মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

শিল্পাচার্য শুধু শিল্পী ছিলেন না, ক্রান্তিকালে দেশের নেতৃত্বও দিয়েছেন

প্রকাশিত : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪
শিল্পাচার্য শুধু শিল্পী ছিলেন না, ক্রান্তিকালে দেশের নেতৃত্বও দিয়েছেন
  • জয়নুল আবেদিন জন্মশতবার্ষিকী উদ্বোধনীতে প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন শুধু শিল্পী ছিলেন না, ক্রান্তিকালে দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিল্পের মাধ্যমে ধারণ করেছিলেন বাঙালী সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য অসাম্প্রদায়িকতা। মানুষের মাঝে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বিনির্মাণে কাজ করেছেন আজীবন। অথচ সেই আদর্শিক বাংলাদেশে আজ মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সংঘাত নয়, আমরা চাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ ভাল থাকুক এবং দেশটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে মানুষের ভেতর মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে চাই। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকী জাতীয় পর্যায়ে উদ্্যাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি শিল্পাচার্যের জন্মশতবর্ষের বছরব্যাপী কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালী সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে মানুষে মানুষে মিলন হবেÑ এটাই বাঙালী সংস্কৃতির মূল কথা। আজ মাঝেমধ্যে নিজের মনে প্রশ্ন জাগে, বাঙালী জাতি কি তার সংস্কৃতির মূল ধারা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। জঙ্গীবাদ, ধর্মান্ধতা, অহিষ্ণুতা, সহিংসতা এসব বাঙালী সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নয়। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, অতিথিপরায়ণতা হচ্ছে বাঙালীর আদর্শ। বাঙালীর হয়ত কখনই সম্পদের প্রাচুর্য ছিল না। কিন্তু অল্পতে তুষ্ট বাঙালী জীবনকে উপভোগ করার কৌশল জানত।

মৌলবাদের উত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজ জঙ্গীবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। ধর্মের লেবাসধারীরা ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা করছে। আমরা গত বছর দেখেছি, কী ভাবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম চত্বরে কোরান শরীফে আগুন দেয়া হয়েছে। তছনছ করা হয়েছে জাতীয় মসজিদ।

জঙ্গীবাদ থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একমাত্র আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যই পারে মানুষের এমন অমানবিক আচরণের পরিবর্তন আনতে। এ বিষয়ে আমাদের শিল্প-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষের মননে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মনন ও আদর্শে তাঁরা একই ধরনের মত ও পথে অনুসারী ছিলেন। এই দুই বাঙালী মহাপুরুষ বাঙালী সংস্কৃতির উন্নয়ন ও বিকাশে কাজ করেছেন আজীবন। স্বাধীনতার পর শিল্পাচার্যকে বাংলাদেশের সংবিধান স্কেচ করার দায়িত্ব দেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সুচারুভাবে সে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু সোনারগাঁয়ে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন স্থাপনেরও দায়িত্ব দেন শিল্পাচার্যকে।

শিল্পাচার্যের জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি একই সঙ্গে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। এক অর্থে তিনিও শিল্পী ছিলেন। তবে তাঁর ক্ষেত্র রং-তুলির জগতে ছিল না, তিনি ছিলেন রাজনীতির নান্দনিক শিল্পী। বাঙালীর মানসে তিনি শুধু স্বাধীনতার বীজমন্ত্র এঁকে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি বাঙালী জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন।

শিল্পাচার্য প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ছিলেন খাঁটি বাঙালী। ছিলেন সাধারণ আটপৌরে মানুষের শিল্পী। সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র, দুঃখবেদনা ছিল এই মহান শিল্পীর উপজীব্য বিষয়। তিনি একাধারে ছিলেন নিসর্গপ্রেমী, অন্যদিকে তাঁর রং-তুলিতে ফুটে উঠেছে দ্রোহের ভাষা।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে জয়নুল আবেদিনের মিলের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, একজন শব্দের কারুকার্যের মাধ্যমে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করেছেন। অন্যজন রং-তুলির আঁচড়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বঞ্চনাকে তুলে ধরেছেন। কাকতালীয় হলেও দুজনেরই জন্ম গ্রামে। ছাত্রাবস্থার একটা সময় তাঁদের কেটেছে ময়মনসিংহে। জাতীয় কবি ও শিল্পাচার্য তৎকালীন পিজি হাসপাতালে একই বছর অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। দুজনকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সমাহিত করা হয়।

শিল্পাচার্যের শিল্পকর্মের ধরন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর চিত্রিত তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো মানুসের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরার পাশাপাশি তৎকালীন ব্রিটিশ রাজের এদেশের মানুষের প্রতি চরম অবহেলা ও দুর্দশা লাঘবের ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। একইভাবে ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মহাপ্রলয়ের পর বঙ্গবন্ধু যেমন ছুটে গিয়েছিলেন দুর্গত মানুষের পাশে, শিল্পী জয়নুল আবেদিনও সেদিন ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনিও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেখান থেকে ফিরে শিল্পী আঁকলেন কালজয়ী চিত্রকর্ম ‘মনপুরা-৭০’। ৩০ ফুট দীর্ঘ এই শিল্পকর্মে শিল্পী সাইক্লোনের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি বাঙালীর ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ়চিত্তের ইঙ্গিতও তুলে ধরেন। আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়ত জানেন না জয়নুল আবেদিন ১৯৭০ সালে ফিলিস্তিন সফর করে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিলিস্তিনী যোদ্ধাদের স্কেচ এঁকে বিভিন্ন আরব দেশে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছিলেন। এভাবে তিনি ফিলিস্তিনীদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

চারুকলা আন্দোলনে জয়নুল আবেদিনের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৭ পরবর্তীকালে ঢাকায় একটি চারু ও কারুকলা বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে রূপান্তরিত হয়েছে। এই চারুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলাচর্চার পথকে সুগম করে দিয়েছেন। তাঁর হাত ধরে ঋদ্ধ হয়েছে আমাদের শিল্পাঙ্গন। তাঁর এমন সাংগঠনিক পরিকল্পনাগুলো দেশের জাতিসত্তা বিকাশে অতুলনীয় অবদান রেখেছে।

শিল্পাচার্যের সৃষ্টিকর্ম প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, প্রচ- শক্তিশালী ও অত্যন্ত সংবেদনশীল শিল্পী ছিলেন জয়নুল আবেদিন। শিল্পকলাকে কখনই তিনি সাধারণ জীবনের বাইরের কোন বিষয় বলে গণ্য করেননি। জীবনাশ্রয়ী বাস্তবানুগ শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে তাঁর কৃতিত্ব সর্বজনস্বীকৃত। সাধারণ মাটির মানুষের বিচিত্র জীবনের বিভিন্ন দিক এবং নিসর্গ, নবান্ন, দুর্ভিক্ষ, জলোচ্ছ্বাস, যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জীবজন্তু ইত্যাদি অনায়াসে তাঁর শিল্পকর্মের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ শীর্ষক চিত্রমালার জন্য তিনি সারাবিশ্বে খ্যাতি লাভ করেছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পী ও সংগঠক হিসেবে তিনি শিল্পবোধ এবং শিল্পরুচি সৃষ্টির প্রয়াসে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, যা এখনও নতুন প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত করে। এ কারণেই বাংলাদেশের সমাজ ও সাংস্কৃতিক পরিম-লে জয়নুল আবেদিনের গুরুত্ব অপরিসীম।

শিল্পাচার্যের জন্মশতবার্ষিকীর জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান উদ্বোধনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাদুঘরে নলিনীকান্ত ভট্টশালী মিলনায়তনে জয়নুল ছবি নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।

জয়নুলের জন্মশতবর্ষের জাতীয় পর্যায়ের বছরব্যাপী কর্মসূচীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্পাচার্যের সহধর্মিণী বেগম জাহানারা আবেদিন। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন শিল্পাচার্যের জন্মশতবর্ষ উদ্্যাপন প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি মুস্তাফা মনোয়ার। জয়নুল আবেদিনের দিকে ফিরে ফিরে তাকানো শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা করেন অধ্যাপক বোরহান খান জাহাঙ্গীর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

প্রকাশিত : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪

৩০/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: