কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সাহিত্যের সৌম্যমূর্তি এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • রহীম শাহ

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের অন্যতম পুরোধাপুরুষ এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ। অজস্র ছড়ায়-গল্পে-উপাখ্যানে-কথকতায় তিনি গড়ে তুলেছেন অপরূপ এক শিল্পভুবনÑ সেই ভুবনে তিনি অনন্য অধিরাজ। শিশুসাহিত্যে তাঁর আত্মনিবেদন ও অবদান আজ ইতিহাসের অংশ। তাঁর ‘টাপুর টুপুর’ এখনও আমাদের জন্য বৃষ্টিমুখর প্রহর নিয়ে আসে, নিয়ে আসে উর্বরতার প্রতিশ্রুতি। একইসঙ্গে তাঁর রচনাবলি আমাদের শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য খুলে দেয় এক স্বপ্নভুবনের দুয়ার।

শিশু-মনকে তার চেয়ে ভালো আর কে বুঝতেন? সেই ‘এক যে ছিল নেংটি’ দিয়ে শুরু, তারপর কত গল্প, কত কাহিনীই-না তার কাছ থেকে উপহার পেয়েছে শিশুরা। তুনু, তপু আর বাঘ কেঁদো, নেংটি ইঁদুর বন্ধু হয়ে উঠেছে শিশুদের। শুধু ছড়া নয়, শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প, উপন্যাসও লিখেছেন এখ্দ্দন। তাঁর সৃষ্টি ‘তুনু’, ‘তপু’ ও ‘কেঁদো’ চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে শিশুদের বন্ধু। নানা দেশের গল্প, ছড়া ও কবিতার সঙ্কলনের সম্পাদনা করেও তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা শিশুসাহিত্যকে।

এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি লেখালেখি শুরু করলেও তার উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল ষাটের দশকে। গদ্যেপদ্যে সমান পারদর্শী এই লেখক ছড়ার পাশাপাশি স্বপ্নময় গদ্যও রচনা করেন। তাঁর ‘তুনতু বুড়ির ছড়া’, ‘বৈঠকী ছড়া’, ‘বাজাও ঝাঁঝর বাদ্যি’, ‘এক যে ছিল নেংটি’, ‘মাঠপারের গল্প’, বাংলা শিশুসাহিত্যের অমূল্য রতœ। শুধু তা-ই নয়, তাঁর বর্ণময় জীবনের কাহিনীকে কেন্দ্র করে উপন্যাস ‘ফিরে দেখা’ শিশুসাহিত্যকে বেশ সমৃদ্ধই করেছে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ‘এক যে ছিল নেংটি’, ‘হঠাৎ রাজার খামখেয়ালি’, ‘কাটুম কুটুম’, ‘ছোট্ট রঙিন পাখি’ এবং তনু ও তপু সিরিজের কয়েক ডজন বই।

বাংলা একাডেমির প্রাক্তন পরিচালক ফজলে রাব্বি এক স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধে এখ্লাসউদ্দিন সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বিগত তিন-চার বছরে প্রকাশনা ক্ষেত্রে আমরা (বাংলা একাডেমি) যে নতুনত্ব আনতে পেরেছিলাম, এখ্লাস বইঘরের সহায়তায় মাত্র দুটি বই (‘এক যে ছিল নেংটি’ ও দুই বাংলার ছড়ার সংকলন ‘ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ’) প্রকাশ করে তার চেয়ে অনেক বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ... এরপর এখ্লাসের সম্পাদনায় মাসিক কিশোর পত্রিকা ‘টাপুর টুপুর’ প্রকাশিত হতে লাগল। সব মিলিয়ে এখলাস একাই বাংলাদেশে শিশুসাহিত্য প্রকাশনায় যেন বিপ্লব এনে ফেলল।’

এখ্দ্দনের সম্পাদনায় প্রকাশিত শিশু-কিশোরদের মাসিক পত্রিকা ‘টাপুর টুপুর’ ষাটের দশকে শিশুসাহিত্যের যাত্রাকে নতুন গতি দেয়। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ছড়া সংকলন ‘ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ’ মুদ্রণ পারিপাট্যে ছিল এক বিস্ময়কর নিদর্শন। এছাড়া পত্রিকার রচনা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্পাদকের প্রগতিশীল মনের পরিচয় পাওয়া যায়। ঊনসত্তরের দুর্বার গণআন্দোলনের অন্যতম নায়ক শহীদ আসাদকে নিয়ে শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’, মাহবুবউল্লাহর নিবন্ধ, ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে লেখা প্রথিতযশা সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ূনের ‘লাল তারিখ’, অজিত কুমার গুহের ‘কালো ব্যাজ’ প্রকাশিত হয় টাপুর টুপুর-এ। এছাড়া ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল শামসুর রাহমানের অনবদ্য, গীতল ভাষায় রচিত স্মৃতিকথা ‘স্মৃতির শহর’। প্রকাশিত হয়েছিল আল মাহমুদ-এর ‘নোলক’ কবিতাটিও।

বাংলা শিশুসাহিত্যকে সোনালী ফসলে সমৃদ্ধ করছিল ‘টাপুর টুপুর’-এর রচনাসমূহ। বুলবন ওসমানের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘ঐরাবত’, মুনীর চৌধুরীর নাটিকা ‘কুপোকাত’, শওকত আলীর গল্প ‘রাজা’, শওকত ওসমানের গল্প ‘বাঘের চেয়ে হিংস্র’ সৈয়দ শামসুল হকের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘সীমান্তের সিংহাসন’ ছিল এর নিদর্শন। রবীন্দ্রনাথকে পত্রিকায় নানাভাবে শিশুদের কাছে উপস্থাপিত করা হয়েছে। যাতে তারা রবীন্দ্রসৃষ্টির বিস্ময়কর ভুবনের সঙ্গে পরিচিত হয়।

ষাটের দশকে বাংলার সাহিত্য আন্দোলনের পুরোভাগে যাঁরা ছিলেন, এখ্লাসউদ্দিন ছিলেন তাঁদেরই একজন। এ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাঁর অন্যতম পুরোধা সৈনিক ছিলেন তিনি। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এখ্দ্দন লিখেছেন- আজ হরতাল/ পেটা ঢাক ঢোল/ছোঁড় সড়কি/আন বল্লম/ধর গাঁইতি/ ধর বর্শা/দাও হাতে হাত/এই কাঁধে কাঁধ/তোল ব্যারিকেড/গড়ো প্রতিরোধ/কালো দস্যির/ ভাঙো বিষ দাঁত/ ধরো হাতিয়ার/করো গতিরোধ/খোল করতাল/আজ হরতাল।

অর্ধ শতকের বেশি সময় ধরে বাংলা ভাষার শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলে গেলেন সাহিত্যের সৌমমূর্তি এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ। ক্রিসমাসের মাত্র একদিন আগে ২৫ ডিসেম্বর ৭৪ বছর বয়সে চলে গেলেন শিশুসাহিত্যের এই সান্তা ক্লজ। পাতাঝরা শীতের মৌসুমে ঝরে পড়লেন তিনি। কিন্তু তাঁর চিরসবুজ লেখার মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: