মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

শীতে নদীপথে দক্ষিণে

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • লিয়াকত হোসেন খোকন

শীত এলেই কোথাও না কোথাও বেড়াতে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। দূরে গ্রামের বনপথে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম। ভাববই না কেন, গাঁয়ের পথে রাখালের সঙ্গে দেখা হলে, তারই সঙ্গে যে ভাব জমবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। জসিমকে ফোন দিলাম। ‘হ্যালো’ বলতেই জসিম বলল, ‘কেমন আছেন?’ হ্যা, ভালই। আজকেই তোমার লঞ্চে দূরে কোথাও যেতে চাই...। অপর প্রান্ত থেকে জসিম জানাল, সিঙ্গেল কেবিন রাখব, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই চলে আসুন। সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ল। তাকিয়ে দেখি বুড়িগঙ্গার দুই তীরে কত না রঙের বাতি! সবই যেন ঝলমল করছে। হঠাৎ কানে ভেসে এলো ‘নদীর বুকে ঢেউয়ের কল্লোল মাতন তুলেছে ভালবাসার লগন সবার হৃদয় মোহনায়, আয় আয় ... নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে সুদূর নীলিমায় রামধনু ওই আবির ছড়ায়...’ গানের কথাগুলো।

একটু পরে কেবিনবয় এসে উপস্থিত। বলল, রাতে খাবেন তো? হ্যাঁ। তা কী আছে? বয় বলল, মুরগির মাংস, রুই মাছ, পাবদা মাছ আছেÑ সঙ্গে ডালের চচ্চড়ি তো থাকবেই। কেন পদ্মার ইলিশ নেই? ও বলল, পদ্মার ইলিশ পাবেন কোথায়! পদ্মার ইলিশ তো কবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আজকাল যেসব ইলিশ-টিলিশ খান তা তো সাগরের ইলিশ।

রাত ১০টায় খেয়েদেয়ে উঠে বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল আকাশের গায়ে চাঁদ। চাঁদের পানে তাকাতে তাকাতে এক সময় মনেরই অজান্তে ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে উঠেই শুনি লঞ্চ এখন বানরীপাড়ায় ঘাট দিয়েছে। বাইরে থাকা ছেলেটির সঙ্গে কথা হতেই ওর মুখে শুনলাম, বানারীপাড়া থেকে খুব কাছেই চাখার। ওখানে রয়েছে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক মিউজিয়াম কলেজ। একথা শুনে লাগেজ নিয়েই নেমে পড়লাম বানারীপাড়ায়। প্রথমে এলাম মিউজিয়ামে, ওটি দেখে চাখার ফজলুল হক কলেজ দেখে চললাম গুঠিয়ার দিকে। গুঠিয়ার বিশাল মসজিদ দেখে পুকুর ঘাটে এসে বসলাম। বালাবাড়ি ঘুরে দেখলাম। মন্দিরও চোখে পড়ল ওখানে। একটু এগিয়ে দুর্গাসাগরও দেখে নিলাম।

এক রাত বানারীপাড়ায় থাকার পরদিন সকাল ৭টার লঞ্চে উঠলাম, লঞ্চ যাচ্ছে ভাণ্ডারিয়ার দিকে। নদীপথ হয়ে লঞ্চ ইন্দেরহাট, কাউখালি হয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা পর এসে ভিড়ল হুলারহাটে। প্রচণ্ড শীতে চাদরটা গায়ে দিয়ে নামলাম হুলারহাটে। দেখি দাঁড়িয়ে আছে সেই ‘অর্জুন’। বছর খানেক আগে ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল রায়েরকাঠির এক মন্দিরে। অর্জুন আমাকে বুকে জড়িয়ে উষ্ণ ভালবাসা জানিয়ে বলল, এবারও বুঝি ভ্রমণে এসেছেন! বললুম, তুমি কি আমার ভ্রমণ সঙ্গী হবে? অর্জুন হেসে বলেছিল, কেন হব না! রিকশায় উঠে আমরা চললাম রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি দেখতে। হুলারহাটের রাস্তার পানে তাকাতে তাকাতে বারবার মনে পড়ল সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের কথা। তার আমলেই নির্মিত হয়েছিল ‘হুলারহাট-পিরোজপুর সড়ক’। ১৯৪৬ সালে এই সৈয়দ আফজাল পিরোজপুর পৌরসভার প্রথম মুসলিম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে খাদ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৫২ সালে তিনি কৃষিমন্ত্রীও নির্বাচিত হন। রায়েরকাঠির দিকে পরে যাব ভেবে প্রথমেই এলাম তৎকালীন মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের বাড়ি দেখতে। নাম ‘চাখার হাউস’।

ওখান থেকে রায়েরকাঠিতে এসে দেখি ভগ্ন দালানকোঠা, মন্দির-মঠ। সবই যেন অযতœ-অবহেলায় পড়ে আছে। সংরক্ষণের নেই কোন উদ্যোগ। জঙ্গলে আচ্ছন্ন মঠের ওখানে পরিচয় হলো এক বৃদ্ধের সঙ্গে। ওখান থেকে ফিরে এলাম পিরোজপুর শহরে। একে একে দেখে নিলাম করিমুননেছা স্কুল, কালীবাড়ি মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, বড় মসজিদ, বলেশ্বর নদী ও ব্রিজ। পড়ন্ত বিকেলে এলাম সত্যেন্দ্রনাথ চৌধুরীর দাহ স্থান দেখতে। কিন্তু তা আর হলো না। ১৯৭১ সালে পকিস্তানী হানাদার বাহিনী ওই স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙেচুড়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল। ওখানে গিয়ে দেখি নতুন এক বিশাল ভবনে বসেছে পিরোজপুর সরকারী মহিলা কলেজ। তখন বারবার মনে পড়ল ১৯৬০-৬১ সালের কিছু স্মৃতি। সত্যেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীর স্মৃতিস্তম্ভের পাশেই ছিল চম্পা-বকুল গাছ। সন্ধ্যার পর ওখানে শুরু হয়েছিল সঙ্গীতানুষ্ঠান। বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী সত্য চৌধুরী সেবার এসেছিলেন, তখন আমার বয়স আট কি নয় বছর। উনি গেয়েছিলেন ‘সেই চম্পা বকুল তলে তোমারে দেখেছি বনপথে চলিতে চলিতে/ঝরাফুল মঞ্জুরি তুলিতে আঁচলে/সেই সুন্দর অভিসার লগনে চাঁদ উঠেছিল বুঝি নীল গগনে/তব অন্তর ছিল প্রেম মগনে...।’ বারবার গানের এই কথাগুলো ওখানে গিয়ে মনে পড়ছিল। ভাবলাম, কি ছিল পিরোজপুর, আজ কিই না হয়ে গেল? আগে তো ঘর থেকে বের হতেই চোখে পড়ত ‘ধান ক্ষেত’। তেমনটি আজ কোথায়! তবুও কেউ যদি এই শীতে নদীপথে দক্ষিণাঞ্চলের এই পথে আসেন তবে ক্ষণিকের জন্য হলেও আনন্দ পেতে পারেন। শীতে নদীপথে লঞ্চে উঠে দূরে বহু দূরে যেদিকেই যান না কেন, সে যেন আলাদা এক মজা।

বিভিন্ন তথ্য

ঢাকা থেকে নদীপথে সদরঘাট থেকে লঞ্চে উঠে বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠি, ইন্দেরহাট, কাউখালি, হুলারহাট, ভাণ্ডারিয়াসহ কত না জায়গায় যাওয়া যায়। এসব জায়গায় যাওয়ার জন্য রয়েছে অগ্রদূত, রাজদূত, শাহীদূত, টিপু, আঁচল নামের লঞ্চগুলো। সিঙ্গেল কেবিনে ভাড়া ৮০০ টাকা। ডাবল কেবিনে নেয়া হয় ১৬শ’ টাকা। জনপ্রতি হাজার তিনেক টাকা নিয়ে গেলে নদী পার্শ্ববর্তী এ জায়গাগুলো দেখে আসা যাবে।

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: