কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

অদ্বৈত মল্লবর্মণকে নিয়ে সাহিত্য পরিক্রমা শান্তনু কায়সার

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • ১১ তম জন্মদিনে স্মরণ

১৯৭৪-এর মধ্যভাগে অধ্যাপনার সূত্রে যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাই তখনই অদ্বৈত মল্লবর্মণের কথা মাথায় ছিল। তাঁর ও ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর কথা জানা থাকলেও অদ্বৈত ছিলেন প্রায় বিস্মৃত নাম। বাংলা সাহিত্য ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও তাঁর কোন স্পষ্ট ও সামগ্রিক পরিচয় ছিল না। ফলে তাঁর বিষয়ে আগ্রহবোধ করে বিভিন্নভাবে খোঁজখবর নিই এবং ভাবি, শহরের অদূরবর্তী অদ্বৈত জন্মস্থান গোকর্ণঘাটে অন্তত যাওয়া যেতে পারে। অসমবয়সী লেখক মিন্নাত আলীর সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠলে প্রস্তাব করি, চলুন, গোকর্ণঘাটে যাই। তিনি সম্মত হন। তখনকার তরুণ আলোকচিত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালও ছবি তুলতে উৎসাহ বোধ করেন। আলোকচিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রাণতোষ চৌধুরী বলেন, তিনিও যাবেন। প্রথমবার এঁদের নিয়ে অদ্বৈতর জন্মভিটিতে ঘুরে আসি এবং বেশ ভালো লাগে। বহু আগে হস্তান্তরিত অদ্বৈতর ভিটির তখনকার মালিক রূপচান বর্মণের সঙ্গে দেখা হলে তাঁর কাছে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। রূপচান সেই ব্যক্তিদের অন্যতম যাঁরা অদ্বৈতকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে তাকে নিয়ে নানাজনের কাছে চাঁদা তুলতে গিয়েছিলেন।

অদ্বৈতর প্রায় সমবয়স্ক মতিউল ইসলাম ধীরে ধীরে আমার বন্ধু হয়ে ওঠেন। ১৯৮৪তে সত্তর বছর বয়সে তিনি যখন প্রয়াত হন তখন আমার বয়স চৌত্রিশ, কিন্তু বন্ধুত্বে কোনো ভাটা পড়েনি কিংবা পারস্পরিক উষ্ণ সম্পর্ক থেকেও পিছিয়ে আসিনি। এখানে উল্লেখ্য, অদ্বৈতর জন্ম ১৯১৪’র ১ জানুয়ারি আর মতিউল ইসলামের ঐ বছরেরই ৫ নবেম্বর। মতিউল ইসলাম যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিয়াজ মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন তার প্রস্তুত কাব্যগ্রন্থের পা-ুলিপি পাঠিয়ে প্রকাশনা বিষয়ে অগ্রজপ্রতিম কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের একাদশ শ্রেণীতে পাঠরত অদ্বৈত মল্লবর্মণের মতামত জানতে চাইলে তিনি এ চিঠিটি লেখেন। সংবেদনশীলতার পূর্ণ এই পত্রে অদ্বৈত তাঁর নির্মোহ মূল্যায়নের যে দৃঢ় মতামত ব্যক্ত করেন তার ফলেই এটি একটি সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক দলিল হয়ে ওঠে। এ চিঠিতে তাঁর ভবিষ্যত সাহিত্যিক হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০১৪ অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও মতিউল ইসলাম উভয়ের জন্মশতবর্ষ হওয়ায় পত্রলেখক ও প্রাপক এবং পত্রটি সাহিত্যামোদী সকলের দৃষ্টি নতুনভাবে আকর্ষণ করে। এমনিতেও ১৯৮৭ সালের বাংলা একাডেমী প্রকাশিত আমার ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ’ বইতে চিঠিটির পূর্ণ বয়ান প্রকাশিত হলে তখন থেকে তা সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কারণে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এসেছে।

১৯৭৪ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত চার দশকে আমার অদ্বৈতচর্চায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে অদ্বৈত মল্লবর্মণ নানা মাত্রায় পুনরাবিষ্কৃত ও পুনর্মূল্যায়িত হলেও এখনও এ বিষয়ে নানা বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে মাত্র দুটি উদাহরণের উল্লেখ করব।

১. ২০১৪’র ২ নবেম্বর প্রয়াত বাংলাদেশের একজন লেখকের প্রসঙ্গ তরুণতর আরেকজন লেখক ঢাকার একটি দৈনিকের ‘সাময়িকী’র ১২ ডিসেম্বর সংখ্যায় লিখেছেন, ‘তার (প্রয়াত লেখকের) সাহিত্যজীবনের সূচনা ছাত্রজীবনে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও তিনি ছিলেন সতীর্থ।’ সতীর্থ?! হ্যাঁ, ‘সতীর্থ’ই তো লেখা। ১৯১৪ ও ১৯৪৫-এ দুই আলাদা সময়ে জন্ম নেয়া ব্যক্তিদ্বয় কি করে পরস্পরের সতীর্থ হতে পারে? যেখানে সারা দেশ ও বাংলাভাষী মানুষদের একটা বড় অংশ মানে ২০১৪ অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মশতবর্ষ সেখানে ২০১৪’র নভেম্বরে ৬৯ বয়সে প্রয়াত লেখক কী করে তাঁর সতীর্থ হতে পারেন? এ বিষয়ে বোধহয় আর কথা না বলাই ভালো।

২. ১৯৯৯’র ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ‘শ্রাবণের আড্ডা’য় সেলিনা হোসেন বলেছেন, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ‘খ-িত জীবরে চিত্র।’ ‘এটা ব্যাপকভাবে কোনো সর্বজনীন মূল্যবোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত দার্শনিক উপলব্ধির চিত্রকল্প নয়।’ ‘প্রকরণের কথা যদি বলতে হয় তাহলে আমি বলবো যে, এটা একটা শিথিল লেখা। বর্ণনা এবং চরিত্র সবকিছু মিলিয়ে মালোদের জীবন, সেই জীবন-দর্শন বা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত সবকিছু মিলিয়ে এটার আঁটসাঁট বাঁধুনি নেই। এই শিথিল লেখা বিদেশে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করবে, এটা আমার মনে হয় না।’ ‘... অদ্বৈত মল্লবর্মণ সেই জীবনের মধ্যে থেকেও, জীবনবোধে তাড়িত হয়েছেÑ সে জীনের ভেতরে থাকা সত্ত্বেও উন্যাসটিকে ততটা শিল্পিত করতে পারেননি। কারণ তাঁর শিল্পবোধ তত তীব্র ও তীর্যক ছিল না।’

সেলিনা হোসেন আমাদের বিশিষ্ট লেখক ও কথাসাহিত্যিক। তাঁর মন্তব্যের দায় তাঁরই। এ নিয়ে অপাতত বিস্তারিত আলোচনা তথা বিতর্কের সুযেগ না থাকলেও দু-চারটে কথা বলা জরুরি বলে মনে করি। উপন্যাসের বিষয়ই তাকে সহজ এবং সে অর্থে ‘শিথিল’ করেছে। উপন্যাসের মালোরা জানে, তাদের বউ-ঝিরা ‘সুন্দরী’ হয় না। কিন্তু এ নিয়ে তাদের কোনো দুঃখ নেই, জীবনের সত্য হিসেবেই তারা তা মেনে নেয়। সেকারণে উপন্যাসটি যদি ‘শিথিল’ হয়েও থাকে সেটি তার বৈশিষ্ট্য; দোষ, অযোগ্যতা অথবা শিল্পহীনতা নয়। ‘তিতাস’কে ঔপন্যাসিক বলেছেন সাধারণ নদী, এর নাম ইতিহাস বা অভিধানে পাওয়া যায় না। কিন্তু তাতে সে লজ্জিত হবে কেন? অনেক সময় সাধারণত্বই অসাধারণত্বের প্রকাশ অথবা দ্যোতক হয়ে ওঠে। ঘরোয়া কাজললতাকে ‘বৈদুর্যমালিনী’ নাম দিলে তার গৌরব বাড়ে না। ‘চম্পকবতী’ বা ‘অলকনন্দা’ নামে তিতাস বড় হয় না। ‘সৌম্যশান্ত করুণ স্নিগ্ধ প্রসাদগুণের মাধুর্যরঞ্জিত শিল্প’ ‘শিথিল’ হলেও শিল্পগুণে ন্যূন নয়।

তবে এ শিল্প সর্বদা শিথিলও নয়, উপন্যাসের ঋজু চরিত্র বাসন্তীর মধ্যে বিপ্লবী নারী বাস করে। সে বলে, ‘আর কিছু না পারি অগুন লাগাইয়া সবকিছু জ্বালাইয়া দিতে পারি।’ ‘অপমানের বাঁচনের থাইকা সম্মানের মরণও ভালা দিদি।’ তিতাসের জলও হেলাল হাফিজের ভাষায় সেই জল, যে জলে আগুন জ্বলে। শুভঙ্কর ঘোষের ভাষায় প্রথমাংশটি বলে শেষে আমার মন্তব্যটি যোগ করা যাক : ‘পার্ল বাক বা হেমিংওয়ে কিংবা ‘পদ্মানদীর মাঝি’র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সামনে থাকলেও বিষয় নির্বাচনে, উপস্থাপনে, বয়ন কৌশলে এই ‘জাউলার পোলা’ স্বকীয়তাতেই আস্থাশীল ছিলেন’ (ব্রাত্যজীবনের কথকতা : কথাকার অদ্বৈত মল্লবর্মণ/অনুষ্টুপ, ১৪০৪; সম্পাদক : অনিল আচার্য, কলকাতা এবং ‘তিতাস’-এ তিনি তা প্রমাণ করেছেন।

দুই

২০১৪ ছিল অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মশতবর্ষ। এ উপলক্ষে আমি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় যাই। অদ্বৈতর জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০১৩’র জানুয়ারি থেকে সাহিত্য একাডেমী ও তিতাস আবৃত্তি সংগঠন এ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। স্মারক বক্তৃতাসহ সাহিত্য একাডেমী ২০১৪’র জানুয়ারি থেকে বছরব্যাপী অদ্বৈতকে স্মরণ ও তাঁর মূল্যায়ন করে। একটি স্মারক বক্তৃতা দেন জাকির তালুকদার। তিতাস আবৃত্তি সংগঠনের আয়োজনে ও মুনীর হোসেনের কর্মোদ্যোগে ২০১৫’র অদ্বৈত সম্মাননা পেতে যাচ্ছেন জয়নুল হোসেন। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য সরকার বহুদিন থেকে অদ্বৈত জন্মোৎসব পালন ও নানা আয়োজনে তাঁকে স্মরণ করে।

২০১৪’র ১০ মার্চ মৌলভীবাজারে অদ্বৈত মল্লবর্মণ জন্মশতবর্ষ পর্ষদ শতবর্ষ উপলক্ষে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। পর্ষদ-আহ্বায়ক আবদুল মালিকের সভাপতিত্বে সেমিনার সঞ্চালনা করেন মাহফুজুর রহমান, জন্মশতবর্ষ স্মারক বক্তৃতা দিই আমি। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বগুলার গোরাগাঙনি পরিষদ এবং কলকাতার অদ্বৈত মল্লবর্মণ এডুকেশনাল এ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি অদ্বৈতর জন্মশতবর্ষের দিন ০১ জানুয়ারি রামমোহন লাইব্রেরি মিলনায়তনে জন্মশতবর্ষ স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে। উভয়ক্ষেত্রে স্মারক বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করি।

বগুলার আয়োজনটি বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য এইজন্য যে, এটি পশ্চিমবঙ্গের এক প্রান্তিক ও গ্রামীণ ঐলাকা। তবু এখানে বিদ্যুতের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য সংগঠন ও সুধী সমাজ রয়েছে। সেদিন সন্ধ্যায় বিদ্যুতহীন হ্যারিকেনের স্বল্প আলোতে আমি যখন বক্তৃতা দেই তখন সকলের অখ- মনোযোগ আমাকে বিশেষভাবে আনন্দ দেয়। তাদের জিজ্ঞাসার মধ্যে ছিল বুদ্ধিদীপ্ত ভালোবাসার ছাপ। সেখানে আমি বলি, শুধু জেলে অথবা শুধু শিল্পী হয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ হওয়া যায় না। উভয়ের যুগলবন্দী তাঁকে দিয়ে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ লিখিয়ে নেয়। এখানে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কলকাতার ‘কথারূপ’ সম্পাদক গৌতম অধিকারী।

১ জানুয়ারি রামমোহন লাইব্রেরিতে আমার বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘জন্মশতবর্ষে অদ্বৈত মল্লবর্মণ : ব্যক্তি ও শিল্পী।’ আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৬’র ৩০ জানুয়ারি হবে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের জন্মশতবর্ষ। পূর্ববাংলার ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গার এই সন্তান অদ্বৈত মল্লবর্মণকে নিয়ে একটি গল্প লেখেন ‘যাত্রী,’ পরে নাম বদলে যা হয় ‘যাত্রাপথ।’ অদ্বৈতর মতো নরেন্দ্রনাথ মিত্রও এক সময় কলকাতার নারকেলডাঙ্গায় থাকতেন। সেখানকার অদ্বৈতর বাসার যে বর্ণনা নরেন্দ্রনাথ তাঁর গল্পে দিয়েছেন তাতে বোঝা যায়, তিনি তাঁকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জানতেন। নারকেলডাঙ্গার নর্থ রোডে ‘অর্ণব (অর্থাৎ অদ্বৈত) বাসা করলো। পুরনো বাড়ির দু’খানা ঘর। দু’খানা বলা চলে না। দেড় খানা। ..... আগের ভাড়াটেদের রান্নার জায়গায় বেডরুম করা হয়েছে।’ অনন্তচরণ মালোর পরিচয়ে নরেন্দ্রনাথ মিত্র এখানে অদ্বৈতকেই চিত্রণ করেছেন।

অনন্তর বন্ধু কল্যাণ যখন তার কাছে জানতে চায় ‘লেখাটা একেবারে ছেড়ে দিলে নাকি?’ তখন যে সে বলে, ‘একখানা উপন্যাস ধরেছি’ তাতে পরিস্থিতিগত সাক্ষ্য থেকে মনে হয়, তা ‘তিতাস’ই বটে। ‘মোহাম্মদী’তে এর প্রাথমিক খসড়া প্রকাশের পর উপন্যাসটির পরিমার্জন ও তার চূড়ান্ত পান্ডুলিপি প্রস্তুত করবার জন্য অদ্বৈত নিজের চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁচরাপাড়া যক্ষ্মা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে আবুল হাসান যেমন কবিতার শহীদ হয়েছিলেন তেমনি তাঁর নিজের লেখার শহীদ হন অদ্বৈত মল্লবর্মণ।

এই উপন্যাসে তিনি ‘জলের রূপ’ দেখেছেন। তিনি যে বলেন, ‘পল্লীরমণীর কাঁকনের দুই মুখের মধ্যে যেমন একটু ফাঁক থাকে, তিতাসের দুই মুখের মধ্যে রহিয়াছে তেমনি একটুখানি ফাঁক-কিন্তু কাঁকনের মতোই তার ‘বলয়াকৃতি’ তাতে শিল্পীর রূপতৃষ্ণাটিও বুঝতে অসুবিধে হয় না।

জল ও জেলেদের উপন্যাস হলেও-কাটিলে কাটা যাইবে না, মুছিলে মোছা যাইবে না-চাষী ও জেলেদের এমন সম্পর্ক আবিষ্কার করেছেন অদ্বৈত। ফলে কাদিরের মতো চাষী অথবা রামপ্রসাদের মতো জেলেরা কখনও ‘বেপার’ করে না। বেপারীরা বড় মিছা কথা কয়। ‘সাত পাঁচ বারো কথা কইয়া লোকেরে ঠকায়। কিনবার সময় বাকি, বেচবার সময় নগদ আর যে পাল্লা দিয়া জিনিস মাপে তারে কিনবার সময় রাখে কাইত কইরা আর বেচবার সময় ধরে চিত কইরা।’

অদ্বৈতর কাছে কলকাতা ছিল ধফড়ঢ়ঃবফ ষধহফ, গোকর্ণঘাট বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিজেদের ভূমি, বাংলাদেশের জন্মের বহু আগে (১৯৫১) মৃত্যুবরণ করলেও স্বদেশের সেই খাঁটি ভূমিকে তিনি কলকাতায় বসেও প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখেছেন। সেকারণে ‘তিতাস’-এর পূর্ব উপন্যাস ‘শাদা হাওয়া’য় শ্রমিক নেতা বিনয় বাগচীর কণ্ঠে পাকিস্তানকে দৃশ্যপটে রেখে এই বার্তা ধ্বনিত হয়, ‘সমগ্র দেশের সকলের জন্য সামগ্রিক যে স্বাধীনতা তার মধ্যে পাকিস্তান আর না-পাকিস্তান কিন্তু থাকতে পারে না।’ ‘সেদিন যাতে আর না আসে তারি জন্য হবে নবসংস্কৃতি। তার মধ্যে সম্প্রদায় নিয়ে কলহ করার অবকাশই থাকবে না-মানুষ এতোখানি কর্মতৎপর হবে।’ ‘চাষাতে চাষাতে জেলেতে জেলেতে কেরাণীতে পাশাপাশি কাজ কষ্টসাধ্যের দরুন মনের ঐক্য পাবে। স্বার্থবাদী নেতারা তাকে ব্যবহত করতে পারবে না। সুস্থ আবহাওয়া এলে নেতৃত্বের বাহুল্য অনেক কমে যাবে।’

এ উপন্যাসের রচনাকাল ১৯৪২। তারপর দু’বার স্বাধীনতা পাওয়ার এত বছর পরেও আক্ষরিক ও মর্মগতভাবে এখনও তা কী সত্য!

২০১৪’র ২৯ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করে। বহিরাগত হলেও আমাকে এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করার জন্য আমন্ত্রণ জানান বিভাগের চেয়ারম্যান বেগম আকতার কামাল। সেমিনারে দুটি প্রবন্ধ পড়েন দুই অধ্যাপক সিরাজ সালেকীন ও মুনীরা সুলতানা। আলোচনা করেন বিভাগের অধ্যাপকদ্বয় বিশ্বজিৎ ঘোষ ও গিয়াস শামীম। সালেকীন অদ্বৈত রচিত তিনটি উপন্যাসের ধারাক্রম অনুসরণ করে ‘জীবন যখন সাহিত্য’র প্রতিপাদ্য ব্যাখ্যা করেন। মুনীরা সুলতানা স্বাদেশিকতা ও ঐতিহ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করে এদের ঋণ ও ঋদ্ধিকে তুলে ধরেন।

সভাপতির বক্তব্যে অদ্বৈতচর্চার নানা মাত্রাকে সরলীকরণের যে সুযোগ নেই সেই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আমি বলি, দৃশ্যত সহজ ও সরল মনে হলেও অদ্বৈতর কথাসাহিত্য. তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘তিতাস’সহ মোটেই তা নয়। প্রতিপাঠে এর যে অর্থান্তর ও রূপান্তর ঘটে তা থেকে ঐ জটিলতার সন্ধান করা যেতে পারে।

তিন.

এতদিন পর্যন্ত আমরা অদ্বৈতর পাঁচটি গল্পের কথা জানতাম-‘সন্তানিকা’,‘স্পর্শদোষ’,‘বন্দী বিহঙ্গ,’ ‘কান্না’ ও ‘আশালতার মৃত্যু।’ অতি সম্প্রতি তাঁর আরেকটি গল্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি সম্ভবত ১৯৩৬-এ প্রকাশিত। অদ্বৈত ১৯৩৪-এ ছাত্রজীবন অসম্পূর্ণ রেখে একাদশ শ্রেণীর ছাত্র থাকার সময় কুমিল্লা থেকে কলকাতায় চলে যান। তখন তাঁর বয়স মাত্র বিশ। তার দু’বছর পর গল্পটি প্রকাশের সময় তাঁর বয়স বাইশ।

গল্পের নায়ক ছোট রেলস্টেশন ফকিরহাটের টিকেট চেকার। তার এ স্টেশনে কাজ করতে ভালো লাগে না। তার বন্ধু তাকে পরামর্শ দেয়, সে যেন দুটি কাজ করে। প্রথম মাস দুয়েকের ছুটি নিয়ে আত্মীয়স্বজনের পরিবেশে থাকে এবং ভালো দেখে একটি মেয়েকে বিয়ে করে।

এরপর আত্মজৈবনিক এ গল্পের নায়ক অথবা গল্পকার নিজে পনের বছর বেঁচেছিলেন। এর মধ্যে না তিনি ব্রাহ্মবাড়িয়ার আত্মীয়স্বজনের কাছে ফিরে গেছেন, না তিনি বিয়ে করেছেন।

গল্পের পটভূমি কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝামাঝি বাস্তব একটি রেলস্টেশন, যেখানে গল্পের বর্ণনানুসারে, দিনে পাঁচবার ও রাতে তিনবার ট্রেন যাতায়াত করে। তবু গল্পের নায়কের স্টেশনে যাওয়ার সময় হয় না।

বাস্তবেও অদ্বৈত আর কলকাতা থেকে ফেরেন না। তবু কলকাতায় থেকেও তাঁর গল্পের পটভূমি হয় নিজের এলাকার রেলস্টেশন। মনে ‘তাঁর নিত্য আসা-যাওয়া।’ কলকাতায় থেকে যে জায়গাকে তিনি নির্বাসনে পাঠিয়েছেন অথবা নির্বাসনে থেকে যাকে সততই মনে পড়ে তাকে তিনি গল্পে তুলে আনেন। স্বপ্ন-বাস্তবতার এই মধুর আনন্দ-বেদনায় তিনি বসবাস করেন। তাকে ভুলে যাবার ভ্রান্তি অথবা স্পর্ধা যেমন তাঁর, তেমনি আমাদেরও নেই।

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: