আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চট্টগ্রামে গণকবরের ওপর বহুতল ভবন

প্রকাশিত : ৩ জানুয়ারী ২০১৫
  • জামায়াত-বিএনপি সরকারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে

চট্টগ্রামে হাজারো গণহত্যার কালের সাক্ষীর ওপর গড়ে উঠেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএনপি-জামায়াত সরকারের পাকি কানেকশনের ফসল। ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি (ইউএসটিসি) কর্তৃপক্ষ হাজারো শহীদের রক্তে মেশানো মাটির ওপর গড়ে তুলেছে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (ইবা)। উল্লেখ্য, দৈনিক জনকণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পরই জিয়া ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (জিবা) এর নাম পরিবর্তন করে ফেলা হয়। এখনও অর্ধনির্মিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে এই ভবন। হয়ত আবারও জামায়াত-বিএনপি সরকারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে কর্তৃপক্ষ।

পাকিস্তানীদের হাত থেকে দেশকে হানাদারমুক্ত করলেও মীরজাফরদের কারণে এখনও রাজাকারমুক্ত হয়নি বাংলাদেশ। ফলে বধ্যভূমির জায়গাও বাণিজ্যিক ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বিএনপি-জামায়াতের মুখোশ পরিবর্তনের মাধ্যমে আঁকড়ে রেখেছে বিশাল এ বধ্যভূমি। চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ এ বধ্যভূমি ফয়স’ লেকসংলগ্ন কাঁঠালবাগান বধ্যভূমি। জিয়া ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (জিবা) এর বহুতল ভবন বাস্তবায়ন করতে বিএনপি জামায়াত সরকারের আমলেই এ বধ্যভূমির জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়। স্বাধীনতা বিরোধীরাই এ ভূমি জাতীয় অধ্যাপক ডাক্তার নুরুল ইসলামের নামে বরাদ্দ দিতে সহায়তা করেছে। চট্টগ্রামে এমন ভূমি উদ্ধারে কোন সরকারী উদ্যোগ নেই। সেই সঙ্গে রয়েছে জেলা প্রশাসনসহ পুলিশ প্রশাসনের আর্থিক ও দেশবিরোধী দুর্বলতা।

স্বাধীনতা রক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বধ্যভূমিগুলো সরকারী উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। বিভিন্ন অঞ্চলের বৃহদায়তন বধ্যভূমিগুলোতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও মুষ্টিমেয় কিছু স্মৃতিস্তম্ভ এখনও নির্মাণ সম্ভব হয়নি। ফলে অরক্ষিত রয়ে গেছে স্বাধীনতাকামী শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো।

পাকিদের হত্যাযজ্ঞের করুণ কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে ঐ সময়কার প্রত্যক্ষদর্শী একেএম আফসার উদ্দিন ‘উন্মেষ’ নামক একটি ছোট্ট সঙ্কলনে বলেছেন স্মৃতির কথা। ছোট্ট এ সঙ্কলনটি মোঃ শহীদুল ইসলাম সম্পাদিত ও পাহাড়তলী শাখা থেকে সূর্যমুখী কাফেলা কর্তৃক নিবেদিত এ উন্মেষ প্রবন্ধটি। আফসার উদ্দিন তার লেখায় তুলে ধরেছেন- একাত্তর সালের ১০ নবেম্বর সেদিন ছিল ২০ রমজান। সকাল সাড়ে ৫টার দিকে ফজরের নামাজের পর আকবর শাহ মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হতেই পাক হানাদাররা ঐ মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনসহ বেশ কয়েকজন মুসল্লিকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নিজেকে আড়াল করে আরও ৪ জনসহ ফয়স সংলগ্ন কাঁঠাল বাগানের বধ্যভূমির কাছে গিয়েছিলেন। হত্যাযজ্ঞের নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে তার লেখায়। ঐ দিন পাক হানাদাররা শুধু মসজিদ থেকেই নয়, বাসা বাড়ি থেকে ঘুমন্ত তরুণ যুবকদের টেনে হিঁচড়ে যেমন নিয়ে যায় জল্লাদখানায় তেমনি পাহাড়তলী স্টেশনে আসা ট্রেন থেকে অনেক যাত্রীদের নিয়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। ফলে জল্লাদখানার পার্শ¦বর্তী সরু খালটির পানি রক্তে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বৃহৎ বধ্যভূমি হচ্ছে পাহাড়তলীর ফয়স লেক সংলগ্ন কাঁঠাল বাগান বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালের ১০ নবেম্বর এ বধ্যভূমিতে পাক পশুদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে এলাকাবাসী হারিয়েছে ময়না, মানিক, সফিসহ শত শত তরুণ, যুবক ও প্রবীণদের। আজও মাটি খুঁড়লে পাওয়া যাবে শহীদদের মাথার খুলি হাড়গোড়। নীরবে কেঁদে যাচ্ছে এসব আত্মত্যাগী প্রাণ। বিধ্বস্ত বাংলার ৩০ লাখ শহীদের মাঝে দেশব্যাপী শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের পাশে দ্বীপশিখা হয়ে জ্বলবে এ এলাকার শহীদরাও। কিন্তু ভূমিদস্যুদের থাবার কারণে ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে এ বিশাল বধ্যভূমি। প্রায় ২ একর জায়গার বধ্যভূমি শোষকদের দখলে চলে গেছে বেশিরভাগই। সামান্য একটু জায়গায় প্রজন্ম ’৭১-এর অনুপ্রেরণায় সরকারী উদ্যোগে এ বধ্যভূমিতে ছোট্ট একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। কিন্তু বৃহদায়তন অট্টালিকার কারণে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত তৃতীয় প্রজন্মের জন্য গড়ে তোলা স্মৃতিস্তম্ভ। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে সেই সুবিশাল খালটি। যে খালের মধ্যে পাকিরা বাঙালীদের হত্যার পর ঐ খালের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল।

অপরদিকে, জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নুরুল ইসলামের পক্ষ থেকে ফয়স লেকস্থ বধ্যভূমির জায়গায় নির্মাণ শেষের অপেক্ষায় রয়েছে ‘জিয়া ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন’ (জিবা) ভবন। তিনি মারা যাবার পর এই নামকরণে আসে পরিবর্তন যা বর্তমানে ‘ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন’ (ইবা) তবে একই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নামমাত্র মূল্যে রেলের জায়গা লিজ নিয়ে ইউনির্ভাসিটি অব সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগাং (ইউএসটিসি) গড়ে তুলেছেন।

এরই গা ঘেঁষে ১৯৯৬ তে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে তোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল। বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে এসে ঐ সরকারকে খুশি রাখতে বধ্যভূমির জায়গা দখলে নিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত আছে ‘জিয়া ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন’ (জিবা) ভবন। একই সময়ে চট্টগ্রাম টেলিভিশন ভবনের পূর্ব পাশে রেলের আরও একটি সুবিশাল জায়গা লিজ নিয়ে বহুতল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তবে বধ্যভূমির জায়গা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দখলে নেয়ায় শুধু বিতর্কের জন্মই হয়নি, বিভিন্ন সময়ে শহীদ পরিবারের মানববন্ধন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ধিক্কারের সম্মুখীন হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

প্রকাশিত : ৩ জানুয়ারী ২০১৫

০৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: