আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঘুরে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি

প্রকাশিত : ১ জানুয়ারী ২০১৫
  • কাওসার রহমান

হরতাল-অবরোধের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের। চলতি বছরের গোড়ার দিকে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রথম আঘাত এসেছিল দেশের উদীয়মান অর্থনীতির ওপর। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় টানা দুই মাসের হরতাল-অবরোধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল দেশের অর্থনীতি। ওই নির্বাচনে তৎকালীয় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ না নিলেও, নির্বাচনের পর সরকার দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। ফলে দেশে ফিরে আসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আর এতে বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।

বছর শেষে অর্থনীতির সেই ক্ষত অনেকটা শুকিয়ে এলেও, বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনৈতিক সূচকগুলো আবার উর্ধমুখী হয়। নির্বাচনপরবর্তী সময়ে প্রায় গোটা বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ মোটামুটি শান্ত থাকলেও, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থার সঙ্কট দূর করতে পারেনি সরকার। ফলে সারাবছর ধরেই বিনিয়োগে ‘মন্দাভাব’ বিরাজ করে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বিভিন্ন সময়ে দেশে বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বিনিয়োগ না বাড়াটাকে দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

তবে বছরের প্রথমার্ধে মূল্যস্ফীতি কিছুটা উর্ধমুখী হলেও, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ফলে প্রায় সারাবছর ধরেই মানুষের মধ্যে একটি স্বস্তিভাব বিরাজ করে। এক্ষেত্রে সরকারের কৃতিত্ব হচ্ছে শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি কমে এলেও, সরকার পুরো বছরই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

মূলত পণ্য সরবরাহ চেইন সঠিকভাবে কাজ করায় চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাওয়া যায়। মাঠপর্যায়ে পণ্যের কোন সঙ্কট সৃষ্টি হয়নি। এটিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

বছরের প্রথমদিকে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি সাত থেকে সাড়ে সাত শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে তা সাত শতাংশের নিচে নেমে আসে। এতে সারাবছর ধরে মূল্যস্ফীতিতে একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। তবে এ স্থিতিশীলতা ধারা থেকে বেরিয়ে খুব বেশি নিম্নমুখী হতে পারেনি। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে নবেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ছয় শতাংশের নিচে নেমে এলেও, গড় মূল্যস্ফীতি এখনও ৭ শতাংশের বেশি। তা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় জনজীবনে স্বস্তি বিরাজ করে।

এ ছাড়া অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকগুলোর মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। রফতানি আয় ও রেমিটেন্স প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় সামান্য বাড়লেও, এগুলোর প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক নয়।

তবে রিজার্ভ এখনও যথেষ্ট ভাল অবস্থায় রয়েছে। বছরের শেষদিকে এসে এটি বরং অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২২ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ৪৩ বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ রিজার্ভ। মূলত রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি ও রফতানি আয় বৃদ্ধির কারণেই রিজার্ভের নতুন এ রেকর্ড হয়েছে। গত ৫ বছরে দেশে রিজার্ভ বেড়েছে ৩ গুণ। তারই ধারাবাহিকতায় বছর শেষে তা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে রিজার্ভ।

নবেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে অর্থনৈতিক সূচকগুলোর টালমাটাল অবস্থানের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। গত অর্থবছরের অধিকাংশ সময় প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও অক্টোবর (২০১৩) পর্যন্ত রফতানি প্রবৃদ্ধি ও রেমিটেন্স প্রবাহ ছিল সন্তোষজনক। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নবেম্বর) রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। যদিও আগের অর্থবছরের তুলনায় রফতানি বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নবেম্বর সময়ে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ২৭৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এর বিপরীতে রফতানি আয় হয়েছে ১ হাজার ২০৭ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৯৬ কোটি ডলার।

অন্যদিকে রেমিটেন্স প্রবাহও গত বছরের তুলনায় তেমন একটা বাড়েনি। চলতি পঞ্জিকা বছরের ১১ মাসে (নবেম্বর পর্যন্ত) দেশে রেমিটেন্স এসেছে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি ডলার। গত বছর একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৬২ কোটি ডলার। এ ছাড়া মাসওয়ারি হিসেবেও বছরের দ্বিতীয়ার্ধে রেমিটেন্স প্রবাহ কমেছে।

গত তিন অর্থবছর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলেও, এবার অনেকটাই আশাবাদী ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই হোঁচট খেয়েছে রাজস্ব আহরণ। এটা সরকারের চিন্তারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আহরণে ঘাটতির কারণে বাড়ছে সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ। যদিও বাজারে ঋণের চাহিদা কম থাকায় দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণ হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে অলস টাকা।

বিধি অনুযায়ী কোন ব্যাংক ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে, তা থেকে ৮১ টাকা ঋণ বিতরণ করে বাকি ১৯ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ জমা হিসেবে রাখতে হয়। কিন্তু আমানত ও ঋণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুরো ব্যাংকিং খাত বাজার থেকে যত আমানত সংগ্রহ করেছে তার ৭১ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে পেরেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ীÑ ১৫ অক্টোবর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত (আন্তঃব্যাংক বাদে) ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৪ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৭০ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এ সময়ে গত বছরের তুলনায় আমানতে ১৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও, ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় পরিবেশের ঘাটতি থাকায় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিতে আগ্রহ পাচ্ছে না। বিনিয়োগের জন্য অপরিহার্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায়, দেশে প্রকৃত অর্থে শিল্পায়ন অর্থাৎ নতুন শিল্প স্থাপন হচ্ছে না।

এ বছর বিদ্যুত ও গ্যাসের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। এক বছর আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে যে সময় লাগত, এখন তার চেয়ে বেশি সময় লাগে। এ কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে চললেও, সম্ভাবনার সবটুকু ব্যবহার করতে এখনও পারছে না বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশ এগোচ্ছে। তবে সক্ষমতার চেয়ে কমগতিতে।

তাছাড়া সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর আশানুরূপ বাস্তবায়ন না হওয়াও ঋণের চাহিদার ক্ষেত্রে নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এডিপি বাস্তবায়ন হলে বাজারে অনেক ধরনের চাহিদা তৈরি হয়। তাতে বিনিয়োগের জন্য ঋণের চাহিদাও বাড়ে। সংঘাতময় বছর পেরিয়ে নির্বাচনের পর রাজনীতিতে ‘স্বস্তি’ এলেও সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) বাস্তবায়নে তার প্রভাব দেখা যায়নি। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নবেম্বর) ২১ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং নির্বাচনের আগে ব্যাপক সংঘাতময় অবস্থার মধ্যেও গত অর্থবছরের ওই পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২০ শতাংশ।

এডিপি বাস্তবায়ন কম হলেও, সব অংশের চুক্তি সম্পাদন করে দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন শুরু এ বছরের বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক। শুধু তাই নয়, এ বছরের শেষদিকে এসে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়। তবে ব্যাংকগুলোতে ঋণযোগ্য অলস টাকা পড়ে থাকলেও, বছরের একেবারে শেষদিকে এসে বিনিয়োগ বেড়েছে, যার প্রভাবে ঋণ চাহিদাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া পদ্মা সেতুর মূল কাজ শুরু হলে তার প্রভাবেও নতুন বছরে বেসরকারী খাতে ঋণ চাহিদা বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে।

গত বছর (২০১৩) জুন থেকে হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকারী প্রকল্পের বাস্তবায়ন নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়েছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছর এ ধরনের কোন সমস্যা না থাকলেও, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) বাস্তবায়ন গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার গত চার বছরের একই সময়ের তুলনায় সর্বনিম্ন। ছয়টির অধিক মন্ত্রণালয় এক টাকাও ব্যয় করতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদেও আলোচনা হয়। সব মন্ত্রণালয়কে এডিপি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ১১ শতাংশ। এ অবস্থায় সম্প্রতি এডিপি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়ার নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পণ্য ও সেবা সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বিভাগগুলোর সচিবদের অর্থবছরের শুরুতেই ক্রয় পরিকল্পনা নিতে হবে। সে অনুযায়ী ত্বরান্বিত করতে হবে প্রকল্প বাস্তবায়ন।

তবে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়ানোয় চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক গবর্নর ড. আতিউর রহমান। বর্তমানে অর্থনীতির যে গতি রয়েছে, তাতে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।

তবে বিশ্বব্যাংকের মতে, এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ হবে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সরকার ধরেছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক এর চেয়ে কম ধরলেও, তা সন্তোষজনক মনে করছে তারা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। এবার তা ৬ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হবে বলে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির জন্য বর্তমানের ২৮ শতাংশ বিনিয়োগ (জিডিপির) ৩৪ থেকে ৩৫ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আভাস আরেকটু বেশি। এডিবি এ বছর ৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা দেখছে।

দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানব উন্নয়নে বাংলাদেশ বিদায়ী বছরে বেশ ভাল করেছে। বিদায়ী ২০১৪ সালে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসবে। অথচ ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। ২০১০ সালে ছিল ৩১ শতাংশ। জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অনুযায়ী, ২০১৫ সালে তা ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

তবে গত এক দশকের (২০০০ থেকে ২০১০ সাল) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০১৪ সালে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসবে। বিদায়ী বছরে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশের নিচে নেমে আসাকেই বড় অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

এ ছাড়া অন্যান্যের মধ্যে বিদেশে অর্থ পাচার, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও পুঁজিবাজারের ওঠা-নামা বছরজুড়ে ছিল আলোচনায়। বছরের প্রথম ভাগে দেশ থেকে অর্থ পাচার একটি আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়। সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যাংকে বাংলাদেশের নাগরিকদের ২০১৩ সালে তিন হাজার ২৩৬ কোটি টাকা গচ্ছিত রাখার তথ্য প্রকাশ করলে দেশে হইচই পড়ে যায়। এর বাইরে আরও অনেক ব্যাংকে বাংলাদেশের টাকা পাচারকারীদের টাকা রয়েছে বলে তথ্য বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী। কানাডায় রয়েছে বাংলাদেশ অধ্যুষিত বেগমপাড়া অঞ্চল। এ ছাড়া ব্রিটেন, হংকং ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকেও বাংলাদেশীদের টাকা রয়েছে বলে তথ্য বেরিয়ে আসে।

সরকার ওই টাকা দেশে ফিরেয়ে আনার ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশী নাগরিকদের গচ্ছিত টাকার তথ্য চেয়ে। পাচারকৃত টাকা উদ্ধারের অগ্রগতি ওই পর্যন্তই। সুইস ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংককে তথ্য প্রদান দূরের কথা, চিঠির জবাব পর্যন্ত দেয়নি। ফলে পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ ওখানেই থেমে যায়।

এদিকে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ২০১৪ সালে এসে ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বেসিক ব্যাংক। এ বছর রাষ্ট্রমালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের তিনটি শাখা চার হাজার ২৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে। এই ঋণের বড় অংশই দেয়া হয়েছে কোন নিয়মকানুন না মেনে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছে বেসিক ব্যাংক।

শাখাগুলোর মধ্যে গুলশান শাখার দেয়া ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৮০০ কোটি ২৩ লাখ টাকা, শান্তিনগর শাখা এক হাজার ৫২৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং দিলকুশা শাখা দিয়েছে ৯২৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। এই তিন শাখায় অতি দ্রুততার সঙ্গে ঋণ ছাড় করা হয়েছে। ঋণের বিপরীতে কোন উল্লেখযোগ্য জামানতও রাখেনি কর্তৃপক্ষ। বরং তালিকার বাইরের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এ সব জামানতের অভিহিত মূল্য (ফেসভ্যালু) বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যাতে বেশি করে ঋণ পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত দায়িত্বে অবহেলা ও ঋণ অনিয়মের দায়ে বেসিক ব্যাংকের এমডি ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ঋণ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু।

এর আগের বছর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হলমার্ক জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে তিন হাজার ৬৭০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়, যা দেশের একক কোন ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে।

ঋণ কেলেঙ্কারির পাশাপাশি সুড়ঙ্গ কেটে ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা লুটের ঘটনাও ঘটে এ বছর। বছরের শুরুতে গোপন সুড়ঙ্গপথে কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় কিছু টাকা উদ্ধার হয়। এরপর ৯ মার্চ একই ব্যাংকের বগুড়ার আদমদীঘি শাখায় একই কায়দায় ৩২ লাখ টাকা লুট হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর জয়পুরহাটের ব্র্যাক ব্যাংক থেকে দেয়াল কেটে ভল্ট থেকে ২ কোটি টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। এর আগেও ব্র্যাক ব্যাংকের রাজধানীর ধানমন্ডি শাখা থেকে লকার ভেঙ্গে কয়েক হাজার ভরি সোনা লুট হয়। ৪ ডিসেম্বর রাজশাহী নগরীতে সোনালী ব্যাংকের কোর্ট বাজার শাখায় সুড়ঙ্গ কেটে ডাকাতির চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। সর্বশেষ ১৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের জয়দেবপুরে জনতা ব্যাংকের কর্পোরেট শাখা থেকে ৬০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই দিন জনতা ব্যাংকের শ্যামপুর শাখার সিঁড়িতে এক ব্যবসায়ীর ব্যাগভর্তি ১৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা। নিরাপত্তা ভেদ করে টাকা লুটের ঘটনার পাশাপাশি গেল বছরে ব্যাংকের শাখা থেকে গ্রাহকের চেক ও গুরুত্বপূর্ণ নথিও গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ২৭ অক্টোবর সোনালী ব্যাংকের লালমাটিয়া শাখার ক্লিয়ারিং সেকশনের ড্রয়ার থেকে অর্ধশতাধিক চেক চুরি হয়। পরে অবশ্য থানায় জিডি এবং তদন্ত কমিটি গঠন হলেও সেগুলো আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এদিকে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে কমপক্ষে ১৪টি ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের চেক, ডিডি, এফডিআর ডকুমেন্ট, এসডিআর, এমটিডিআর, পে-অর্ডার, আমদানি-রফতানির এলসি ডকুমেন্টের মতো গ্রাহকদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েক শ’ নথি চুরি হয়ে যায়।

বিদায়ী বছরে শেয়ারবাজারের উল্লেখযোগ্য অর্জন হচ্ছেÑ স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা পৃথকীকরণ (ডিমিউচুয়ালাইজেশন)। পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ বছর সফলভাবে এ ডিমিউচুয়ালাইজেশনের কাজ সম্পন্ন করে। তবে গত এক বছরে বাজারের উত্থান-পতন বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও আগের বছরের তুলনায় বাজার মূলধন, সূচক ও কোম্পানির সংখ্যা অর্থাৎ বাজারের ব্যাপকতা বেড়েছে। তবে বিভিন্ন ইস্যুতে নেতিবাচক প্রভাব বিরাজ করায় বাজারের উত্থান-পতন ঘটেছে। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পর পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের উন্নয়নে নেয়া কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়েছে, কিছু এখনও প্রক্রিয়াধীন। স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসি যে সব উদ্যোগ নিয়েছে তা ভবিষ্যতে সুফল বয়ে আনবে। এ সুফল ভোগ করবেন বিনিয়োগকারীরাÑ এমনই প্রত্যাশা থাকছে নতুন বছরে।

বাংলাদেশে আগামী দিনের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এ কারণে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে ধস ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে পড়তে পারে অর্থনীতি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির এ অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে প্রভাব ফেললে অর্থনীতি ফের নেতিবাচক ধারায় চলে যেতে পারে।

প্রকাশিত : ১ জানুয়ারী ২০১৫

০১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: