কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ব্যর্থতার ধাক্কা সামাল দিয়ে সাফল্য

প্রকাশিত : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪
ব্যর্থতার ধাক্কা সামাল দিয়ে সাফল্য
  • আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ
  • মিথুন আশরাফ

‘নব আনন্দে জাগো/নব রবি কিরণে...।’- আজ আরেকটি বছরের শেষ দিন। ২০১৪ সালের শেষ দিনটিতে যেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এ লাইনগুলোই বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেটারদের সামনে দাঁড় হচ্ছে। নতুন আরেকটি বছরের, ২০১৫ সালের শুরুতে যে নতুনভাবে শুরু করারই প্রত্যয় থাকছে।

বছরের শুরুর ধাক্কায় এমনভাবেই বাংলাদেশ দল বেসামাল হয়ে পড়েছিল, তা বছরের মাঝেও সামাল দেয়া যায়নি। শেষপর্যন্ত বছরের শেষে এসে এমনভাবে নিজেদের সামলে নিয়েছেন মাশরাফি, মুশফিক, সাকিব, তামিমরা যে এখন নতুনভাবে শুরু করার পথে নতুন উদ্যমই খুঁজে পেয়ে গেছেন। যেখানে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ, এশিয়া কাপ, টি২০ বিশ্বকাপ, ভারতের বিপক্ষে সিরিজ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে দল হারতে হারতে বিধ্বস্ত, এমন অবস্থায় শেষে গিয়ে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সিরিজে যেন নতুন প্রাণ মিলেছে। তাই আনন্দে বলতেও যেন চাইছেন ক্রিকেটাররা, ‘যাবার দিন এই কথাটি বলে যেন যাই/যা দেখেছি/যা পেয়েছি/তুলনা তার নাই।’ বছরের শেষ সিরিজে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে যেসব স্বপ্নের মতোই হয়েছে। এখন সামনে বিশ্বকাপ। সেই ক্রিকেট মহাযজ্ঞে খেলতে নামার আগে আত্মবিশ্বাসই পুঁজি করে নিল বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা। জ্বালানী শক্তিও মিলে গেল। বাংলাদেশ সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান তাই বলেছেনও, ‘শেষ ভাল যার সব ভাল তার।’

অথচ বাংলাদেশ দল যখন বছরজুড়ে হারছে আর হারছে ক্রিকেটপ্রেমীরাও হতাশার ভুগেছে। স্বাভাবিকভাবে সেটি হওয়ারও কথা। বছরের শুরু থেকে হার হয়েছে, জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সিরিজের আগ পর্যন্ত টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর বিপক্ষে নিয়তিতে শুধু হারই লেখা হয়েছে। হতাশ হওয়ারই কথা।

এরপরও ক্রিকেটপ্রেমীরা হাল ছেড়ে দেয়নি। যখন দল আবার জেগে উঠেছে, তারাও সমর্থন জাগিয়ে গেছে। আর ক্রিকেটাররা তো বছরজুড়ে চেষ্টা করতে করতে অবশেষে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে এসে জ্বলে উঠেছে। জিম্বাবুইয়ানদের আগুনে পুড়িয়েছে। যে আগুনে বছজুড়ে নিজেরাই পুড়েছে, জিম্বাবুইয়েকে পুড়ে উল্টো পুড়িয়েছে।

বছরের শুরুটাই হয়েছে হার দিয়ে। বড় হারই হয়েছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্টে ইনিংস ও ২৪৮ রানে হার হয়েছে। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টেই অবশ্য ড্র করতে পেরেছে। কিন্তু এরপর দুটি টি২০-তে জয়ের এত কাছে গিয়েও যে বাংলাদেশ হেরেছে, সেখানেই ক্রিকেটারদের মনোবল ভেঙ্গে গেছে। সেই যে মানসিক চাপ, সেই চাপ আর সামলে নিতে পারেনি। একেক করে শুধু হারই হয়েছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট, টি২০ সিরিজ হারের পর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে বাংলাদেশ। এশিয়া কাপে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে হারের পর আফগানিস্তানের কাছেও হার হয়েছে! এ বিষয়টিই তখন বাংলাদেশ ক্রিকেটকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। টি২০ বিশ্বকাপে গিয়ে প্রথম পর্বে বলতে গেলে বাছাইপর্বে আফগানিস্তান, নেপালকে ঠিকই হারানো গেছে। কিন্তু হংকংয়ের কাছে হারের লজ্জা পেতে হয়েছে। মূল পর্বে গিয়ে তো একটি ম্যাচও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে। টি২০ বিশ্বকাপ শেষে ভারতের বিপক্ষে দেশের মাটিতে সিরিজ খেলে তিন ম্যাচের সিরিজের দুটি ম্যাচেই হেরেছে। একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে। তাও আবার দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ভারতকে ১০৫ রানে অলআউট করে দিয়ে জয়ের আশা জাগিয়ে ৫৮ রানেই অলআউট হয়ে গেছে বাংলাদেশ! ভারতের বিপক্ষে সিরিজ শেষে দল যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে খেলতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ওয়ানডে, এক টি২০, দুই টেস্ট খেলে। টি২০ ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়। বাকি সবকটি ম্যাচ হারে বাংলাদেশ। শূন্য হাতে ফিরে দল। বছরটি এমনভাবেই চলছিল। বিভীষিকাময় হয়ে গিয়েছিল। যেখানেই তাকানো যায় যেন শুধুই অন্ধকার দেখা যায়। এমন সময়ই আলোর রেখা মিলল।

বাংলাদেশে খেলতে এলো জিম্বাবুইয়ে, বাংলাদেশও পূর্ণোদ্যমে গর্জে উঠল। একের পর এক ম্যাচ হারাতে থাকল। তিন টেস্টের তিনটিতেই জিতল বাংলাদেশ। জিম্বাবুইয়েকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে ইতিহাস গড়ল। মনে করা হয়েছিল টেস্টে এমন জয়ের পরও ওয়ানডে সিরিজটা কঠিন হবে। কিন্তু দেখা গেল পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও হোয়াইটওয়াশ হলো জিম্বাবুইয়ে! টেস্টের পর ওয়ানডেতেও জিম্বাবুইয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে দিল বাংলাদেশ। কী সুন্দর। সবকিছু যেন স্বপ্নের মতোই হলো। যে দল জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সিরিজের আগে চার টেস্টের তিনটিতে, ১২ ওয়ানডের সবকটিতে, ৯ টি২০’র ৭টিতে হেরেছে। এরমধ্যে একটি টেস্ট খেলুড়ে দলের বিপক্ষেও জয় নেই, সেই দল শেষে এসেই বছরের সব গ্লানি মুছে দিল। বছরজুড়ে শুধু দলের হারই নয়, আন্তর্জাতিক ম্যাচ চলার সময় অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি দেখানোর জন্য সাকিবকে তিন ম্যাচ, শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ৬ মাস ও বিদেশের লীগ খেলা থেকে দেড় বছর নিষিদ্ধ করা হয়। সেই শাস্তি আবার তুলেও ফেলা হয়। জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ফিরেই দ্বিতীয় টেস্টে শতক ও ১০ উইকেট নেয়ার ইতিহাসও গড়ে ফেলেন সাকিব। বছরের শেষদিকে এসে তাইজুল ইসলামের মতো স্পিনার মিলে। জুবায়ের হোসেনের মতো লেগ স্পিনারও পাওয়া যায়। সোহাগ গাজীর মতো স্পিনার যেন হারিয়েই যেতে বসেছে। বোলিং এ্যাকশনে ত্রুটি থাকায় নিষিদ্ধ হয়ে ক্যারিয়ারও যেন তলানিতে নেমেছে। এরমধ্যে আবার বাজে নেতৃত্বের জন্য জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সিরিজের আগেই ওয়ানডে থেকে মুশফিকের নেতৃত্বও কেড়ে নেয়া হয়। মাশরাফি বিন মর্তুজাকে ওয়ানডেতে নতুন অধিনায়ক করা হয়।

এই নেতৃত্ব দলও যেন বদলে যায়। জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে টেস্ট কিংবা ওয়ানডেতে ঐক্যবদ্ধ নৈপুণ্যও মিলে। ক্রিকেটারদের মনের ভেতর একটি বিষয়ও ভালভাবেই গেঁথে যায়, ‘মনেরে আজ কহ যে/ভালো মন্দ যাহাই আসুক/সত্যেরে লও সহজে।’ বছরের শুরু থেকে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সিরিজের আগ পর্যন্ত যে ক্রিকেটারদের শুধুই সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে। তবুও দমে যায়নি। সত্যকে যে সহজেই মেনে নিতে পেরেছে। যে দল হারতে থেকে বিধ্বস্ত হতে থাকে, সেই দলটিই হঠাৎ করে জেগে উঠে। সত্যকে সহজে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে শুরুর ধাক্কা শেষে এসে সামলেও নেয়।

প্রকাশিত : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪

৩১/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: