মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিরাপদ পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের মডেল

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • মোহাম্মদ মাছুম

বিদ্যুত ঘাটতি নিরসনে এবং পরিবেশ দূষণরোধে পারমাণবিক বিদ্যুত রাখতে পারে কার্যকর ভূমিকা। নিউক্লিয়ার পাওয়ার বা পারমাণবিক বিদ্যুতের সুবিধাসমূহ সম্পর্কে দেশের জনগণকে অবগত করানোর প্রয়াসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু প্রকৌশল (নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের সাতজন ছাত্র-শিক্ষকের একটি তরুণ দল নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি মডেল তৈরি করেছেন। ছাত্ররা হলেন, স্নাতকোত্তর শ্রেণীর মোঃ মাজহারুল হাসান নূর ও সঞ্জয় কুমার সাহা; প্রথম বর্ষের সোলেমান সজীব ও কাজী আজমান রাফী। শিক্ষকগণ হলেন, প্রভাষক ফজলুল হক ও প্রভাষক মনজুর হোসেন খান। সম্পূর্ণ প্রকল্পের তত্ত্বাবধান করেন সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ শফিকুল ইসলাম।

‘বিদ্যুত সপ্তাহ ২০১৪’ উপলক্ষে বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুত বিভাগ আয়োজিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় সেরা প্রকল্পের পুরস্কার অর্জন করে এই মডেলটি। ৬০টি উদ্ভাবনী প্রকল্পের মধ্যে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে যথাক্রমে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

ডিসেম্বরের ১১ তারিখে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘বিদ্যুত মেলা’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এ্যাডভোকেট বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। ১১ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত আয়োজিত এই মেলায় প্রতিযোগিতার সেরা ১০টি প্রকল্প প্রদর্শন করা হয়।

‘ডিজাইন এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব এ্যান এ্যাডভান্সড নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট মডেল ফর কস্ট-ইফেক্টিভ পাওয়ার জেনারেশন’ শিরোনামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রকল্পের সদস্যগণ আধুনিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের গঠন ও নিরাপত্তামূলক বৈশিষ্ট্যাবলী ওই মডেলে তুলে ধরেছেন। ছাত্রদের রাতদিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, শিক্ষকগণের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও দুইমাসের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে এই মডেলটি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এটিই বাংলাদেশে তৈরি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের মৌলিক গঠনের প্রথম এবং প্রায় পূর্ণাঙ্গ একটি মডেল, যা শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য ল্যাবরেটরিতে প্রদর্শনযোগ্য।

প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক ড. মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র কিভাবে কাজ করে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো অথবা যুদ্ধের সময় কিভাবে এ কেন্দ্রকে রক্ষা করা যাবে তা প্রদর্শন করা হয়েছে তাদের মডেলে। নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী এই মডেলের মূল অংশ ‘নিউক্লিয়ার রিএ্যাক্টর কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং’-এ দুটি কন্টেইনমেন্টের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম কন্টেইনমেন্ট রিএ্যাক্টারের ভিতরের তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ করবে। আর প্রথমটির ১.৫ মিটার দূরবর্তী দ্বিতীয় কন্টেইনমেন্ট বাইরের বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা চাপিয়ে দেয়া আঘাত মোকাবেলায় কাজ করবে। নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট মডেলের বর্ণনা দিয়ে ড. শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, কেন্দ্রের প্রাথমিক ইউনিট, অর্থাৎ নিউক্লিয়ার রিএ্যাক্টরই হচ্ছে মূল, যেখানে তেজষ্ক্রিয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর বিভাজন বা ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। রিএ্যাক্টরে অবস্থিত উচ্চ চাপসম্পন্ন প্রাইমারি লুপের পানি সেই তাপ শোষণ করে এবং পাম্পের সাহায্যে স্টিম জেনারেটরে প্রবাহিত করা হয়। ফলে স্টিম জেনারেটরের ভিতরে ট টিউবের বাইরে অবস্থিত সেকেন্ডারি লুপের পানি অপেক্ষাকৃত কম চাপে থাকে বিধায় প্রাইমারি লুপের পানি থেকে তাপ শোষণ করে বাষ্পে পরিণত হয়। উচ্চ চাপ ও উচ্চ গতিসম্পন্ন বাষ্পকে পাইপের মাধ্যমে টারবাইনে পাঠানো হয়, ফলে টারবাইনে ঘূর্ণন সৃষ্টি হয়। টারবাইনের ঘূর্ণনরত শ্যাফটটি জেনারেটরের সাথে যুক্ত থাকে, ফলে জেনারেটরের ঘূর্ণন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের তড়িৎ চুম্বকীয় আবেশের সূত্রানুযায়ী তড়িৎশক্তি উৎপন্ন করে গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এ উপায়ে উৎপন্ন বিদ্যুতের খরচ অন্যান্য প্রচলিত উপায়ে উৎপন্ন বিদ্যুতের খরচের তুলনায় কম। প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদের এটি একটি সাশ্রয়ী বিদ্যুত উৎপাদন ব্যবস্থা হিসেবে সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠিত।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্পের সদস্য প্রভাষক ফজলুল হক যোগ করেন, টারবাইন থেকে বেরিয়ে আসা বাষ্প ঈড়হফবহংবৎ-এ প্রবেশ করে। বাইরের পানির রিজার্ভার থেকে ঠা-া পানি ঈড়হফবহংবৎ-এ সরবরাহ করে তাপ বিনিময়ের মাধ্যমে সেই বাষ্পকে পানিতে পরিণত করা হয় এবং এ পানিকে পাম্পের সাহায্যে পুনরায় স্টিম জেনারেটরে পাঠানো হয় এবং এভাবে চক্রটি চলতে থাকে। বাষ্প থেকে গৃহীত তাপে ঠা-া পানি গরম হয়ে ২০০ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন ঈড়ড়ষরহম ঞড়বিৎ-এ প্রবেশ করে। সেখানে গরম পানি ও ঠা-া বাতাসের সংস্পর্শে কিছু পরিমাণ পানি বাষ্প হয়ে কুলিং টাওয়ারের উপর দিয়ে চলে যায়। উড়ে যাওয়া বাষ্পের পরিমাণ হিসাব করে যে পরিমাণ পানির দরকার হয় তা পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পানি নিকটবর্তী নদী কিংবা সমুদ্র থেকে সরবরাহ করা হয়। এ বাষ্পে কোন প্রকার রেডিয়েশন থাকে না। রেডিয়েশন শুধুমাত্র পারমাণবিক চুল্লির ভিতরে থাকে। টারবাইন, জেনারেটর, কন্ডেনসার কিংবা কুলিং টাওয়ার থেকে কোন প্রকার রেডিয়েশন বাইরে আসার সুযোগ নেই। মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা থাকতে পারে যে, ইট ভাটায় অবস্থিত চিমনি দিয়ে যে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয় সেরকম পরমাণু বিদ্যুতকেন্দ্রে অবস্থিত ২০০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট কুলিং টাওয়ারের উপর দিয়েও বিষাক্ত গ্যাসের ন্যায় রেডিয়েশন নির্গত হয়, যা প্রকৃতপক্ষে সঠিক নয়।

পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের প্রতি আগ্রহী হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে প্রকল্পের অন্যতম সদস্য মোঃ মাজহারুল হাসান নূর বলেন, কয়লা, গ্যাস বা তেলের চেয়ে পারমাণবিক জ্বালানি অত্যন্ত সাশ্রয়ী। তাছাড়া গ্রীনহাউস গ্যাস ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাসের নিঃসরণ হয় না বলে তা পরিবেশের জন্যও যথেষ্ট উপযোগী। পরিকল্পিত রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে ড. শফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন, তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণে ও ব্যবস্থাপনায় মানসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এবং ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণ না হওয়ার কারণে পরিবেশ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির কোন আশঙ্কা নেই। তাছাড়া বিদ্যুত সমস্যা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদী ও সাশ্রয়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য পারমাণবিক বিদ্যুতের কোন কার্যকরী বিকল্প নেই।

সেরা পুরস্কারজয়ী এই মডেলের একজন কারিগর কাজী আজমান রাফী যোগ করেন, এই মডেলটি তৈরির মাধ্যমে আমরা পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র সংক্রান্ত সব ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং মেলায় আগত জনসাধারণের মনে বিভ্রান্তি ও সংশয় দূর করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের দেশে আধুনিক ও উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তি একদিন বিকশিত হবে, এই মডেল তারই পূর্বাভাস দেয়।

উল্লেখ্য, রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র পরিচালনার জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নকল্পে ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এই বিভাগে মাস্টার্সের তিনটি এবং স্নাতক শ্রেণীর একটি ব্যাচ চালু আছে।

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: