কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুর রাষ্ট্রীয় সম্মান

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • সাবিনা ইয়াসমিন

জন্মের পর থেকে সামাজিকভাবে অবহেলা আর নিগ্রহের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়েছে তাকে। ৪২ বছরের জীবনে যুদ্ধ শেষ হয়নি কখনও। ’৭১-এর যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহারের তাই প্রায়ই মনে হতো ‘জন্মই যেন আজন্ম পাপ।’ অপমানে বেড়ে ওঠা জীবনে একটু সান্ত¡নার পরশ দেয়ার জন্য ছিল না কেউ। আদালতের কাঠগড়ায় যেন এবার মিলল সেই সান্ত¡নার ছোঁয়া। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এই প্রথম অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি ধর্ষণের দায়ে কোন আসামিকে ট্রাইব্যুনাল দ-াদেশ প্রদান করেছে। রায়ের পর্যবেক্ষণের এক অংশে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের ‘ওয়ার হিরো’ বা জাতীয় বীর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের ইতিহাস এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। দীর্ঘ এই সময়টাতে আমরা যা হারিয়েছি তা কখনও ফিরে পাবার নয়। বিনিময়ে পেয়েছি স্বাধীনতা। স্বাধীনতা অর্জনের এ সংগ্রামে বাঙালী নারী-পুরুষকে দিতে হয়েছে ঘরবাড়ি সহায়সম্পত্তি এমনকি বুকের তাজা রক্ত পর্যন্ত। আর তাতেই শেষ নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলে, তিরিশ লাখ শহীদের পাশাপাশি ২ লাখ কিংবা তারও বেশি মা-বোনকে হারাতে হয়েছে সম্ভ্রম।

সম্ভ্রমহারা সেসব নারীরা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আরও বেশি নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। শিকার হয়েছেন অবহেলা আর অপমানের। শত্রুপক্ষের পাশবিক নির্যাতনের সেই ক্ষতচিহ্ন তাঁদের শুকায়নি আজও। দেশ স্বাধীন হলেও সমাজ তাদের স্বাধীনতা দেয়নি। বীরাঙ্গনা পরিচয় তাঁদের যেন আরও বেশি অচ্ছুত শ্রেণীতে পরিণত করেছে। পাকস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের ধর্ষণের ফলে যাঁরা গর্ভবতী হয়েছেন তাঁদের অবস্থা হয়েছে আরও করুণ। পিতৃপরিচয়হীন যুদ্ধশিশুকে নিয়ে যেন বীরাঙ্গনা মায়ের বঞ্চনা আর গঞ্জনার শেষ হয়নি কখনও। ৪৩ বছরে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ মথা উঁচু করে দাঁড়ালেও বীরাঙ্গনা মা ও তাঁর সন্তান এই স্বাধীন ভূ-খ-ে মাথা নিচু করেই বেঁচে আছেন। ধিক্কার আর বঞ্চনা নিয়ে বেঁচে থাকা তাদের এবার সম্মান জানাল মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামি সাবেক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের দ-াদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ২৬টি অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে হত্যা-গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, আটক, মুক্তিপণ আদায়, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও ষড়যন্ত্রের ১৪ অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে ৭টিতে ফাঁসি, ৪টিতে আমৃত্যু কারাদ-, ৩টিতে ২২ বছরের কারাদ- ও দুটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাতে খালাস দেয়া হয়। আসামির বিরুদ্ধে একাত্তরে দুই নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। ধর্ষণের এ দুটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তাঁদেরই এক বীরাঙ্গনা মায়ের গর্ভে জন্ম নেয় শামসুন্নাহার। এ মামলায় শামসুন্নাহারও সাক্ষ্য দেন।

দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহার মানবতাবিরোধী অপরাধে কোন মামলায় সাক্ষ্য দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধকালীন ধর্ষণ সাধারণ ধর্ষণের মতো নয়। যে সাহসী নারীরা একাত্তরের ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তাঁরা সারা জীবন লড়াই করে যাচ্ছেন। তাঁরা সন্তান ধারণে বাধ্য হয়েছেন। তাদের ক্ষতি অপূরণীয়। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বীরাঙ্গানা ও যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনে সরকারের পদক্ষেপ নেয়ার কথাও বলা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে শত্রুর গুলিতে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন নিঃসন্দেহে তাঁদের আত্মত্যাগের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। তাই দেশ ও রাষ্ট্র তাঁদের বীরশহীদ কিংবা বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধি ও সম্মান দিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধকালে যেসব নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাঁদের বীরাঙ্গনা উপাধির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক বঞ্চনা ও নিগ্রহ পোহাতে হয়েছে। দীর্ঘ চারদশক পর এবার আদালত তাদের যথার্থ সম্মান দিয়েছেন। বীরাঙ্গনা নারী ও যুদ্ধশিশুদের ‘ওয়ার হিরো’ উল্লেখ করে তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতা নারী ও যুদ্ধশিশুদের তালিকা করে পুনর্বাসন এবং সামাজিকভাবে তাদের সহায়তা প্রদানে রাষ্ট্রকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

সম্প্রতি বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। শুধু স্বীকৃতি দেয়াই নয় বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসন ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে রাষ্ট্রের দায় কিছুটা হলেও লাঘব হবে। তবেই দেয়া হবে সেসব জাতীয় বীরদের প্রাপ্য সম্মান।

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: