কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পুলিশী নির্যাতনের খবর জিহাদের বাবার অস্বীকার

প্রকাশিত : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৪
পুলিশী নির্যাতনের খবর জিহাদের বাবার অস্বীকার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ জিহাদের পিতাকে থানায় আটকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার ঘটনায় রীতিমতো তোলপাড় চলছে। পুলিশ কোন প্রকার নির্যাতন বা মারধর করেনি বলে জনকণ্ঠের কাছে দাবি করেছেন জিহাদের পিতা। তবে পুলিশ জিহাদের অবস্থান, তার সঙ্গে কারও শত্রুতা আছে কিনা এবং জিহাদ অপহৃত হতে পারে কিনা তা জানতে চেয়েছে। পুলিশও এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। তারপরও পুলিশের তরফ থেকে অভিযোগের তদন্ত করা হচ্ছে। এদিকে শুক্রবার রাতে পাইপের ভেতরে কোন মানবদেহের অস্তিত্ব না থাকার দাবি করে উদ্ধার অভিযান সাময়িক বন্ধ করার ঘোষণা, পরবর্তীতে স্বেচ্ছাসেবীদের চেষ্টায় লাশ উদ্ধার এবং জিহাদের পিতাকে থানায় আটকে রেখে নির্র্যাতনের ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় চলছে। প্রশ্ন উঠেছে সরকারের সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে। জিহাদের মৃত্যু সরকারের ব্যর্থতা উল্লেখ করে বিএনপি এর তদন্ত দাবি করেছে।

রবিবারও শাহজাহানপুরে ছিল উপচেপড়া ভিড়। যে পাইপ থেকে জিহাদকে উদ্ধার করা হয়েছে সেটি একনজর দেখার জন্য মানুষ ভিড় করছিল। ঘটনাস্থলের চারদিকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রবিবার ময়নাতদন্ত শেষে জিহাদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ময়নাতদন্তে পানিতে ডুবে ও মাথায় আঘাত পেয়ে জিহাদের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে উদ্ধারকারীদের দাবি, দৃশ্যমান চোখে মাথায় আঘাত পেয়ে জিহাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। রবিবারই লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কড়া পুলিশ পাহারায় রবিবারই লাশ দাফনের জন্য শরীয়তপুরে জিহাদের দাদার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই পারিবারিক করবস্থানে বিকেল সাড়ে ৫টায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।

গত শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে জিহাদ শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির বালুরমাঠ সংলগ্ন ওয়াসার পানির পাম্পের কাছে ফাতেমা (৬), পুষ্পিতা (৭) ও মনসুরসহ (৭) কয়েক জনের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করছিল। দৌড়াদৌড়ির এক পর্যায়ে জিহাদ ওয়াসার পাম্পের একটি পরিত্যক্ত খোলা পাইপের ভেতরে পড়ে যায়। ফাতেমা ও পুষ্পিতা বিষয়টি কলোনির বাসিন্দাদের জানায়। তাদের মাধ্যমে খবর পেয়ে ফায়ার সার্র্ভিসের ৫টি ইউনিট উদ্ধার কাজ শুরু করে।

রাত ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে হাজির হন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান, ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ, বুয়েটের চার বিশেষজ্ঞ, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম খানসহ রেলওয়ে ও পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা।

রাত ৩টার দিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের বলেন, ভেতরে কোন লাশের অস্তিত্ব নেই বা কোন মানুষ থাকার আলামত মিলছে না। বিষয়টি গুজবও হতে পারে বলে ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সরকারের দায়িত্বশীলদের এমন বক্তব্যের পর মুহূর্তেই নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। জিহাদ অপহরণ, পূর্বশত্রুতার জের ধরে হত্যা, অন্যকে বিপদে ফেলতে জিহাদের পিতা পরিকল্পিতভাবে ছেলে লুকিয়ে রেখে নাটক সাজাতে পারে, অথবা সরকার বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে দেশবাসীর দৃষ্টি ভিন্নদিকে ঘুরিয়ে দিতেও পরিকল্পিতভাবে এমন কাজ করতে পারে। এমন গুজব ডালপালা মেলতে থাকে। এমন গুজবের পর রাত সাড়ে তিনটার পর শাহজাহানপুর থানা পুলিশ জিহাদের পিতাকে তাদের হেফাজতে নেয়।

শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ভেতরে কোন লাশের অস্তিত্ব নেই জানিয়ে তাদের উদ্ধার তৎপরতা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেন। তবে স্থানীয় উদ্ধারকারীদের ফায়ার সার্ভিস সহায়তা করবে বলে জানান তিনি। এমন ঘোষণার আধঘণ্টা পরই স্বেচ্ছাসেবী ও স্থানীয়রা জিহাদের লাশ সেই পাইপ থেকে উদ্ধার করে। জিহাদের লাশ উদ্ধারের পর পরই তার পিতাকে পুলিশ পাহারায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। জিহাদের পিতা সেখানে অভিযোগ করেন, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পাইপের ভেতরে কোন লাশ বা মানুষের অস্তিত্ব নেই এমন ঘোষণার পরই পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। থানায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। তাকে ক্রসফায়ারসহ নানা ভয়ভীতি দেখায়। এদিকে লাশ উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর শাস্তি দাবিসহ ওই এলাকায় বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীরা ওয়াসার সেই পাম্পসহ কিছু দোকানপাট ভাংচুর করে।

শাহজাহানপুর থানার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানান, সরকারের দায়িত্বশীলদের পাইপের ভেতরে লাশ নেই বা কোন মানুষের অস্তিত্ব না থাকার ঘোষণার পর জিহাদের পিতাকে থানা হেফাজতে নেয়া হয়। তাকে জিহাদের অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য দিতে বলা হয়। এক পর্যায়ে তাকে চাপও দেয়া হয়। তবে তাকে মারধর করা হয়নি। কারণ জিহাদ নিখোঁজ হওয়ার কারণে পিতা স্বাভাবিকভাবেই খুবই মর্মাহত ছিলেন। এজন্য তাকে কোন প্রকার শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি। জিহাদ নিখোঁজ হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়। কোন পূর্বশত্রুতার জের ধরে বা ব্যক্তিগত স্বার্থে জিহাদকে কেউ অপহরণ করেছে কিনা বা সত্যিই জিহাদ সেই পাইপে পড়েছে কিনা, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার আনোয়ার হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, জিহাদের পিতা, জিহাদের দুই খেলার সাথী পুষ্পিতা ও ফাতেমাসহ ৫ জনকে থানা হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে জিহাদের পিতাকে কোন প্রকার নির্যাতন করা হয়নি। শুধু জিহাদের প্রকৃত অবস্থান জানার জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। নির্যাতনের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, জিহাদের পিতাকে পুলিশী নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।

জিহাদের পিতার বক্তব্য ॥ জিহাদের পিতা জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারের তরফ থেকে পাইপের ভেতরে কোন লাশ নেই, এমন দাবি করার পর পরই পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। প্রথমে তাকে সামনের ডিউটি অফিসারের রুমে রাখা হয়। পরে তাকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের কক্ষে নেয়া হয়। সেখানেই তাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার সঙ্গে কারও শত্রুতা আছে কিনা, জিহাদকে কেউ হত্যা করতে পারে কিনা, জিহাদকে অপহরণ করা হতে পারে কিনা এবং তিনি নিজেই কাউকে ফাঁসিয়ে দিতে জিহাদকে লুকিয়ে রেখেছেন কিনা ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চায় পুলিশ। তাকে কড়া জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়নি।

জিহাদের মামা তোলা বিক্রেতা সালাউদ্দিনের বক্তব্য ॥ জিহাদের খালাত মামা সালাহউদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, আমি গার্মেন্টসে তোলা সরবরাহের কাজ করি। বাসা জিহাদদের বাসা থেকে মাত্র ৩শ’ গজ সামনে। জিহাদরা ৪১ নম্বর ভবনে আর আমি পরিবার নিয়ে পেছনেই ৪৬ নম্বর রেলওয়ে কলোনি ভবনে বাস করি। শুক্রবার রাতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ পাইপে কোন মানুষের অস্তিত্ব নেই বলার পর জিহাদের পিতাকে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমি নিজেই ডিম-পরোটা নিয়ে থানাই যাই। তার আগেই জিহাদের পিতা নাস্তা করে। তারপরও আমার নেয়া পরোটা খায়। পুলিশ তাকে মারধর করেছে কিনা জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জিহাদের পিতা আমাকে বলেছে, পুলিশ তাকে কোন মারধর করেনি। শুধু জিহাদের অবস্থান জানার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। লাশ উদ্ধারের পর জিহাদের পিতাকে পুলিশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে নিয়ে যায়। জিহাদের পিতাকে পুলিশের মারধর করার অভিযোগটি সত্য নয় বলেও তিনি দাবি করেন। কেউ কেউ হয়ত পরিকল্পিতভাবে এমন বিভ্রান্তি ছড়িয়ে থাকতে পারে।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য ॥ রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, শিশু জিহাদকে উদ্ধার অভিযান স্থগিতের কোন নির্দেশনা সরকার দেয়নি। রাত সাড়ে ৩টায় একটি গার্বেজ দেখা যায়। তখন পর্যন্ত ক্যামেরাতে কিছু পাওয়া যায়নি। খুব সম্ভবত শিশুটি ওই গার্বেজের নিচে চলে যাওয়ায় আমরা দেখতে পাইনি। আমি ফায়ার সার্ভিসকে সাড়ে ৩টার সময় অপারেশন ‘কন্টিনিউ’ করতে বলি। অভিযান স্থগিতে আমাদের কাছ থেকে কোন নির্দেশনা ছিল না। পাইপের বহুদূর পর্যন্ত ভেতরে ক্যামেরা নামিয়েও কোন মানবদেহের অস্তিত্ব ধরা না পড়ার কথা জানায় ফায়ার সার্ভিস। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পাইপের ভেতরে কোন মানবদেহের অস্তিত্ব নেই বলে সাংবাদিকদের জানান। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পরেই ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার তৎপরতায় ভাটা পড়ে।

উদ্ধার তৎপরতায় শিথিলতা ছিল না দাবি করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফায়ারের এ ধরনের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা বুয়েট, সাধারণ মানুষ ও ওয়াসার কাছে সহযোগিতা চেয়েছিল। বুয়েটের দল বলেছিল ক্যাচার ফেলে দেখতে, সেটি ফেলেও পাওয়া যায়নি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, জিহাদের পিতাকে খারাপ উদ্দেশে রাখা হয়নি। নির্যাতনের কোন ঘটনা ঘটলে সেটা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

পুলিশ মহাপরিদর্শকের বক্তব্য ॥ শিশু জিহাদের পিতা নাসির ফকিরকে থানায় নেয়ার পর নির্যাতনের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার। রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এমনটাই দাবি করেন। তিনি বলেন, নির্যাতন নয়, বরং তাকে আন্তরিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রহস্য উন্মোচনের জন্য সৎ উদ্দেশে নাসিরকে নেয়া হয়েছিল। ওই রকম পরিস্থিতিতে যাদের মধ্যে ন্যূনতম মনুষ্যত্ব বোধ থাকে, তার পক্ষে শক্ত করে কিছু করার কথা নয়। তারপরও নির্যাতনের কোন ঘটনা যদি থাকে, তা খতিয়ে দেখা হবে।

জিহাদের লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ॥ পরিত্যক্ত নলকূপের কয়েক শ’ ফুট গভীর পাইপে পড়ে যাওয়ার সময় জিহাদ মাথায় ও শরীরে আঘাত পায়। এতেই তার মৃত্যু হয়নি। পানিতে পড়ে যাওয়ার পরই অল্প সময়ের মধ্যে তার মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ময়নাতদন্তকারী তিন সদস্য মেডিক্যাল বোর্ডে এ তথ্য জানান। তাদের ধারণা, পানির কারণে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে শিশু জিহাদের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হাবিবুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এ কে এম শফিউজ্জামান ও প্রভাষক প্রদীপ কুমার বিশ্বাস জিহাদের ময়নাতদন্ত শুরু করেন। সকাল পৌনে ১০টার দিকে জিহাদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত শেষে প্রফেসর হাবিবুজ্জামান চৌধুরী আধাঘণ্টা পর রিপোর্ট প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, ছেলেটির মাথার ভেতরে ও বাইরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে পাইপে পানি ছিল। আমাদের ধারণা হয়েছে, পাইপে পড়ে যাওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে পানিতে ডুবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জিহাদ যদি পানিতে পড়ে না যেত তাহলে হয়ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল।

জিহাদের পিতার মামলা দায়ের ॥ শনিবার রাতে জিহাদের পিতা নতুন পাম্প স্থাপনকারী এসআর হাউজের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সালাম ও রেলওয়ের সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামিদের গাফিলতির কারণেই তার ছেলে পাইপে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। পাইপের মুখে ঢাকনা থাকলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না।

জিহাদের লাশ দাফন ॥ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহজাহানপুর থানার এস আই আবু জাফর জানান, ময়নাতদন্ত শেষে বেলা ১১টার দিকে শিশু জিহাদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। শিশুটি মামা শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির চা দোকানি মনির হোসেন লাশ বুঝে নেন। জিহাদের কফিন বহনকারী এ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত পুলিশ পাহারায় শরীয়তপুরের নড়িয়া থানাধীন পূর্বেরচর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৫টায় পারিবারিক কবরস্থানে জিহাদকে দাফন করা হয় বলে জিহাদের মামা মনির হোসেন জনকণ্ঠকে জানান।

পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে যা আছে ॥ শনিবার রাতে জিহাদের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন শাহজাহানপুর থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) আবু জাফর। প্রতিবেদনে বলা হয়, জিহাদের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত ও যখমের দাগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাইপের ভেতর অক্সিজেন না থাকায় জিহাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যের সঙ্গে ময়নাতদন্ত রিপোর্টের অমিল ॥ জিহাদের লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের কোন মিল নেই। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ জিহাদ বেঁচে আছে বলে তাদের ধারণার কথা জানান। তার কান্নার আওয়াজ শোনা গেছে। শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে জিহাদের মৃত্যু হয় বলে ময়নাতদন্তকারীদের জানান।

বিএনপির তদন্ত দাবি ॥ রবিবার রাজধানী ঢাকার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্র্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শিশু জিহাদকে জীবিত উদ্ধার করতে না পারার জন্য সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করে ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে বিএনপি। দলের পক্ষে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, উদ্ধার অভিযানে সংশ্লিষ্টদের রহস্যজনক ভূমিকায় জনমনে গভীর সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য শুধু বিভ্রান্ত করেছে। উদ্ধার প্রচেষ্টাও ছিল লোক দেখানো। তারা শিশুটিকে বাঁচাতে চাচ্ছিল না। জিহাদের মৃত্যুর জন্য সরকারকে দায়ী করেন তিনি। জিহাদের পিতাসহ কয়েকজনকে থানায় আটকে রাখারও সমালোচনা করেন এই বিএনপি নেতা।

পুলিশী নির্যাতনের খবরু

সেই তিন তরুণ সংবর্ধিত ॥ শুধুমাত্র একাডেমিক শিক্ষা অর্জন করে সার্টিফিকেট নিলে দেশের জন্য কাজ করা যায় না, তার জন্য দরকার মানসিকতা। আর সেই মানসিকতার দায়বদ্ধতা থেকে জিহাদকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। জিহাদকে উদ্ধারে অবিস্মরণীয় অবদান রাখায় ভোরের কাগজের পক্ষ থেকে সাহসী ৩ তরুণকে দেয়া সংবর্ধনায় এসব কথা বলেন বক্তারা।

ভোরের কাগজ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে রবিবার বিকেলে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। ফিচার সম্পাদক রিপন ইমরানের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বার্তা সম্পাদক শান্তনু চৌধুরী ও নগর সম্পাদক ইখতিয়ার উদ্দিন। অনুষ্ঠানে সাহসী ৩ তরুণ আব্দুল্লাহ আল মুন, শফিকুল ইসলাম ফারুক, সুজন দাস রাহুলকে ভোরের কাগজের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট ও স্মারক তুলে দেন সম্পাদক শ্যামল দত্ত।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জিহাদকে উদ্ধারের সাহসী ৩ নায়কের একজন আব্দুল্লাহ আল মুন তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টায় টেলিভিশনে উদ্ধার অভিযান দেখে মনে হলো, কেউই সঠিকভাবে কাজ করছে না। আমার ওখানে যাওয়া উচিত। এরপর রামপুরার মেরাদিয়ার বাসা থেকে হেঁটে শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনী মাঠে ঘটনাস্থলে যাই। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের লোকজন যেভাবে কাজ করছে সেখানে কিছু করার সুযোগ পেলাম না। দেখতে দেখতে ভোর হয়ে এলো। লোকজন কিছুটা কমে এলো। আমি নিজে কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কাজ দেখে ধারণা নিলাম। সেখানে মিন্টু নামে এক সুইপার আমাকে বলল, শিশু জিহাদ ওই নলকূপের গভীরে পড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিস শিশুটিকে উদ্ধারে কম চেষ্টা করেনি। তবে তাদের চেষ্টায় কিছুটা ত্রুটি আছে। ওর ভেতরে কি আছে আমাকে দেখতে হবে। এভাবে সকাল ১০টার দিকে শফিকুল ইসলাম ফারুক ভাই এলেন। সুজন দাস রাহুলও আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন।

মুন বলেন, আমাদের ৩ জনের সঙ্গে আগে কোন পরিচয় ছিল না। এখানে সবাই একই উদ্দেশে আমি, উদ্ধার অভিযানে কিছু একটা করার জন্য। আমরা ৩ জনে মিলে পরিকল্পনা করে বর্শা মতো যন্ত্র তৈরি করি। এর সঙ্গে ক্যামেরা যুক্ত করি। রামপুরা থেকে আসা ওয়েল্ডিংয়ের এক লোক আসেন এ কাজে তার সহায়তা নিই। যন্ত্রটি নলকূপের গভীরে আস্তে আস্তে ফেলি। ক্যামেরায় তেলাপোকা, টিকটিকি দেখতে পেয়ে কিছুটা হতাশ হই। পরে যন্ত্রটি ১০ ফুট উপরে তুলে আবার ফেলি। এবার আমরা পানি দেখতে পাই। রশি পুরোপুরি ছেড়ে দেই। তখন রশিতে ভারী কিছু মনে হল। তবে ক্যামেরায় কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। ১০০ ফুট উপরে তোলার পর মনে হলো শিশুটি আছে। এরপর শিশুটির হাত দেখতে পেলাম। পরে ওপরে তোলার পর জিহাদকে পাই। উদ্ধারকাজে আমাদের সবাই সহযোগিতা করেছে। জিহাদকে দেখে মনে হলো সে মারা গেছে। খুব খারাপ লাগলো। শিশুটি উদ্ধারের আগে ওর বাবা-মা বলেছিল, জীবিত না হোক ছেলের লাশ চাই। কিন্তু আমরা জিহাদকে জীবিত উদ্ধার করতে পারিনি। আমাদের লক্ষ্য ছিল উপকার করা, সেটা হয়তো করতে পেরেছি।

প্রকাশিত : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৪

২৯/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: