডিসি থেকে অবসরে যাওয়া প্রকৌশলী মোঃ ইয়াহিয়াকে ডাকা হয় (যিনি একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী)।

১৯৯১-এ ডেসা সৃষ্টি করা হয় গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধি ও লস কমানোর কথা বলে। কিন্তু লস এবং সেবার মান দুটিরই অবনতি হলে আবার ডিপিডিসি, ডেসকো ইত্যাদি নামে কয়েকটি কোম্পানি করা হয়। কিন্তু আমরা দেখছি ফলাফল একই। বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বৃহত্তর ঢাকাকে নিয়ে গঠিত ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই মাত্র একজন প্রধান প্রকৌশলীর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ছিল। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ইত্যাদি বৃহৎ জেলা/এলাকা আরইবি’র নিকট হস্তান্তরের পরও ছোট্ট একটু জায়গায় ৪/৫টি কোম্পানি করে প্রতিটিতে একটি করে মাথাভারি সেটআপ তৈরি করে বেতনভাতা, বিদেশ ভ্রমণ, মিটিং, অনারিয়াম ইত্যাদি নানা নামে জনগণের অর্থ অপচয়ের মহোৎসব চলছে।

লোকবল, লাইন, স্থাপনা, যন্ত্রপাতি সবই পিডিবির। শুধু বেতন কাঠামো ও চাকরি কাঠামোতে সামান্য পরিবর্তন। মাথাভারি সেটআপ করে কিছুসংখ্যক ব্যক্তি উচ্চহারে বেতনভাতা এবং অন্যান্য সুবিধাদী ভোগ করছেন। কাজের লোকদের শেখার সুযোগ না দিয়ে একশ্রেণীর ক্ষমতাধর ব্যক্তি ট্রেনিং ইত্যাদির নামে বিদেশ ভ্রমণ করে অর্থের অপচয় করছেন। বিরাট পরিচালনা পরিষদ মিটিং, ইটিং আর অনারিয়াম নিচ্ছেন মাসে মাসে। দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বিউবো’র তুলনায় হ্রাস পেয়েছে, যার প্রমাণ বার বার জাতির সামনে উঠে আসছে। বিভিন্ন প্রকল্পের নামে নানা আর্থিক অনিয়মের খবরও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। একই অবস্থা ওজোপাডিকো, এপিএসসিএল, ইজিসিবি এবং অন্য সব কোম্পানিতে। তারপরও একটি সুবিধাবাদী মহল বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডকে আবার ভেঙ্গে টুকরো করার মিশন নিয়ে জোরেশোরে মাঠে নেমেছে। কিন্তু সরকার প্রধানের কঠোর মনোভাবের কারণে তারা সফল হতে পারছে না। বিদ্যুত ব্যবস্থাকে বার বার বিপর্যয় থেকে রক্ষা এবং একে স্থিতিশীল ও বিশ্বস্ত করার জন্য -

১) বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডকে পুনরায় ভাঙ্গার পরিকল্পনা ত্যাগ করে এনএলডিসিসহ পিজিসিবি, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এবং ঢাকার মেট্রোপলিটন এলাকাকে বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে একীভূত করতে হবে। ২) গ্রিড সিস্টেমকে উৎপাদিত বিদ্যুত সঞ্চালন/পরিবহনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। ৩) বেসরকারী খাত থেকে ২০%-এর বেশি বিদ্যুত ক্রয় করা যাবে না। ৪) প্রতিটি বিদ্যুতকেন্দ্র এবং উপকেন্দ্র ও বিপণনকারী সংস্থাকে এনএলডিসির নির্দেশ পালনে বাধ্য করতে হবে। ৫) সিস্টেম প্রটেক্শন এবং মিটারিং ডিভিশনকে প্রতিরক্ষার জন্য সর্বময় ক্ষমতা দিতে হবে। অন্য কোন সংস্থাকে রিলে সিস্টেমে (বিশেষ করে ফ্রিকোয়েন্সি রিলে) হাত দিতে দেয়া যাবে না। ৬) এনএলডিসির নির্দেশ অমান্যকারী এবং রিলে ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ৭) বিদ্যুতকেন্দ্রসমূহের স্টার্টিং ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং উপকেন্দ্রসমূহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। ৮) কর্মকর্তা/কর্মচারীদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ৮) মাথাভারি সেট-আপের পরিবর্তে কর্মমুখী সেট-আপ প্রণয়ন করতে হবে। ৯) কাজের লোককে পুরস্কৃত এবং দায়িত্বে অবহেলাকারীর জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে সকল নাগরিকের নিকট বিদ্যুত সুবিধা পেঁৗঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। বিগত ৬ বছরে অর্থনীতির যে অগ্রযাত্রা তার পেছনে বড় অবদান বিদ্যুতের। তাই একটি মহল কৌশলে বিদ্যুত খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতি তথা দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার চেষ্টায় লিপ্ত। ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি টেকসই, নির্ভরযোগ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত ব্যবস্থা। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বিদ্যুত ব্যবস্থাকে কোন অবস্থাতেই বার বার বিপর্যস্ত হতে দেয়া যাবে না। তার জন্য উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি এই খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় চাই কঠোর পদক্ষেপ। (সমাপ্ত)

প্রকাশিত : ৬ জানুয়ারী ২০১৫

০৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: