আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারী উন্নয়ন ॥ সাফল্য ও সম্ভাবনা

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • রুখসানা কাজল

‘বাংলাদেশ লৈঙ্গিক সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যগুলো তুলে ধরার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে’ বলে ইউএনডিপিও মন্তব্য করেছে। এটি কি কেবল মন্তব্য নাকি একটি সময়োচিত সাধুবাদ? অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশের নারীদের অগ্রগামিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তুলনা করেছেন ভারতের মতো উন্নত একটি দেশের নারী প্রগতির সঙ্গে। সত্যিকারভাবে বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে সামাজিক বাধাবিপত্তি, রাজনৈতিক অনৈক্য অস্থিরতা, ধর্মীয় কুসংস্কার আর চোখ রাঙ্গানিকে পেছনে ফেলে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। আজ বাঙালী নারীরা তাদের কর্মের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে পেরেছে এবং পারছে যা কিনা অতীতে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে ছিল অনুল্লেখ্য। ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি।

বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বের এক জেলা শহরের নিম্নবিত্ত ঘরের এক নারী শাশুড়ির সঙ্গে মিলে নিজের পুকুরে মাছ, হাঁস এবং পুকুরের উপরে কচুরিপানার ধাপ তৈরি করে দুটি মেয়েকে শিক্ষিত ও চাকরিজীবী করে তুলেছেন। নিজের সংসারকে একটি শক্ত কাঠামোর ওপর নির্মাণ করে নেয়ার দুই কারিগর নারী। কিন্তু পঁচিশ বছর আগের এই পরিশ্রমের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন কেবলমাত্র কয়েকজনের কাছ থেকে। ধন্য বলেছিল আশপাশ বা আত্মীয়পরিজন ও চেনাজানা মানুষেরা। তখনকার সময় এটি ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা ছিল মাত্র। কিন্তু আজ বাংলাদেশের শহরে বা গ্রামের প্রতিটি নারী নিজের ভিত্তি এবং সংসারের প্রয়োজনে যে যার অবস্থানে থেকে কিছু না কিছু কাজ করে চলেছে। সংসার এখন আর একার আয়ে যেমন চলে না তেমনি একক সিদ্ধান্তে সংসারের সব কাজ আজ করা হয় না। এরকম একটি অভূতপূর্ব সামাজিক পরিবর্তনে বর্তমান সরকারের দুই দফায় ক্ষমতায় থাকাকালীন গৃহীত নারীবান্ধব নীতিমালাগুলো নারী উন্নয়নে হাতখোলা সহায়ক সাথী হিসেবে কাজ করেছে।

২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর বর্তমান সরকার নারীর মেধা, দক্ষতা, অবস্থান ভেদে অর্জিত শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে নারী উন্নয়নের ব্যাপক কর্মসূচী হাতে নিয়েছিল। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১১-১৫) মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশকে ২০২১ সালের ভেতর একটি মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অর্ধেক জনশক্তি নারীকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে নারীর ক্ষমতায়নের প্রধানতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে। নারীর প্রতি সব রকমের বৈষম্যের অবসান করে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা এবং সমঝোতা তৈরি করে একটি সমশ্রমে উদ্বুদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে বর্তমান সরকার। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নেয়া পদক্ষেপগুলোর সাফল্য ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে। এমডিজি বা সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০১৫ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর (সার্ক) মধ্যে বাংলাদেশের অগ্রগতি সবিশেষ লক্ষণীয় । তবে সার্ক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে কিছু বিষয়ে পিছিয়ে রয়েছে এখনও। অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জনে বাংলাদেশের নারীদের জন্য ব্যাপক কর্মপন্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী সমাজের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী রয়েছে। নানা প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানের উদ্ভাবন, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ব্যাংকিং সহায়তা, সেবামূল্যের বিনিময়ে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাসহ দুস্থভাতা, মাতৃকালীন ও দুগ্ধদায়ী মায়ের ভাতা, তালাকপ্রাপ্তা ভাতা, অরক্ষিত এবং হত দরিদ্রের জন্য ভিজিএফ বা খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি-সংক্রান্ত প্রযুক্তি এবং ঋণসহ নানা ধরনের উন্নয়ন সহায়ক পদক্ষেপ চালু রেখেছে এই সরকার। যার সাফল্য অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ২০১৪-১৫ বাজেটেও ৪০টি মন্ত্রণালয়ের জন্য লিঙ্গ সংবেদী বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে, যেটিতে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ বিশেষভাবে নারী উন্নয়নের জন্য ধরা হয়েছে, যা এই খাত ও মন্ত্রণালয়েরগুলোর বরাদ্দের উদ্বৃত্ত।

মা এবং শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় এই সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। মায়েদের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে, সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটিকে চার মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাসের করেছে। বাংলাদেশ মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার (গগজ) ব্যাপক সাফল্যের সঙ্গে কমিয়ে এনেছে। নারীবান্ধব মডেল হাসপাতাল স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের জেলায় জেলায়। মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিমের আওতায় একটি ভাউচার প্যাকেজ দেয়া হয়েছে। যার অধীনে তিনটি প্রসবপূর্ব চেকআপ, দক্ষ দাইয়ের অধীনে নিরাপদ জন্মদান, একটি প্রসব পরবর্তী চেকআপ এবং যাতায়াত খরচ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিটি শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণসহ বিনা বেতনে লেখাপড়া করার ব্যবস্থা করেছে। ফলে গত কয়েক বছরে ছেলেদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত মেয়েদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার আগের তুলনায় বেড়ে চলেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মেয়েদের ভর্তির হার এখন ৫১% এবং মাধ্যমিকে তা ৫৩%, যেখানে ছেলেদের ক্ষেত্রে তা ৪৭%, কয়েক বছর পেছনে ফিরে দেখা যাবে যখন ছেলেদের ছিল ৬৫% এবং মেয়েদের মাত্র ৩৫%।

জাতীয় নারী উন্নয়ননীতি ২০১১ সরকারের একটি সফল উল্লেখযোগ্য নীতি। যেখানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নারীদের সম্পদের সমান অধিকার এবং ব্যবসায়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। নারীর প্রতি সহিংসতা দমনের জন্য সরকার পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা) বিধি ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। পাশাপাশি ৭টি বিভাগে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের ব্যবস্থা করেছে যেখানে নারীরা বিনা পয়সায় মেডিক্যাল চিকিৎসা, আইনী সহায়তা, পলিসি সহায়তা এবং আক্রান্তদের পুনর্বাসন সেবা দিয়ে যাচ্ছে। লিঙ্গ সম্পর্কিত অপরাধ যেমন ধর্ষণের কার্যকর তদন্তের জন্য ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি কিছু জাতীয় হাসপাতালে ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাব এবং ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। ধর্ষিত নারীদের জন্য আরও সহজ করতে দুস্থ সহায়তা কেন্দ্রগুলোয় প্রশিক্ষিত এবং পেশাদার নারী অফিসাররা পরিচালনা করছেন। নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় (গঙডঈঅ), এখন একটি হেল্পলাইন (১০৯২১) খুলেছে যেখান থেকে সহিংসতায় আক্রান্তরা সহজেই বিভিন্ন আইনী, মেডিক্যাল, পুনর্বাসন এবং পরামর্শ সহায়তা নিতে পারবেন।

অশিক্ষার মতো বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের নারীদের জীবনে একটি বড় বাধা। বাল্যবিবাহ আইন-১৯২৯ এর সংশোধন চলছে এবং শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রথমবারের মতো শিশু আইনও প্রণীত হচ্ছে। বাংলাদেশের নারীরা বিদেশে গিয়েও কাজ করে অর্থ উপার্জন করছে। প্রবাসী নারীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়। এছাড়াও জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়ানোসহ ইউনিয়ন কাউন্সিল, উপজেলা পরিষদ এবং মিউনিসিপ্যালিটিগুলোয়ও সংরক্ষিত আসন মোট সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বাড়ানো হয়েছে এবং সেসব আসনে নারীরা সরাসরিও নির্বাচিত হতে পারেন। বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, স্পীকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং সংসদের উপনেতা বেগম সাজেদা চৌধুরী সবাই নারী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম, বুয়েটের উপাচার্য প্রফেসর খালেদা একরামসহ সুপ্রীমকোর্টের বিচারক, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়Ñ অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপ-কমিশনার, পুলিশের উচ্চপর্যায়, সশস্ত্রবাহিনী, অতি সম্প্রতি নৌবাহিনীতে, ইউএন শান্তিকর্মী ছাড়াও আমাদের মেয়েরা ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশের নাম সুনামের সঙ্গে উন্নত করে তুলছেন। যেমন পর্বতকন্যা নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়ার নাম উচ্চারিত হচ্ছে সাহসী কন্যা হিসেবে। এছাড়া গণমাধ্যমের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশার কর্মক্ষেত্রে নানারকম বাধা উপেক্ষা করে বাংলাদেশের নারীরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করছে। এই সমস্ত ঘটনায় নারীর সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই নারীর ক্ষমতায়নের ক্রমোন্নতি নির্দেশ করে। বর্তমান সরকারের সাগ্রহ প্রচেষ্টার ফলেই বাংলাদেশ নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। এই সরকারের নারী উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপগুলো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হলে আশা করা যায় বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ একদিন সত্যি একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: