আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বৈষম্যের বেড়াজালে মার্কিন শিশুরা

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪
  • ভাষান্তর : লিটু খান

এটা এখন স্বীকৃত যে শিশুরা সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণী। বিশ্বের কোন ভূখ-ে জন্ম, তা নির্বাচন তো দূরের কথা, পিতা-মাতা বেছে নেওয়ার সুযোগই প্রাকৃতিক নিয়মে শিশুরা পায় না। প্রাপ্তবয়স্কদের মতো নিজেদের সুরক্ষা ও দেখভাল করার সামর্থ্যও তার নেই। এসব বিবেচনায় ১৯২৪ সালে জাতিপুঞ্জ (খবধমঁব ড়ভ ঘধঃরড়হং) শিশু অধিকার সুরক্ষায় জেনেভা ঘোষণা অনুমোদন করে। এরই ধারবাহিকতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে সাক্ষর করে।

পরিতাপের বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র এই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছে না। প্রকৃতপক্ষে, দেশটি এখন পর্যন্ত শিশু অধিকার সুরক্ষার এই সনদ যথাযথ প্রয়োগের পথেই পা বাড়ায়নি। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতের কাক্সিক্ষত ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে শিশু অধিকার রক্ষায় বিশ্বে যুক্তরাষ্টের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হওয়া উচিত ছিল। উল্টো, এক্ষেত্রে দেশটি ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবেই প্রতীয়মান। এই ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিশু অধিকার সুরক্ষায় দেশটির দৃশ্যমান কোন অবদান না রাখার ব্যর্থতাও।

বিশ্বে আমেরিকার শিশুদের অবস্থা গড়পরতা মন্দ না হলেও, দেশটির মোট সম্পদ ও শিশুদের জীবনমানের মধ্যে বৈষম্য চোখে পড়ার মতো। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ দরিদ্র; সেখানে ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অঙ্কের হিসেবে সংখ্যাটা নেহাত কম নয়, দেড় কোটির মতো! উন্নত বিশ্বে কেবল রোমানিয়ায় এর চেয়ে উচ্চ হার বিদ্যমান। কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।

দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে যুক্তরাষ্ট্রে এমন শিশুর হার যুক্তরাজ্যের তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশ বেশি এবং নরডিক দেশসমূহের তুলনায় চারগুণেরও বেশি। দেশটির বেশ কয়েকটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই হার আরও উদ্বেগজনক; যেমন, কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের ৩৮ শতাংশেরও বেশি এবং হিস্পানিক (স্প্যানিশভাষী আমেরিকান/ ল্যাটিন আমেরিকান) শিশুদের ৩০ শতাংশ দরিদ্র।

আমেরিকানরা শিশুদের যতœআত্মি করেন না- ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়; শিশুদের এমন অবস্থার জন্যও দায়ী নয়। এর মূল কারণ খুঁজতে হবে অন্য জায়গায়। বিগত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র এমন সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে, যা একদিকে যেমন দেশটির অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে সমাজের অরক্ষিত ও দরিদ্র্য অংশকে আরও শোচনীয় অবস্থার দিকে ঢেলে দিচ্ছে। মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়া এবং সেই সম্পদের ওপর করারোপে হার হ্রাসের পরিকল্পনা মানে তো শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অধিকার সুরক্ষার মতো সেবা ও জনকল্যাণমূলক খাতগুলোতে কম বিনিয়োগ করা।

মূলত এ কারণেই আমেরিকান শিশুদের বর্তমান এই ললাট-লিখন। ধনবৈষম্য কিভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার গতিকে স্থবির করে দেয় আমেরিকান শিশুদের এই ললাটলিখন শুধু তার মর্মান্তিক উদাহরণই নয়, একইসঙ্গে তা আমাদের সুষম সমাজের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকও।

আয় বৈষম্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। পরিবেশগত বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দিকটিও আয় বৈষম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে শিশুরাই মূলত এগুলো দ্বারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন, আমেরিকার প্রতি দরিদ্র পাঁচ শিশুর মধ্যে একজন শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত ধনী শিশুদের তুলনায় দরিদ্র শিশুদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার ৬০ শতাংশ বেশি। আমেরিকায় ১ লাখ মার্কিন ডলার আয় করে এমন পরিবারে জন্মানো শিশুদের তুলনায় ৩৫ হাজার ডলার উপার্জনকারী পরিবারে জন্মানো শিশুদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার হার দ্বিগুণ। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন কংগ্রেসের কেউ কেউ অতি আগ্রহী রেশন কার্ড ব্যবস্থা উঠিয়ে দিতে, যার ওপর ২ কোটির বেশি পরিবার নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থা তুলে দেয়া হলে দরিদ্র শিশুরা ক্ষুধা-অনাহারের হুমকির মধ্যে পড়বে।

উল্লিখিত বৈষম্যগুলোর সঙ্গে আবার সুযোগ লাভের ক্ষেত্রে বৈষম্য ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যেসব দেশের শিশুদের পুষ্টিহীনতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত সুযোগ এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, সেসব দেশে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের প্রত্যাশিত জীবনমান ধনীদের সন্তানদের চেয়ে ঢের পৃথক হয়। আমেরিকায় শিক্ষা ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারের থেকে উঠে আসা শিশুদের পেছনে যত না ব্যয় করা হয়, তার চেয়ে ঢের বেশি ব্যয় করা হয় ধনী পরিবারে শিশুদের জন্য। ফলশ্রুতিতে, দেশটি তার মহামূল্যবান মানবসম্পদ অপচয়ের দিকে ঢেলে দিচ্ছে। দক্ষতা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে কিছু তরুণ সমাজবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। দেশটির ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যগুলো উচ্চশিক্ষার জন্য যত অর্থ ব্যয় করে ঠিক সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করে জেলখানার কয়েদিদের জন্য, কোন কোন ক্ষেত্রে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশিও হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে, বৈষম্যের ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হলেও এবং আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব রাখলেও, অধিংকাংশ ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা অসম্ভব নয়। কিছু কিছু দেশে বৈষম্যের যে ক্ষতিকর দিকগুলো পরিলক্ষিত হচ্ছে, এগুলো অর্থনৈতিক নীতি ও আইনের অপরিহার্য ফল নয়। শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্ত বলয়, যুগোপযোগী কর-ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক খাতের ওপর সর্বোত্তম নজরদারির মতো সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এই ক্ষতিকারক প্রবণতাগুলো রোধ করা সম্ভব।

বৈষম্যের মতো অনাকাক্সিক্ষত অবস্থা এবং আমাদের শিশুদের ওপর এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব নিয়ে নীতিনির্ধারকদের নিষ্ক্রিয়তার ব্যাপারে আমাদেরই অবশ্যই সক্রিয় হতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ত্বরান্বিত হয়। আমরাই শিশুদের বৈষম্য থেকে রক্ষা ও তাদের জন্য সুযোগের সমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারি। আর এটাই হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত ভবিষ্যত নিশ্চিতকরণের মহাযজ্ঞ বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ। তাহলে আমরা কেন করব না?

এই যে বৈষম্য, যা আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজে ক্ষতিকর প্রভাব রাখছে, আমাদের শিশুদের অপূরণীয় ক্ষতি করছে, তা সকলের কাছে বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। প্রাপ্তবয়স্করা ভাগ্য পরিবর্তনে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করুন, কঠোর পরিশ্রম না করুন, সঞ্চয় না করুন কিংবা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হোন, কিন্তু শিশুদের জন্য সমান সুযোগের ব্যবস্থা করা ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। অন্য যে কারও চেয়ে শিশুদের অধিক সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণ জরুরী- এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখানো উচিত।

জোসেফ ই. স্টিগলিৎজ : অধ্যাপক, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী

সূত্র : প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪

২৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: