মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দেশের শক্তি যুবসমাজ

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪
  • এমএ খালেক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক যুব সমাবেশে দেশের তরুণ-তরুণীদের সরকারী চাকরির পেছনে না ঘুরে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যত গড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর এই পরামর্শ অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বাস্তবধর্মী, এতে কোনই সন্দেহ নেই। এটা অনস্বীকার্য যে, শুধু সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদানের মাধ্যমে কখনই একটি দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা রোধ করা সম্ভব নয়। অর্থনীতিবদরা মনে করেন, আত্মকর্মসংস্থানই হচ্ছে বেকারত্ব নিরসনের শ্রেষ্ঠ উপায়। সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ খুবই সীমিত। তাই বেকার সমস্যা সমাধান করতে হলে অবশ্যই আত্মকর্মসংস্থানের ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ, রাষ্ট্রযন্ত্র যেখানে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসৃজনে সমর্থ নয়, সেখানে আত্মকর্মসংস্থান ব্যতীত বেকার সমস্যা সমাধানের কার্যকর কোন বিকল্প পন্থা নেই।

যুব সমাজ আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবার দাবি রাখে। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, আমরা যুব সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারছি না। উন্নয়নশীল অনেক দেশের তুলনায় আমাদের যুব সমাজ অধিকতর কর্মমুখী। সুযোগ পেলে তারা যে কোন অসাধ্য সাধন করতে পারে। তারা বিদেশী শ্রম বাজারে গিয়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। প্রমাণ করেছে তারা যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম।

দেশের অর্থনীতির রিয়েল প্রোডাক্টিভ সেক্টরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে গ্রামীণ অর্থনীতি। এতদিন গ্রামীণ অর্থনীতি কার্যত অবহেলিত ছিল। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিতে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষও এখন নানাভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে। সাধারণভাবে মানুষের ভোগ ব্যয় বেড়েছে। আর্থিক সামর্থ্যও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন দেশের মানুষের ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি পেলে, সেই দেশের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এক ধরনের গতিশীলতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে আমরা সেই প্রবণতা লক্ষ্য করছি। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক।

বাংলাদেশে যুবশক্তির অবস্থা উন্নয়নশীল অনেক দেশের তুলনায় ভাল। বিশেষ করে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশে প্রভূত সাফল্য প্রদর্শন করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এদেশ নির্ধারিত সময়ের আগেই লক্ষ্য পূরণে সক্ষম হয়েছে। এমন কি সার্ক দেশগুলোর মধ্যে মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ভাল। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে এখনও সংশয় রয়ে গেছে। যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর উচ্চশিক্ষিত হয়ে বেরোচ্ছে, তাদের শিক্ষা গ্রহণের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার অবকাশ আছে বৈকি। দুর্বল শিক্ষায় শিক্ষিত কোন ব্যক্তি কর্মজীবনে কোনভাবেই সফল হতে পারে না। তাই তাদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যা হবে কর্মমুখী এবং গুণগত মানসম্পন্ন।

পৃথিবীর সব দেশেই আত্মকর্মসংস্থানের গুরুত্ব রয়েছে। তবে এদেশে এই বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে দেশে সরকারী চাকরির সুযোগ ক্রমাগত সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। আগামীতে কোনভাবেই শুধু সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণীর কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান করা যাবে না। তাই আমাদের এখনই এ ব্যাপারে জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়ন কর্মসূচী এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে তার সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা থাকে। সরকার পরিবর্তন হলেও নীতি বা কর্মসূচীর কোন পরিবর্তন না হয়।

বাংলাদেশ যদি দ্রুত উন্নতি অর্জন করতে চায় তাহলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানের কোন বিকল্প নেই। বিশ্বের অনেক দেশই এসএমই খাতের মাধ্যমে তাদের জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছে। এ ক্ষেত্রে চীনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। চীনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এসএমই খাত। বাংলাদেশ নানাভাবে চেষ্টা করছে এসএমই খাতের উন্নয়নের জন্য। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য খুবই সামান্য। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদেন উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৩০ শতাংশ। মোট কর্মসংস্থানের ২৫ শতাংশ এবং শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ হচ্ছে এসএমই খাতে। আমরা যদি সত্যিকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করতে চাই, তাহলে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান কম করে হলেও ৬০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এসএমই খাতে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি। যারা আজকে সামান্য একটি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন, এসএমই প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে তারাই চাকরিদাতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।

এসএমই খাতে ঋণদানের ক্ষেত্রে অনেক দেশই জামানত প্রদানের সামর্থ্যরে চেয়ে উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব প্রদানের ফলে সেখানে ঋণ খেলাপির পরিমাণও সামান্য। আমাদের দেশে সবকিছুই রাজনৈতিক অথবা দলীয় বিবেচনায় বিচার করা হয়। ফলে বিনা সুদের ঋণ প্রদান করা হলে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃত উদ্যোক্তারা পান না। পান কোন দলীয় কর্মী বা আত্মীয়-স্বজন। এভাবে সব কিছুতেই দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হলে সেখানে আর যাই হোক সত্যিকার উন্নয়ন সম্ভব নয়।

দেশের যুবশক্তি হতে পারে জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রীয় বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর কারণ আমরা যুব সমাজকে জনশক্তিতে পরিণত করতে পারিনি। আর এ কারণেই তারা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছে না। যুব সমাজকে প্রশিক্ষিত জনশক্তিতে পরিণত করতে না পারার কারণে আমরা তাদের সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। প্রতিবছর আমাদের দেশ থেকে যে শ্রম শক্তি বিদেশে প্রেরণ করা হয়, তাদের বেশিরভাগই অপ্রশিক্ষিত। ফলে তারা বিদেশে গিয়ে তুলনামূলক স্বল্প মজুরি পায়। অথচ এদের কিছুটা প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো গেলে উপার্জনের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেত। বাংলাদেশ যুবশক্তির দিক থেকে অত্যন্ত সম্পদশালী। কিন্তু সেই সম্পদকে আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। আমরা যদি যুবশক্তিকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে পারি তাহলে তারা দেশের জন্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবে।

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪

২৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: