আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

খলিল জিবরানের অনুগল্প

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • ভাষান্তর : জাফর আলম

প্রখ্যাত কবি ও লেখক খলিল জিবরানের জন্ম উত্তর লেবাননের বাশহরিক শহরে ১৮৮৩ সালের ৬ জানুয়ারি। মৃত্যু ১০ এপ্রিল, ১৯৩১ নিউইয়র্কে। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, চিত্রশিল্পী, লেখক, ভাস্কর, দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ এবং অঙ্কনশিল্পী। বহিরাগত লেখক হিসেবে নিউইয়র্কের বেনেলিকার আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। ইংরেজী ও আরবী ভাষার লেখালেখি করেছেন। আরব বিশ্বে জিবরান বিদ্রোহী সাহিত্যিক ও রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। ক্লাসিক্যাল ধারা ডিঙ্গিয়ে তিনি আধুনিক আরবী সাহিত্যে রোমান্টিক স্টাইলে রেনেসাঁর প্রবর্তন করেন। এখনও লেবাননে তাঁকে সাহিত্যিক বীরপুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইংরেজীভাষীদের কাছে ১৯২৩ সালে প্রকাশিত ‘দি প্রফেট’ গ্রন্থের জন্য জিবরান সুপরিচিত। প্রফেট গ্রন্থ ৪০টি বিদেশী ভাষায় অনুদিত হয়েছে, শেক্সপিয়ারের পর প্রফেট কাব্যগ্রন্থ সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বেস্ট সেলার বই। সঙ্কলিত গল্পগুলো ইন্ডিয়ালগ পাবলিকেশন্স (প্রা.) লি. প্রকাশিত সিলেকটেড ওয়ার্কস অব খলিল জিবরান থেকে নেয়া হয়েছে।

প্রেমের গান

একদা একজন কবি একটি অপূর্ব প্রেমের গান লিখেছিলেন। তিনি এই লেখা গানের অনেকগুলো কপি করে পরিচিত নারী-পুরুষ ও বন্ধুবান্ধবদের কাছে পাঠিয়েছেন।

তাঁদের মধ্যে একজন যুবতীও ছিলেন। যুবতী এই মেয়েটির সঙ্গে তার একবারই দেখা হয়েছে। সে পাহাড় শ্রেণীর পেছনে পদক্ষেপ সমতলে বসবাস করত।

দু-একদিনের মধ্যে এক বার্তা বাহক মেয়েটির একটি চিঠি নিয়ে এসে হাজির। পত্রে মেয়েটি লিখেছে, আপনার প্রেমের গান পড়ে গভীরভাবে আমি আপ্লুত হয়েছি। আপনার গান আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। এক্ষুনি এসে আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে আমাদের বাগদানের ব্যবস্থা করার জন্য আলাপ করুন।

কিন্তু কবি মেয়েটির চিঠির উত্তরে লিখলেন, ‘বন্ধু এটা ছিল একটি নিছক ভালবাসার গান, এই গান একজন কবির হৃদয় থেকে প্রকাশ পেয়েছে। প্রত্যেক নারীর জন্য প্রত্যেক পুরুষ এই ধরনের গান তো লিখেই থাকে।’ মেয়েটি আবার কবির পত্র প্রাপ্তির পর জবাবে লিখেছে, ‘আপনি এক কথায় শব্দের দ্বারা ভ-ামি করেছেন, আপনি একজন মিথ্যাবাদী। আজ থেকে আমার মৃতদেহ কফিনে না তোলা পর্যন্ত আমি আপনার মতো সকল কবিকে ঘৃণা করব।’

চার কবি

একটি টেবিলের ওপর পিতলের বড় পাত্রে মদ রাখা ছিল। টেবিলের চারদিকে চারজন কবি বসেছিল।

প্রথম কবি বললেন, ‘আমি মনে করি, আমি আমার তৃতীয় নম্বরে শূন্যে ধুমায়িত মদের সুবাস পাচ্ছি, যেন পাহাড়ের জঙ্গলে শূন্যে উড়ন্ত পাখির দারুণ ভিড়।’

দ্বিতীয় কবি মাথা তুলে বললেন, ‘আমি কানের ভেতর এসব পাখির কিচিরমিচির আর গানের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সেই গানের গুঞ্জন আমার হৃদয়ে স্পর্শ করেছে যেন সাদা গোলাপের পাপড়ি মৌমাছিকে বন্দী করে রেখেছে।’

তৃতীয় কবি চোখ বন্ধ করে দু’হাত উপরের দিকে প্রসারিত করে বললেন, ‘আমি মৌমাছিকে যেন হাতে স্পর্শ করছি। আমি উপলব্ধি করি, তাদের পাখার বাতাস ঘুমন্ত পরীর শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো আমার আঙ্গুল ছুঁয়ে যাচ্ছে।’

চতুর্থ কবি উঠে দাঁড়ায়। মদের পাত্রটি হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘হায় বন্ধুগণ, আমার দুরদৃষ্টি আর শ্রবণ ও স্পর্শশক্তি অত্যন্ত দুর্বল। আমি এই মদের সুবাসনাকে পাই না অথবা মৌমাছির গান আর পাখার শব্দ শুনতে পাই না। আমি শুধু মদের বিষয়টি উপলব্ধি করি।’

অতএব, এখন আমার মদ পান করা উচিত। কারণ মদ আমার বোধশক্তিকে শাণিত করবে আর এর ফলে আমাকে স্বর্গীয় সুখের উচ্চমার্গে নিয়ে যাবে।’

একথা বলার পর পাত্রটি তার মুখের কাছে নিয়ে পাত্রের মদের শেষ বিন্দু পর্যন্ত পান করে পাত্রটি খালি করে ফেলল।

অপর তিন কবি হাঁ করে তার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কারণ তারাও মদের জন্য লালায়িত ছিল আর তাদের চোখে মুখে আবেগহীন ঘৃণা ফুটে ওঠে।

ন্যায় বিচার

এক রাতে রাজপ্রাসাদে এক ভোজসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে একজন লোক এসে হাজির, সে নিজেকে প্রটেস্ট্যান্ট বলে রাজকুমারের কাছে পরিচয় দেয়। উপস্থিত লোকজন দেখল লোকটির এক চোখ কানা; চোখের কোঠরে রক্তমাখা।

রাজকুমার লোকটিকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার কি হয়েছে।’ লোকটি উত্তর দিল, ‘হে মহান যুবরাজ, আমি একজন পেশাদার চোর। সে রাতে আকাশে চাঁদের আলো ছিল না, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত।

আমি একটি মুদ্রা বিনিময়কারীর দোকানে চুরি করতে গেছি। কিন্তু ভুলক্রমে আমি মুদ্রা বিনিয়োগকারীর দোকানের পরিবর্তে জানালা দিয়ে একটি তাঁতির কামরায় ঢুকে পড়ি। সেখানে আমার একটি চোখ তাঁতের কলে উৎপাটিত হয়। হে মহান যুবরাজ, আমি এই ঘটনার সুবিচার চাই। আপনি বিচার করুন।’

তৎক্ষণাত তাঁতিকে রাজসভায় ডাকা হলো। আর তাঁতির একটি চোখ উপড়ে ফেলার নির্দেশ জারি করা হলো।

তাঁতি বিনয়ের সঙ্গে আর্জি পেশ করল, হে মহান যুবরাজ আপনার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ ন্যায্য। আমারও একটি চোখ উপড়ে ফেলাই সঠিক। হায়, কাপড় বুনার সময় দু’দিকে চোখ রাখার জন্য আমার দুটি চোখই প্রয়োজন। কিন্তু আমার একজন প্রতিবেশী মুচি আছে, তারও দুটি চোখ আছে। কিন্তু তার পেশাগত কাজের জন্য দুটি চোখের প্রয়োজন নেই।’

যুবরাজ মুচিকে ধরে আনার নির্দেশ দিলেন। মুচি দরবারে এসে হাজির। তার দুটি চোখের একটি উপড়ে ফেলা হলো, ফলে ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হলো।

সমালোচক

একদিন সন্ধ্যায় ঘোড়ার পিঠে চড়ে একজন পরিব্রাজক সমুদ্রের তীরের দিকে যাচ্ছিল। পথের ধারে সে একটি সরাইখানায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। ঘোড়াটি সরাইখানার দরজার পাশে বেঁধে রেখে ভেতরে প্রবেশ করে।

মধ্যরাতে সকলে যখন ঘুমিয়ে তখন এক চোর এসে পরিব্রাজকের ঘোড়াটি চুরি করে নিয়ে যায়।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখল, ঘোড়াটি তার চুরি হয়েছে। সে ঘোড়াটির জন্য ব্যথিত হলো এবং মনে দারুণ আঘাত পেল।

সরাইখানার অবস্থানকারী অন্যান্য মুসাফিররা জেগে উঠলে সকলে এসে তাকে ঘিরে বসল তারপর আলাপাচারিতা শুরু করে।

প্রথম ব্যক্তি বলল, তুমি কেমন বোকা, আস্তাবলের বাহিরে ঘোড়া রেখে গেলে।’

দ্বিতীয় জন বলল, ‘এমন অনেক বোকা লোকও আছে যে ঘোড়ার পা না বেঁধে রেখে ঘুমায়।’

তৃতীয় জন বলল, ‘ঘোড়ার পিঠে চড়ে সমুদ্রের তীরের দিকে ভ্রমণ করা বোকামি।’

চতুর্থ মুসফির বলল, ‘একমাত্র অলস এবং পায়ে চলা মন্থরগতির লোকের নিজস্ব ঘোড়া আছে।’

এদের আলাপচারিতায় ঘোড়া চুরি যাওয়ায় মুসাফির আশ্চর্য হলেন, তারপর চিৎকার দিয়ে উঠেন, ‘বন্ধুরা, আমার ঘোড়া চুরি হয়ে গেছে।

আপনারা সকলে আমাকে দোষারূপ করছেন আর ভুলত্রুটির সমালোচনা করছেন। কিন্তু আমি হতবাক, যে লোকটি আমার ঘোড়া চুরি করল তার সম্পর্কে একটি ও নিন্দাবাক্য উচ্চারণ করেননি।’

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: