আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্বর্ণমন্দির দর্শনে অমৃতসর

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • খন রঞ্জন রায়

শৈশবকালের কথা। বয়স তখনও দ্বিঅঙ্কের ঘরে পৌঁছেনি। পাঞ্জাবীদের আক্রমণে জন্মস্থান ক্ষত-বিক্ষত। সুঠাম দেহ সৌষ্ঠবের পাঞ্জাবীদের অহঙ্কার আর হুঙ্কার শিশু দেহমনকে কৌতূহলোদ্দীপক করেছে বারংবার। এরপর থেকে জেনে এসেছি, পাঞ্জাবীরা পাঞ্জাব নামক স্থানের অধিবাসী। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় পাঞ্জাবের এক অংশ পড়ে পাকিস্তানে। অন্য অংশ ভারতে। দ্বিজাতিতত্ত্ব শুধু রাজনীতিবিদদের দ্বিখ-িত মনোভাবই নয়, প্রভাব পড়েছে ঐতিহাসিক স্থান স্থাপনা আর কল্পনাতেও। বিতস্তা, চন্দ্রভাগা, ইরাবতী, বিপাশা আর শতদ্রু নদের নির্মল পানি প্রবাহকেও খ--বিখ- করেছে। কথিত আছে পঞ্চনদের দেশ পাঞ্জাব। দ্বিখণ্ডিত পাঞ্জাবের ভারত অংশে তিন নদ আর পাকিস্তান অংশে দুই নদী। চন্দ্রভাগার কী নিষ্ঠুর নির্মম ভগ্নদশা! ভারত নিয়ন্ত্রিত পাঞ্জাবের ঐতিহাসিক শহর অমৃতসর আর পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত পাঞ্জাবের ঐতিহ্যের শহর লাহোর।

অমৃতসর অংশে পড়েছে জালিয়ানওয়ালবাগ। ব্রিটিশ নিপীড়নের জ্বলন্ত প্রতীক। যা জালিয়ানওয়ালবাগ হত্যাকা- হিসেবে ধিক্কৃত ইতিহাসে। অমৃতসরের প্রধান আকর্ষণ ‘গুরু নানক’ প্রতিষ্ঠিত শিখধর্মের প্রচার কেন্দ্রবিন্দু স্বর্ণের সুষমাম-িত স্বর্ণমন্দির বা গোল্ডেন টেম্পল। ‘গুরু নানক’ তাঁর অগ্নিবীর গ্রন্থে ‘ওমকার বেদ নির্মায়ে’ বলে বাণী লিপিবদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ ঈশ্বর বেদের নির্মাতা, কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল মানুষ যেন এই পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে সেজন্যই ঈশ্বর কর্তৃক বেদের আবির্ভাব।

স্বর্ণমন্দির মোট সাড়ে চার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। শিখধর্মাবলম্বী ছাড়াও সারা পৃথিবী থেকে পর্যটক আসেন এখানে। প্রতিদিন গড়ে ৮০ হাজার মানুষের পদধূলি পড়ে এই মন্দিরে। প্রতিদিন ৯০ হাজার মানুষের ভোজ-বিলাসের আয়োজন হয়। মন্দির খোলা থাকে অহরাত্রি। মন্দিরে প্রণামী সংগ্রহ হয় মাসে ৮০ কোটি রুপি। শিখধর্মাবলম্বীর প্রত্যেক যুবককে রণবিদ্যা, আত্মরক্ষা, কৌশলবিদ্যা ও যুদ্ধবিদ্যা রপ্ত করতে হয়। আদি যুদ্ধের এই কলাকৌশল শিক্ষা দেয়ার জন্য রয়েছে বিশাল ক্ষেত্র। ওখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রণকুশলীরা এই মন্দিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। এখনও তারা তীর, ধনুক, কাতরা, বল্লম, খাজা, খঞ্জনীর সাহায্যে স্বর্ণমন্দির পাহারারত। স্বর্ণমন্দিরে সরকারী বাহিনীর ন্যূনতম হস্তক্ষেপ সহ্য করা হয় না।

চট্টগ্রামে আমার বাসার বাউন্ডারি দেয়ালের পাশ ঘেঁষেই রয়েছে বিশাল এলাকাজুড়ে শিখমন্দির। বহুবার আমি পরিবার-পরিজন নিয়ে ওই মন্দিরে গিয়েছি। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে সুযোগ আসে অমৃতসর ভ্রমণের। খ্যাতনামা সাংবাদিক বন্ধু দেবদুলাল ভৌমিকের পরিবারবর্গের সংস্রবে আমার ছোট পরিবার স্ত্রী মিত্রা দেব আর সন্তান ত্রিয়মাকে নিয়ে চট্টগ্রাম কলকাতা ফ্লাইট ধরলাম। বর্তমানের অনিবার্য অনুষঙ্গ মোবাইল সিম, বন্ধু কাদেরের সহায়তায় ভারতীয় সিম আগেই সংগৃহীত হয়েছিল। বিমান টেকঅফের আগেই মোবাইল তার অস্তিত্ব জানাচ্ছিল ক্রিং ক্রিং শব্দে। আমাদর আগমনী অপেক্ষায় থাকা পিংকু ভৌমিক বারবার এ কাজ করছিল। যথারীতি আমরা সদলবলে উঠলাম কলকাতায় তাদের বাড়িতে। তাদের বৃদ্ধ মা-বাবার আন্তরিক আতিথেয়তায় প্রীত ও মুগ্ধ হয়ে পরদিন দিল্লীর উদ্দেশে কলকাতা ত্যাগ। ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’ নাম যেমন এক্সপ্রেস, ভ্রমণবিলাসিতা ও ভ্রমণকালীন সুযোগ-সুবিধা দেয়া-নেয়ার ক্ষেত্রে নামের যথার্থ সার্থকতার মিল খুঁজে পাওয়া গেল। বিরতিহীন ২০ ঘণ্টা আরাম ও আনন্দদায়ক ভ্রমণের পর আমরা পৌঁছলাম দিল্লীর নতুন স্টেশনে। দেবদুলালের ছোট ভাই এ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রিংকু ভৌমিকের সদ্য সংসার পাতা বাসায় বেশ জোরপূর্বক আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। পাঁচ মাস বয়সী তার ফুটফুটে কন্যা আরাত্রিকা আর ১১ বছর বয়সী আমাদের কন্যা ত্রিয়মার সঙ্গে ভাব জমে যেতে সময় লাগল কয়েক সেকেন্ড। মিশে গেলাম দিল্লীর পারিবারিক জীবনযাত্রার কোলাহলে।

ঢাকা-দিল্লী ফ্লাইট ধরে আমাদের দল ভারি করল ইঞ্জিনিয়ার সমীর মুজমদার। সবাই মিলে মানবেন্দ্র সিংয়ের ঝকঝকে নিশান মারুতি কারে উঠলাম। উদ্দেশ অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির। অল্পক্ষণেই আমরা ফ্লাইওভারসমৃদ্ধ দিল্লী অতিক্রম করে মহাসড়ক ধরলাম। গাড়ির গতিমিটারে চোখ পড়তেই চড়কগাছ। ১৩০-১৫০ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে। অবশ্য শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া অন্য কোন অস্বস্তি অনুভব করলাম না। রাস্তা নখের পিঠের মতো মসৃণ। বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করে সন্ধ্যায় আমরা পৌঁছলাম কাক্সিক্ষত স্বর্ণমন্দিরে। মহাসড়ক থেকে বিশেষ ফ্লাইওভারের মাধ্যমে মন্দিরের প্রবেশ মুখে গাড়ি নামানো সম্ভব। আমরা তা না করে অমৃতের শহরকে অবলোকন ও উপভোগ করতে করতে মন্দির সন্নিকটে পৌঁছলাম।

শিখধর্মাবলম্বীরা কি পুরুষ কি মহিলা সবার মাথার চুল ঢেকে রাখার বিধান। মন্দির প্রবেশ মুখে চুল ঢাকার রংবেরঙের রুমালের সংগ্রহ নিয়ে সারিবদ্ধ স্বেচ্ছাসেবী। ত্রিয়মার পছন্দের রং গোলাপী। সে তাই নিল। আমিও হালকা নীল বেছে নিলাম। অবশ্য যে মহিলার মাথাঢাকা তাদের বাড়তি রুমালের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন ৮০-৯০ হাজার দর্শনার্থীর প্রবেশ পথেও পানি প্রবাহের কার্পণ্যতা নেই। শীতকালে গরম আর গরমকালে ঠা-া জলের প্রবাহ। উদ্দেশ্য পা ধুয়েমুছে মন্দির অঙ্গনে প্রবেশ।

চারদিকে বিশাল লেকের স্রোতধারার মাঝখানে মূল মন্দিরটি সান্ধ্য অন্ধকারে বিদ্যুত বাতির আলোয় টলটলে জল আর স্বর্ণের চকচকে দেয়াল গম্বুজের বর্ণিল আলোকচ্ছটায় মোহময় আবেশের রূপ লাভ করেছিল। ধর্মীয় ভাবগাম্বীর্যের অনুভূতি ছাড়াও রূপলাবণ্যের নীরব-নিথর পরিবেশ বাড়তি শ্রদ্ধাবোধের জন্ম দিচ্ছিল। লেকের চারপাশ হাঁটার বিশাল লন। বল্লম নিয়ে পাহারারত চৌকস শিখ সিপাহী। কিছুদূর পর পর আপ্যায়ন ব্যবস্থাপনায় আন্তরিক আহ্বান। রুটি, পরোটা, ডাল, দোলমা, লাবড়া আর হালুয়ার বিপুল আয়োজন। এক জায়গায় হালুয়ার স্বাদ নিলাম। গাওয়া ঘিয়ে চপ চপ করা ভাজা হালুয়ার স্বাদ-গন্ধ আর বর্ণ মিলিয়ে অসাধারণ। লেকের মাঝখানে স্বর্ণ মোড়ানো গুরু নানকের সমাধিমন্দির। প্রবেশের জন্য বিশেষ রাস্তা। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় আমরা বিশেষ লাইন ধরলাম। বিজলিবাতির আলোয় লেকের স্বচ্ছ জলে শোল, কার্পাস, রুই, মৃগেল আর নাম না জানা নানা মাছের দৃষ্টিনন্দন কিলবিল দৃশ্য। বিশেষ পোশাক পরা কিছুলোক সমাধিগিলাপ ঘিরে হারমোনিয়াম, ঢোলক আর হাততালি দিয়ে কুর্নিশ ভঙ্গিতে অনবরত গেয়ে যাচ্ছিল ‘কারে ক্ষিরে পা, তারে ঘিরে না।’ হৃদয়-মন-আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে স্বর্ণমন্দির ত্যাগের পর কর্মব্যস্ত জীবনে প্রবেশের দীর্ঘদিন পরও অনুরণন হচ্ছিল ‘কারে ক্ষিরে পা।’

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: