মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মুক্ত পেশায় প্রজন্মের সম্ভাবনা

প্রকাশিত : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪
  • অঞ্জন আচার্য

গত এক দশকে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে বাংলাদেশের আইটি ক্ষেত্রে। এর কা-ারী এদেশের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম। সারাবিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং জীবনে বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগের মাধ্যমে স্থাপন করেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত, উন্মুক্ত করেছে এক নতুন ও সম্ভাবনাময় বাণিজ্য দুয়ার। এর নাম ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং। এটি এমন এক পেশা যেখানে কাজ করা যায় স্বাধীনভাবে। তবে আউটসোর্সিং সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত পরিষ্কার কোন ধারণা নেই এদেশের মানুষের। অনেকের ধারণা, এ কাজ করে খুব সহজেই ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আয় করা যায়, যা অপরিণত ধারণাই ফল।

আউটসোর্সিং তথা ফ্রিল্যান্সিং শব্দের মূল অর্থ হলো মুক্ত পেশা। অর্থাৎ মুক্তভাবে কাজ করে আয় করার পেশা। ইন্টারনেট ব্যবহার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের কাজ করিয়ে নেয়। নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কাউকে দিয়ে এসব কাজ করানোকে বলে আউটসোর্সিং। এ পেশায় অফিসের কর্মঘণ্টার মতো কোনো নির্দিষ্ট সময় মেনে চলতে হয় না। ফলে যাঁরা অফিসের ধরাবাধা নিয়মের জালে নিজেদের আটকাতে চান না তাঁদের জন্য আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং হতে পারে আয়ের অন্যতম মাধ্যম।

বাংলাদেশে আউটসোর্সিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে। তবে খুব অল্প সময়েই গোটা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় স্থানে পৌঁছেছে। যেসব বিষয়ের ওপর ফ্রিল্যান্সিংয়ের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে সেগুলো হলোÑ ডেটা এন্ট্রি, ইমেইল-মার্কেটিং, সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন (ঝঊঙ), ওয়েব পেজ ডিজাইনিং এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ভিডিও এডিটিং, ইন্ডেক্সিং, গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, কপি রাইটিং, প্রুফরিডিং ইত্যাদি। বর্তমানে বাংলাদেশে এ খাত থেকে বৈদেশিক আয়ের পরিমাণ ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাশাপাশি ২০১২-১৩ অর্থবছরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিগত সেবা রফতানি আয় ছিল প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালের মধ্যে এ খাত থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। [সূত্র : বেসিস (ইঅঝওঝ) রিপোর্ট-২০১৩]।

মাত্র দশ বছরে ফ্রিল্যান্সিং পেশা তরুণ প্রজন্মকে করেছে আলোড়িত ও উদ্দীপ্ত। তাই এ পেশায় শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা ক্রমাগত যেমন বাড়ছে, তেমন ভারত, পাকিস্তানসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সর্বনিম্ন দর বিড-এর মাধ্যমে প্রচুর কাজ সংগ্রহ করতে পারছে। সেসঙ্গে কাজের মান বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় উন্নততর। পাশাপাশি বিশাল শিক্ষিত বেকার যুবক শ্রেণীর কর্মস্পৃহা, বাংলাদেশী মুদ্রার নিম্নমান, নিম্নমজুরি কাঠামো এবং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের এক অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের শিক্ষিত তরুণ বেকারগোষ্ঠী বর্তমানে ড়উবংশ, ঊষধহপবৎ, ঋৎবব খধহপবৎ, ইঅঝওঝ প্রভৃতি আইটি কোম্পানিতে নিবন্ধিত হয়ে আবার কেউবা স্বউদ্যোগে প্রোফাইল খুলে আউটসোর্সিংয়ের কাজ সংগ্রহ করেছে। ড়উবংশ-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাদের ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ ফ্রিল্যান্সারই বাংলাদেশী তরুণ, যাঁদের অধিকাংশরই বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

আউটসোর্সিংয়ের কাজ পাওয়া যায় এমন ওয়েব সাইট অনেক আছে। বাংলাদেশী মুক্ত পেশাজীবীদের কাছে ‘ড়উবংশ’ সাইটটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এর ঠিকানা িি.িড়ফবংশ.পড়স।

এছাড়াও বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে গিয়ে ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিং লিখে সার্চ দিলেও অনেক ওয়েব সাইটের খোঁজ মিলবে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ধরনের আউটসোর্সিং রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও), কো-সোর্সিং, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রসেস আউটসোর্সিং (ইপিও), ফার্মশোরিং, হোমশোরিং, ইনসোর্সিং, নলেজ প্রসেস আউটসোর্সিং (কেপিও), লিগ্যাল প্রসেস আউটসোর্সিং (এলজিও), নিয়ারশেরিং, ইনফরমেশন টেকনোলজি আউটসোর্সিং, অফশোর আউটসোর্সিং, অফশোর সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, অফশোরিং আইটি সার্ভিসেস, প্রিন্ট অ্যান্ড মেইল আউটসোর্সিং, রিক্রুট প্রসেস আউটসোর্সিং, সোশ্যিয়ালি রেসপন্সিবল আউটসোর্সিং।

বিশ্বব্যাপী আউটসোর্সিংয়ের বিশাল বাজারের শীর্ষভাগ আমাদের পাশের দেশ ভারতের হাতে। আউটসোর্সিং সার্ভিসে ভারতের পাশাপাশি ফিলিপাইন, পাকিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইউক্রেন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চীন, রাশিয়া, পানামা, মিসর এবং আরও অনেক দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আউটসোর্সিংয়ের জগতে অনেক দেরিতে প্রবেশ করলেও আশার দিক হলো এখাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তাই আউটসোর্সিংয়ের মতো শিল্প হয়ে উঠছে বেকার সমস্যা সমাধান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উপায়। তাছাড়া, এখন পর্যন্ত যেসব কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে আউটসোর্সিং করিয়ে নিয়েছে, তারা বাংলাদেশী তরুণদের কাজে সন্তুষ্ট। সুতরাং এই তরুণদের যদি ভালভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, তাহলে আউটসোর্সিং থেকে বাংলাদেশ অনেক অর্থ আয় করতে পারবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় হাজার খানেক নিবন্ধিত আউটসোর্সিং কোম্পানি রয়েছে।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজের তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি আকর্ষণ চোখে পড়ার মতো। তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি তাদের এই আকর্ষণকে ব্যাপকভাবে আউটসোর্সিং জগতে কাজে লাগিয়ে তরুণ প্রজন্মকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের বিশালসংখ্যক নারীদের কাজে লাগিয়ে এ খাত থেকে অর্জন করা সম্ভব বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক অর্থ। এই অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দ্রুত গ্রহণীয় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দ্রুতগতিসম্পন্ন ও সুরক্ষিত ইন্টারনেট সংযোগ, ইন্টারনেটের মূল্য হ্রাস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎপ্রবাহ ব্যবস্থা, সহজ ও নিরাপদ অর্থ বিনিময় ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, সর্বোপরি সরকারের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা জরুরী।

প্রকাশিত : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪

৩০/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: