মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

জরুরী প্রয়োজনে চীন পাশে থাকবে ॥ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস

প্রকাশিত : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৪
জরুরী প্রয়োজনে চীন পাশে থাকবে ॥ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস
  • দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ, চট্টগ্রাম থেকে কুনমিং পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের প্রস্তাবে সাড়া

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশের জরুরী প্রয়োজনে চীন পাশে থাকবে। আর চীনকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে বাংলাদেশ অনুসরণ করবে। এছাড়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নির্মাণেও সহায়তা দেবে দেশটি। দুই দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। আর চট্টগ্রাম থেকে কুনমিং পর্যন্ত রোড তৈরির বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে চীন। এছাড়া আগামী বছর ঢাকা-বেজিং কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান ঘটা করে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ঢাকায় সফররত চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং আই’র সঙ্গে একাধিক বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবিবার রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। আজ সোমবার সকালে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক ॥ বাংলাদেশের জরুরী প্রয়োজনে চীন পাশে দাঁড়াবে বলে জানিয়েছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং আই। রবিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য বৈঠককালে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এ কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরী সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন। গত ৬ বছরে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে বাংলাদেশ ২০২১ সাল ও ২০৪১ সালের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তাতে পৌঁছাতে পারবে। এক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে।

চীন ও বাংলাদেশের স্বপ্ন একই মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ তাদের শক্তি, সামর্থ্য কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশকে চীন অধিক ফলনশীল উন্নত জাতের ধান ও তার প্রযুক্তি দেবে বলে জানান সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার শান্তিশৃঙ্খলা ও উন্নয়নে আরও অবদান রাখবে আশা প্রকাশ করে ওয়া আই বলেন, চীন, ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ এক সঙ্গে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নে বাংলাদেশ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানি করার আশা করেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি। জাঁকজমকপূর্ণভাবে এ উৎসব পালন করবে দুই দেশ। বৈঠকে এ বিষয়েও আলোচনা হয়। ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা দুই দেশ সফর করবেন। দু’দেশের নেতাদের এ ধরনের সফর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করবে বলে আশা প্রকাশ করেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আগামীতে চীনের প্রেসিডেন্ট কর্ণফুলী টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। চীন ও বাংলাদেশ দু’দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এক সঙ্গে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশ এক সঙ্গে কাজ করলে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে দুই দেশ।

প্রধানমন্ত্রী চীনের উন্নয়নের অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, চীনকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে বাংলাদেশ অনুসরণ করবে। চীন বাংলাদেশের উন্নয়নে আরো সহযোগিতা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীন, ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন অনেক ভাল। ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ ও চীনের রাষ্ট্রদূত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ॥ বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। এছাড়া ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নির্মাণে বাংলাদেশের পাশে থাকবে দেশটি। দুই দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। আর চট্টগ্রাম থেকে কুনমিং পর্যন্ত রোড তৈরির বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে চীন। এছাড়া আগামী বছর ঢাকা-বেজিং কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান ঘটা করে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে চট্টগ্রাম থেকে কুনমিং পর্যন্ত একটি রোড তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এই প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে চীন। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডরের বাইরে পৃথক রোড হবে এটি। এছাড়া দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত করার জন্য উভয় দেশই একমত হয়েছে বলেও তিনি জানান।

শহীদুল হক আরও জানান, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। এছাড়া ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নির্মাণ ও সরকারের ‘ভিশন-২০২১’ বাস্তবায়নে চীন বাংলাদেশের অংশীদার হতে চেয়েছে বলেও তিনি জানান।

পররাষ্ট্র সচিব জানান, বাংলাদেশে চীনের এক্সক্লুসিভ অর্থনৈতিক জোন নির্মাণের সিদ্ধান্তে সরকারের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী বছর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এই কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে সম্মত হয়েছে উভয় দেশ। এ ছাড়া বৈঠকে আঞ্চলিক যোগাযোগের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের ব্যবসা ও বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) মাধ্যমে বাণিজ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে উভয় দেশই সম্মত হয়েছে।

রবিবার সকাল ১০টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং আইয়ের নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শুরু হয়। তিন ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল আলমসহ ১৯ জন ও চীনের ১৩ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর ওয়াং আই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় মধ্যাহ্নভোজনে অংশ নেন। বৈঠকের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যর্থনা কক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপর আবুল হাসান মাহমুদ আলী তাকে মন্ত্রণালয়ের একটি গ্যালারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ছবি ঘুরিয়ে দেখান। এ সময় পরিদর্শন বইয়ে মন্তব্য লেখেন ওয়াং আই।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং আই তিন দিনের সফরে শনিবার ঢাকায় আসেন। ঢাকায় আসার আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেপাল সফর করেন। দিনদিন নেপাল সফরের পর কাঠমান্ডু থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর ওয়াং আই রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া রাতে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত জুনে চীন সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি খ্য ছিয়াংকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আগামী বছর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি খ্য ছিয়াংকের ঢাকায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সোমবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফর শেষে ঢাকা ত্যাগ করবেন। ঢাকা ছাড়ার আগে তিনি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গে সকালে বৈঠক করবেন।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরকালে কয়েকটি সমঝোতা চুক্তি সই করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর চীন সফরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ এবং বাংলাদেশে চীনের অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সমঝোতা চুক্তি সই করেন। সে সময় চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনে চুক্তিও সই হয়। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্যসেবা পৌঁছতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান, রাজশাহীতে পানি শোধনাগার নির্মাণ, চট্টগ্রামের কালুরঘাটে রেলসেতু নির্মাণ, চট্টগ্রাম-রামু-কক্সবাজার, রামু-গুনধুম ডুয়েলগেজ রেললাইন স্থাপন এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট প্রতিষ্ঠায় চীনের সহযোগিতা কামনা করে বাংলাদেশ। এসব বিষয়ে অগ্রগতি ও সম্ভাবনা নিয়েই দু’দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা ইস্যুও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমানে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ শুল্কমুক্ত কোটা সুবিধা পেয়ে থাকে। আগামীতে শতভাগ শুল্কমুক্ত কোটা সুবিধার বিষয়ে বাংলাদেশ আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের নৌবাহিনী আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়ার বিষয়েও চীন ইতিমধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডর গঠনে চারটি দেশ একযোগে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরকালে বিসিআইএম করিডর গঠনে আন্তরিকভাবে কাজ করার জন্য আগ্রহও প্রকাশ করেছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরে বিসিআইএম’র অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার।

প্রকাশিত : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৪

২৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: