রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্প্যানিংলিশ সাহিত্যের পথিকৃৎ জিয়ান্নিনা ব্রাসসি

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

স্প্যানিশমিশ্রিত ইংরেজী ভাষা যে সাহিত্যে রচনার জনপ্রিয় মাধ্যম হতে পারে, তা দেখিয়েছেন জিয়ান্নিনা ব্রাসসি। কথ্য ভাষায় ইংরেজি আর স্প্যানিশের সমন্বয়ে স্প্যানিংলিশের ব্যবহার অহরহই হয়ে থাকে। কিন্তু এটা যে সাহিত্যের ভাষাতে পরিণত হতে পারে, শুধু সে নজিরই জিয়ান্নিনা স্থাপন করেননি, তিনি একে সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ‘ইয়ো-ইয়ো-বোয়িং’ নামের বিখ্যাত উপন্যাসটির মাধ্যমে তিনি প্রথম স্প্যানিংলিশ সাহিত্যে রচনার সূত্রপাত করেন। তিনি শুধু উপন্যাসেই ভাষার এই প্যাটার্নটি ব্যবহার করেননি, করেছেন কবিতাতেও। তাঁর আধুনিকউত্তর কবিতাসমগ্র ‘এম্পেয়ার অব ড্রিমসে’ স্প্যানিংলিশের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। দর্শনভিত্তিক ফিকশন ‘ইউনাইটেট স্টেটস অব বানানা’ বইটিতেও তিনি স্পানিংলিশ ভাষার ব্যাপক ব্যবহার করেছেন। তিনি সাহিত্যে জগতে ভাষার এই প্যাটার্নটি প্রতিষ্ঠিতকরণে অগ্রগণ্য। তাঁকে ইংরেজী, স্প্যানিশ এবং স্প্যানিংলিশ ভাষায় সাহিত্যে রচনায় সিদ্ধহস্ততার জন্য লাতিন সাহিত্যের ভাষাগত বিপ্লবের বিপ্লবী সৈনিক হিসেবে অভিহিত করা হয়।

জিয়ান্নিনা ব্রাসসির সাহিত্যে আমেরিকায় বসবাসরত পঞ্চাশ মিলিয়ন হিসপানিকদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক ধ্যান ধারণা প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন। হিসপানিক সাহিত্যের ওপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্যে হিসপানিকরাই বারংবার উঠে এসেছে। এছাড়া পুয়ের্তোরিকোর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পুয়েত্রোরিকানদের জীবন তাঁকে গভীরভাবে ভাবায়। দেশপ্রেম আর নাড়ির টান তাকে বারবার ফিরিয়ে নেয় ছোট্ট দ্বীপটির মানুষের কাছে। জীবনের কাছে। এজন্য তাঁর অনেক সাহিত্যেরই উপজীব্য পুয়োর্তোরিকোর সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং মানবাধিকার। দ্বীপ রাষ্ট্রটির রাজনৈতিক উথাল-পাতাল পরিস্থিতি এবং লঙ্ঘিত সার্বভৌমত্ব কিভাবে পুয়ের্তোরিকানদের জীবনের ওপর চেপে বসেছে তা তিনি তুলে এনেছেন তাঁর অনেক লেখাতেই। এজন্য তাঁকে বিপ্লবী, প্রতিবাদী এবং স্বাধীনতার স্বপ্নচারিণী লেখক, কবি হিসেবে অভিহিত করা হয়।

১৯৫৩ সালে পুয়ের্তোরিকোর সানজুয়ানে জন্মগ্রহণকারী কবি, প্রাবন্ধিক ও উপন্যাসিক হিসেবে খ্যাত জিয়ান্নিনা ব্রাসচ্ছি তাঁর এই সাহিত্যিক প্রতিভার খোঁজ পাওয়ার আগেই খ্যাতিমান হয়ে গিয়েছিলেন। কিশোরী বয়সেই তিনি পুয়োর্তোরিকোর এক আলোচিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। এর কারণ তাঁর কর্ম। কিশোরী বয়সে তিনি টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে নাম কুড়ান। টেনিস খেলায় পুয়ের্তোরিকো ঔম্যান’স ডিভিশনের সবচেয়ে অল্পবয়সী মেয়ে হিসেবে পুরস্কার জয়ী হন। টেনিসে চ্যাম্পিয়ন বাবার যোগ্য মেয়ে হিসেবে পরিচিত ছড়িয়ে পড়ে তাঁর। এছাড়া গায়িকা, ফ্যাশন মডেল হিসেবেও বেশ সুনাম অর্জন করেন। এসবে খ্যাতিমান হয়ে যাওয়ার পর জিয়ান্নিনা নিজেকে আবিষ্কার করেন একজন লেখক হিসেবে। নিজের এই আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে পড়াশোনা। সাহিত্যের ছাত্রী হিসেবে তিনি স্প্যানিশ সাহিত্য এবং ইংরেজী সাহিত্যের ওপর লেখাপড়া তাঁর মাঝে লেখালেখির অনুপ্রেরণা যোগায়। আর সেই অনুপ্রেরণায় তাঁকে লেখক হিসেবে আবির্ভাব ঘটাতে সাহায্যে করে। সাহিত্যেকে আশ্রয় করেই তিনি তাঁর পুরো জীবন অতিবাহিত করেছেন। শুধু যে নিজেই সাহিত্যে রচনা করেছেন এমনটা নয়, সাহিত্যিকও সৃষ্টি করেছেন। রজারস ইউনির্ভাসিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইর্য়ক এবং কোলগেট ইউনিভার্সিটির চেয়ার অব ক্রিয়েটিভ রাইটিং হিসেবে দায়িত্ব পালন করাই এর প্রমাণ বহন করে।

জিয়ান্নিনা ব্রাসসির সাহিত্যের ওপর লেখাপড়া তাঁকে বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণে আগ্রহী করে তোলে। লেখালেখির শুরুতেই লাতিন আমেরিকা এবং স্পেনের খ্যাতিমান কবিরাই তাঁর লেখার মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে। গুসটাভো আডোলফো বেক্যুয়ের, কার্ভেন্টাস, গার্সিলাসো, সিজার ভালেঝো, জুয়ান র‌্যামন জিমিনেঝ, ফেডরিকো গার্সিয়া লোর্সাকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন। পরবর্তীতে তিনি ফ্রেঞ্চ, জার্মান, পোলিশ, আইরিশ, রাশিয়ান লেখকদের সাহিত্যেকর্মের ওপর বিশ্লেষণাতœক কাজ করেন। খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও তাঁদের সাহিত্যে কর্ম নিয়ে স্প্যানিশ ভাষায় লিখিত প্রবন্ধ ও নিবন্ধগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহিত্যে জার্নালে প্রকাশিত হতে থাকে। সেই সঙ্গে সাহিত্যবিষয়ক লেখক হিসেবে পরিচিত বাড়তে থাকে জিয়ান্নিনার।

সাহিত্যে রচনার কাল হিসেব করলে আশির দশকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দশকে তিনি অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণাধর্মী লেখা লেখেন। এছাড়া এই দশকে তিনি নিজেকে একজন কবি হিসেবে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। গদ্যধর্মী কবিতা লেখাতে বেশ পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা তাঁর গদ্যধর্মী কবিতাগুলো বিভিন্ন কবিতা উৎসবে আবৃত হতো। তাঁর প্রথম গদ্যকবিতার সংকলন ‘এ্যাসালট হোআইল’ নামক বইটি যা ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় প্রফেইন কমেডি, ১৯৮৭ সালে লেখেন বুক অব ক্লাউনস এ্যান্ড বাফুনস নামক বই। এবং এর পরের বছর তার এই কবিতাগুলোর সংকলন হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘এম্পায়ার অব ড্রিমস’ বইটি। বইটির কবিতাগুলো স্প্যানিশ ভাষায় লেখা হয়েছে। তাঁর রচিত কবিতার এই সংকলনটি ১৯৯৪ সালে সম্পূর্ণ ইংরেজীতে অনূদিত হয়। এই বইতে নিউইয়র্ক বারংবার উঠে আসে। উঠে আসে হিসপানিকদের অভিবাসী জীবনধারা। দেশপ্রেমের প্রগাঢ় অনুভূতির খোঁজ মেলে বইটির অনেক কবিতাতেই। জীবনের মহত্ত্ব অনুসন্ধানে ব্যাপৃত কবি কবিতার ছত্রেছত্রে খুঁজে ফিরেছেন জীবনে বেঁচে থাকা, টিকে থাকার অর্থ।

নব্বইয়ের দশকে জিয়ান্নিনা ব্রাসচ্ছি সাহিত্যে রচনায় ভাষার প্যাটার্নগত পরিবর্তন নিয়ে আসেন। ইংলিশ, স্প্যানিশের সমন্বয়ে স্প্যানিংলিশ প্যাটার্নে লেখালেখি শুরু করেন। এই ভাষার প্রথম বই ‘ইয়ো-ইয়ো-বোয়িং’ নামের বিখ্যাত বইটি। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই বইটি ছিল পরীক্ষণমূলক সাহিত্য রচনা। পরীক্ষণমূলক বইটিই বাজিমাত করে দেয়। আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যায় সাহিত্যসমাজে। বেস্ট সেলিং বইয়ের তালিকায় নাম ওঠে যায়। সেই সঙ্গে দুনিয়াজুড়ে পরিচিতি বৃদ্ধি পায় তাঁর। বিশেষ করে আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকায় অভিনব স্প্যানিংলিশে সাহিত্যে রচনার পথিকৃত হিসেবে জনপ্রিয় ও খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন তিনি। দুই ভাষার সংমিশ্রনের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা দুই সংস্কৃতির ছায়াপাঠক খুঁজে পায় ‘ইয়ো-ইয়ো-বোয়িং’ নামের এই বইটিতে। নিউইর্য়ক শহরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে বইটির কাহিনী। এতে জিয়ান্নিনা হিসপানিক-আমেরিকানদের অভিজ্ঞতাকেই ডায়ালগের ভিত্তিতে উপস্থাপন করে গেছেন। পেইন্টার, কবি, ভাস্কর, গায়ক, লেখক, পরিচালক, অভিনেতা, ডিজাইনার, সম্পাদক, দার্শনিক ইত্যাদি বিভিন্ন চরিত্রের আবির্ভাব ঘটিয়ে তাদের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, ভূতাত্ত্বিক রাজনৈতিক পটভূমি তুলে ধরেছেন ভালবাসা, যৌনতা, খাবার, গান, বই, আশা, আকাক্সক্ষা, হতাশা, অবিশ্বস্ততা, চাকরি , ঋণ, যুদ্ধ ইত্যাকার বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনার মধ্যে দিয়ে।

জিয়ান্নিনা দীর্ঘদিন আমেরিকায় বাস করলেও তাঁর কাছে সর্বদা স্প্যানিশ ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্প্যানিশের সঙ্গে সঙ্গে মাঝেমধ্যে কিছু ইংরেজী শব্দ যুক্ত করে স্প্যানিংলিশ ধরনের লেখা লেখলেও ‘ইউনাইটেট স্টেটস অব বানানা’ বইটি তাঁর প্রথম সম্পূর্ণরূপে ইংরেজী ভাষায় রচিত কোন বই। এই বইটি প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। যদিও বইটি লেখা শুরু করেন ২০০১ সালে। তিনশ’ পৃষ্ঠার এই বইটি লিখতে তিনি সময় নিয়েছেন দীর্ঘ এক দশক। পুরস্কারজয়ী এই বইটি আধুনিকউত্তর নাটকীয়ভঙ্গির এমন এক উপন্যাস যেখান নাইন এলেভেনের পরে বিশ্বে ক্ষমতার পালা বদলকে তুলে ধরা হয়েছে। পরীক্ষণমূলক নাট্যধারা, গদ্যকবিতা এবং প্রবন্ধ এই তিনের অভিনব সংমিশ্রনের মধ্যে দিয়ে গণতন্ত্র এবং নাইন এলাভেন পরবর্তী আমেরিকার ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে বইটির কাহিনী এগিয়ে গেছে। এতে কাব্যিকভাবে একবিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদ ও কর্পোরেট সেন্সরশিপের বিষয়টিকে তুলে আনা হয়। ইকোনোমিস্ট পত্রিকা এই বইটিকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করায় ‘সাহসী বিবৃতি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর কাহিনীতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির কথা বারংবার বলা হয়ছে। ‘আমেরিকার জন্য ব্যাংক মন্দির সমতুল্য। এ যেন পবিত্র যুদ্ধ। আমাদের অর্থনীতি আমাদের ধর্ম। অর্থই স্রষ্টা।’ বইটির অন্তর্ভুক্ত এই উক্তিই এর মূল থিম সম্পর্কে ধারণা দিয়ে দেয়। এই বইটির মাধ্যেমে গিয়ান্নিনা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ভেঙে পড়া, ব্যবসায়ীদের করুণ মৃত্যু এবং গণতন্ত্রের সমাপ্তির শঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন।

জিয়ান্নিনা ব্রাসসি খুব বেশি বই লেখেননি। কিন্তু অল্প লেখেই বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি, মানবতা, দেশপ্রেম ইত্যাদির অন্তর্ভুক্তকরণ তাঁর সাহিত্যেকে শক্তিশালী করেছে। আর স্প্যানিংলিশ প্যাটার্নের ব্যবহার তাঁর রচিত সাহিত্যে এনেছে অভিনবত্ব। এজন্য তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন। লাভ করেছেন বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা। তিনি সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ ড্যানফোর্ড স্কলারশিপ, এল ডায়রিয়া লা প্রেনসা’স আউটস্টান্ডিং ঔম্যান, ফোর্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ, ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর দ্য আর্টস ফেলোশিপ, রিড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ, নিউইয়র্ক ফাউন্ডেশন ফর দ্য আর্টস ফেলোশিপ, পেন আমেরিকান সেন্টার’স ওপেন বুক অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।

স্প্যানিংলিশ প্যাটার্নকে মার্জিতভাবে সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করে জিয়ান্নিনা স্প্যানিশ সাহিত্যেকে সমৃদ্ধ করেছেন। এজন্য তিনি স্প্যানিশ সাহিত্যে জগতে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এক ভাষার মধ্যে অন্যভাষার শব্দের আত্তীকরণের মাধ্যেমে নিজ দেশের ভাষাকে, নিজ দেশের সাহিত্যেকে সমৃদ্ধ করা যায়। এই পথই বাতলে দিয়েছেন জিয়ান্নিনা ব্রাসচ্ছি। ভাষার কদর্য ব্যবহার রোধ তথা ভাষার অবমাননা রোধ করে বাংলা ও ইংলিশের সমন্বয়ে গঠিত বাংলিশ প্যাটার্নটিকে কিভাবে মার্জিতভাবে উপস্থাপন করা যায়, কিভাবে সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেক্ষেত্রে আদর্শ হতে পারে পুয়ের্তোরিকোর খ্যাতিমান এই সাহিত্যিক।

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: