মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দেশা : দ্য লিডার

প্রকাশিত : ১ জানুয়ারী ২০১৫
  • সায়েম খান

সদ্য বিদায় বছরের শেষ সপ্তাহে ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪-তে মুক্তি পেল জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত এবং সৈকত নাসির পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র ‘দেশা দ্য লিডার’। সিনেমার নামেই বুঝা যায় এর কন্টেন্ট রাজনীতি। রাজনীতি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ একটু ঝুঁকির কাজ। এর পরিসরটা বেশি। সেই ঝুঁঁকির কাজটিই সৈকত নাসির তাঁর দেশা দ্য লিডার ছবিতে করার চেষ্টা করেছেন।

চ্যানেল-৯৯ নামের একটি টিভি চ্যানেলের রিয়েলিটি শোতে জাগরণ পার্টির নেতা হাসান হায়দার নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর শর্ত হিসেবে লটারিতে নির্বাচিত আয়নাপুর গ্রামের বাসিন্দা সেলিমের বাড়িতে দুই দিন অবস্থান করবেন। সেখানে হাসান হায়দারের ওপর হামলা, সেলিম নিজের জীবন বাজি রেখে হাসান হায়দারকে রক্ষা করেন। হামলায় সেলিমের বাবা-মা মারা যান। এই হামলার জন্য জনদরদি পার্টির নেতা দরবার খানের দিকে আঙুল উঠে। পরে জানা যায় এ ঘটনার সঙ্গে হাসান হায়দার নিজেই যুক্ত। আর এ ঘটনার রেষেই গল্পের শেষ।

রাজনীতিতে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখা যায় জনপ্রিয়তা প্রধান ও অন্যতম মাধ্যম। সেটা দিয়ে চলচ্চিত্রটির শুরু। আবার যখন রাজনীতিতে শেষ কথা বলত ওই জনগণ। সেই জনগণের হাতে বিচারের দায়িত্ব দিয়ে সিনেমার শেষ। প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় রিয়েলিটি শোতে এসএমএস ভোটের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে নেতা নির্বাচন। সেই নেতা খারাপ প্রমাণিত হওয়ায় ছবির শেষ দৃশ্যে তার বিচারের দায়ভার জনগণের হাতে তুলে দেয়া এবং নায়ককে নায়কোচিত ভূমিকায় না রেখে শেষ করা ছিল বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে নতুন একটা মাত্রা। বাংলা সিনেমায় সাধারণত মানুষ দেখে আসছে তাদের ব্যক্তি বা সামাজিক জীবনের সমস্যার সমাধান করতে নায়ক এসে দেবদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এজন্য মানুষ সিনেমা দেখে তাদের প্রাত্যহিক জীবনে সমষ্টিগতভাবে কোন প্রতিবাদ করতে শেখে না। তারা তাদের বাস্তব জীবনেও এই রকম একজন দেবদূতের আশা করে। তাই আমার কাছে মনে হয় সিনেমাটি নতুন করে ভাবতে শিখাবে কিভাবে ভাল কিছুর পেছনে ঐক্যবদ্ধ হতে হয় এবং তাঁর জন্য দায়িত্ব কিভাবে নিজের কাঁধে নিতে হয়।

এটা একটি রাজনৈতিক থ্রিলার ফিল্ম হলেও তথাকথিত বাংলা ছবির মতো রোমান্টিক মেলোড্রামার কচকচানি উতরানোটা পরিচালকের জন্য ছিল চ্যালেঞ্জিং। যাতে আমার কাছে মনে হয় পরিচালক শতভাগ সফল। নির্দিষ্ট সময় শেষে নায়িকার মৃত্যু ছবিটির আবহে তাই কোন প্রভাব ফেলেনি। নায়িকার মৃত্যু যে দৃশ্যে ধারণ করা হয়েছে সেটা খুব জটিল হলেও এক্ষেত্রে গ্রাফিক্স এবং এডিটিংয়ের কাজ ছিল চমৎকার। ক্যামেরার কাজের ক্ষেত্রে পরিচালককে কিছুটা সাহসী দেখা গেছে। দৃশ্যায়ন মোটামুটি ভালই ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওভার সোল্ডার শটে প্যান করে এক্সিস ক্রস করে কামেরা গতিশীল রাখাটা খুব ভাল আইডিয়া ছিল বলে মনে হয়েছে। রাজনৈতিক ছবির সেটে জনসমাগম করাটা চ্যালেঞ্জিং থাকলেও এক্ষেত্রে পরিচালক মোটামুটিভাবে সফল। সার্বিক সাউন্ডের কাজ মন্দ ছিল না বলেই ধরা যায়। বরং কিছু ক্ষেত্রে সাউন্ড ছিল দুর্দান্ত। যেমন : বক্তৃতা মঞ্চে মাইকের সাউন্ড ইফেক্ট। ছবিটি টেকনিক্যাল দিক থেকে ভাল হলেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেকে বলার চেষ্টা করছেন ছবিটি তামিল সিনেমা ‘কো’ এবং ভারতীয় বাংলা সিনেমা ‘কানামাছি’র আদলে করা। তবে ছবির সমাপ্তি ভিন্ন বলে নতুন মাত্রা পেলেও সাস্পেন্সটা ওই ছবিগুলোর মতো ধরে রাখতে পারে নাই।

‘ডযড় রং ড়ঁৎ হবীঃ খবধফবৎ’- নামের রিয়েলিটি শোতে ৪ জন নির্ধারিত নেতার মধ্যে থেকে একজন নেতা জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় যে, ওই অনুষ্ঠানের প্রোডিউসার কলকাঠি নেড়ে এই নেতা নির্বাচিত করেছেন এবং সঙ্গে চ্যানেলের টিআরপিও বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ৪ জন কিভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রথম থেকে নেতা নির্বাচনের কোন যোগসূত্র ছবিতে উহ্য ছিল। আবার ওই ৪ জন বিভিন্ন পার্টির নেতা। তার মানে আরেকটা ইঙ্গিত যা পার্টি এজেন্ডার বাইরে নিজস্বভঙ্গিতে রাজনীতি করে নেতা হওয়ার সুযোগ নেই। এটা গ্রামসির সেই ঞৎধফরঃরড়হধষ খবধফবৎংযরঢ়। আর এসএমএস দিয়ে নেতা নির্বাচন আর মডেল নির্বাচন এক কথা নয়। নেতা নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া তো ভোট রয়েছেই। জনগণ যেখানে ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সুযোগ পাবে সেখানে এই এসএমএস ব্যবস্থা অকার্যকর। কেননা এসএমএস বেশি পেলে সে জনপ্রিয় এটা সত্য নাও হতে পারে কারণ এটা ম্যানুপুলেট করা যায়। এইভাবে নির্বাচিত কোন নেতা নির্বাচিত মডেলের মতো পণ্যে পরিণত হবে, নেতা পণ্যে পরিণত হলে দেশপ্রেমটাও বিক্রি হয়ে যাবে। এই কারণটাকে আর যৌক্তিক করা যেত কিভাবে সেটা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন ছিল। সিনেমার একপর্যায়ে গিয়ে তাই সেলিমের মুখে শোনা যায়Ñ ‘আমি তো হাসান হায়দারের দ্বারা পণ্যে পরিণত হয়েছি। হাসান হায়দার যখন সেলিমের বাড়িতে দুই দিন অবস্থানের জন্য আয়নাপুরে গেলেন, দেখলেন সেখানে সবকিছুর দুরবস্থা এবং সর্বশেষ সেলিমের মায়ের অবস্থা দেখে যখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ফোন দিলে, সচিব দ্রুততার সঙ্গে কাজ করে। আসলে আমাদের দেশে সরকারদলীয় লোক ব্যতীত অন্য কেউ ফোন দিলে দ্রুত কাজ করার ক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ আছে।

আয়নাপুর গ্রামে হাসান হায়দারের অবস্থানকালে বোমা হামলার পর সৃষ্টির (মাহিয়া মাহি) রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নৈতিকতা লঙ্ঘিত হয়েছে। রিপোর্টারের কাজ হল ঘটনার বিবরণ দেয়া। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা গেছে সেলিম ও হাসান হায়দারের প্রতি আবেগী হয়ে সৃষ্টি রিপোর্ট করেছেন।

পুরো ছবিতে দেশের রাজনৈতিক মাঠে এত ধরনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে অথচ সরকারে কারা বা এটা নিয়ে তাদের মন্তব্য কি বা সরকার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এসব ঘটনা কিভাবে দেখছে?Ñ তার ছিটেফোঁটাটাও নেই। একবাক্যে পুরো ছবিতে দেশের সরকার বিষয়টা অনুপস্থিত। শুধু কিছু থানা পুলিশ বা ডিবি অনেক ক্ষেত্রে তা হাসান হায়দারের আজ্ঞাবহ।

জনদরদি পার্টির নেতা দরবার খানের প্রতি, নেতা নির্বাচিত হতে না পারায় আয়নাপুরে বোমা এবং সন্ত্রাসী হামলার পেছনে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু পরে যখন হাসান হায়দারের বিরুদ্ধেই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হতে থাকে তখন তো তাঁর রাজনৈতিক পরিম-লে সরব থাকার কথা কিন্তু এখানে তাঁর অনুপস্থিতি গল্পটিকে দুর্বল করে তুলেছে। ছবির একপর্যায়ে এসে দেখা যায় আয়নাপুরে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত চিহ্নিত সকলে খুন হয়। বোমা হামলা হাসান হায়দার প্রোগ্রাম প্রডিউসারের সঙ্গে পরিকল্পনা করে তাকে দিয়েই করান। একসময় যখন প্রোডিউসার বেঁকে বসে হাসান হায়দার তাকেও খুন করান। এখানে মিডিয়ার মালিকের রাজনৈতিক আদর্শ বা তার ভূমিকা অনুপস্থিত। মালিকের অনুমতি ছাড়া একজন প্রোগ্রাম প্রোডিউসার এমন কাজ করতে পারার ক্ষমতা আছে বলে আমার মনে হয় না।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে তারেক আনামের অভিনয় বরাবরের মতো করেই দুর্দান্ত। শিপনের ক্ষেত্রে কিছুটা জড়তা দেখা গেছে। তবে কাটিয়ে উঠলে সে ভাল করবে বলে আশাবাদী। মেকিং এর দিক থেকে সৈকত নাসির যাত্রাটা ভালই করেছেন। তবে গল্পের প্লটটা ভাল ছিল। গল্পের দিকে আরেকটু যতœশীল হলে আরও ভাল কিছু দিতে পারতেন। আমি ছবি দেখার সময় গুণাগুণ বিচারে যে পরিমাণ দর্শক হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। তবে ছবিটি দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

লেখক : চলচ্চিত্র আন্দোলন কর্মী

প্রকাশিত : ১ জানুয়ারী ২০১৫

০১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: