মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

২০১৪ ॥ মিশ্র অর্থনীতির বছর

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪
  • ড. আর এম দেবনাথ

দেখতে দেখতে ২০১৪ সাল শেষ হয়ে গেল। হিসাবে এই সালে পড়ে দুটো অর্থনৈতিক বছরÑঅর্ধেক, অর্ধেক। বড়ই ঝামেলার ব্যাপার। তথ্য পাওয়া যায় অর্থনৈতিক বছরের ভিত্তিতে। অথচ আলোচনাটা করতে হবে ক্যালেন্ডার বছর ধরে। অসুবিধে নেই। অর্থনৈতিক অবস্থা মানে, কৃষির অবস্থা কি ছিল? শিল্পের অবস্থা কি ছিল? আমদানি-রফতানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিটেন্সের অবস্থা কি ছিল? জিডিপি প্রবৃদ্ধি কেমন ঘটছে, মূল্যস্ফীতির অবস্থা কি? ইত্যাদিই মুখ্য বিষয়। আমার কাছে অবশ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সাধারণ মানুষের অবস্থা কি ছিল? এর একটা মানদ- হতে পারে মূল্যস্ফীতি। আমরা জানি, এই ‘বস্তুটি’ সাধারণ মানুষের শত্রু, মধ্যবিত্তের শত্রু। মূল্যস্ফীতি মানুষকে কাহিল করে ফেলে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়। অত্যন্ত আনন্দের কথা, বহুদিন পর মূল্যস্ফীতির হার এক অঙ্কে কেন, একেবারে ৬ শতাংশে নেমে আসে। এই হারটি ১০-১১ শতাংশে উঠেছিল। চারদিকে ছিল আতঙ্কের অবস্থা। ছয় শতাংশে নামাতে সাধারণ মানুষ বেশ কিছুটা স্বস্তি পায়।

বলা যায় ২০১৪ সালজুড়ে জিনিসপত্রের মূল্য স্থিতিশীল ছিল। খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্য স্থিতিশীল ছিল। চালের দাম স্থিতিশীল ছিল। গ্রামে-গঞ্জে মোটা চালের দাম ৩০-৩৫ টাকা কেজিতে স্থিতিশীল ছিল। ২০১৪ সালের বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে চৈত্রের মধ্যে বোরো, আউশ ও আমনের ফলন ভাল, খুবই ভাল হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের আমদানিযোগ্য পণ্যের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় দেশীয় বাজারে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। শাক- সবজি, ফুলমূল, মাছ-মাংসের দাম ছিল স্থিতিশীল। দ্রব্যমূল্যের নিরিখে বলা যায়, ২০১৪ সাল ছিল শান্তি ও স্বস্তির বছর। এই সালে, এমনকি রোজার মাসেও কোন দ্রব্যে মূল্য নিয়ে হৈচৈ হয়নি। আমাদের দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে জড়িত ডলারের মূল্য কারণ আমরা প্রায় জিনিসই আমদানি করে ব্যবহার ও ভোগ করি। তাই ডলারের মূল্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালে ডলারের মূল্য স্থিতিশীল ছিল। বলা যায়, কমতির দিকেই স্থিতিশীল ছিল।

ডলারের মূল্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত রেমিটেন্সের ভবিষ্যৎ। রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ‘লাইফলাইন।’ ২০১৪ সালে রেমিটেন্স সেভাবে টান পড়েনি। রেমিটেন্স যথারীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দা অব্যাহত থাকলেও রেমিটেন্সে বড় রকমের কোন ঘাটতি দেখা যায়নি। যদিও আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। রেমিটেন্স এবং রফতানির সঙ্গে জড়িত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের প্রশ্নটি। অবশ্য এটি কিছুটা নির্ভরশীল অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রাপ্তির ওপর। দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ সালে রেমিটেন্স বৃদ্ধি ও রফতানি বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভের পরিমাণ এখন পর্যন্ত আকাশচুম্বী। প্রতিমাসেই আগের মাসের রেকর্ড ভঙ্গ হচ্ছে। আমদানিজনিত চাপ অবশ্য কম একারণেও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে উল্লস্ফন ঘটছে। এখানে একটি বিষয় খুবই প্রণিধানযোগ্য। সাধারণভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ একটা সীমার বাইরে গেলে এর কুপ্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে। ধরা হয়ে থাকে ৩-৪ মাসের আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার থাকলেই যথেষ্ট। এখন আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ ৫-৬ মাসের আমদানির প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। তবু মূল্যস্ফীতি সীমার মধ্যে আছে। এটা আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের মূল্যহ্রাসর কারণে যেমন হচ্ছে, তেমনি হচ্ছে সংকোচনশীল মুদ্রানীতির কারণে। ২০১৪ সালে ব্যাংক সংকোচনশীল ঋণ নীতি অনুসরণ করে।

২০১৪ সালে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে খুব বড় ধরনের উত্থান-পতন ঘটেনি। একটি হিসাবে দেখা যায়, আলোচ্য বছরের জুলাই-নবেম্বর এই পাঁচ মাসে রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র দশমিক ৯২ শতাংশ হারে। আবার আমদানির পরিমাণ আরেকটি তথ্যে দেখা যায় ,জুলাই-অক্টোবর এই চার মাসের মধ্যে বেড়েছে প্রায় পনেরো শতাংশ। রফতানি কম অথচ বিপরীতে আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতির পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাই-অক্টোবরের মধ্যে এই ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৯২ শতাংশ। এদিকে দেখা যাচ্ছে, রফতানি খাতের প্রধান দ্রব্য পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই প্রবণতা ২০১৪ সাল জুড়েই ছিল। শুধু পোশাক খাতের শ্লথ গতিই নয়, একই রকম প্রবৃদ্ধির হার লক্ষ করা যাচ্ছে হিমায়িত মাছ, চামড়া, কাঁচা পাট ও ফার্নিচার রফতানির ক্ষেত্রেও। আগামী দিনগুলোতে এই অবস্থার উন্নতি না হলে রফতানির চিত্র বর্তমান অর্থবছরে (২০১৪-১৫) কি দাঁড়াবে তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়।

এদিকে সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে ধীরগতি। ২০১৪ সালের শেষ চার মাসে মোট বরাদ্দের মাত্র ১৩ শতাংশ খরচ করা হয়েছে। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হার বিগত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত অর্থবছরের একই সময়ে ‘এডিপি’ (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী) বাস্তবায়নের হার একই সময়ে ছিল ১৫ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী ৭১ শতাংশ বরাদ্দপ্রাপ্ত ৭টি মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নের হার আশাপ্রদ নয়।

গড় হিসাবে তারা মাসে যে ব্যয় করে তার চেয়েও কম ২০১৪ সালের চার মাসের ব্যয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) আমাদের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেকদিন যাবত বেসরকারী খাতের বিনিযোগ স্থবির হয়ে আছে। এর নানা কারণ। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব, অবকাঠামো সমস্যা, জমির দুষ্প্রাপ্যতাই প্রধান কারণ। বেসরকারী খাতের এই বিনিয়োগ স্থবিরতা বেশ কিছুটা ‘অফসেট’ করে সরকারী খাতের বিনিয়োগ। কিন্তু ২০১৪ সাল জুড়েই সরকারী খাতেও বিনিয়োগ স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এর কারণ অবশ্য ভিন্ন। সরকারের রাজস্ব আয় আশানুরূপ নয়। ভ্যাট আদায়, আয়কর আদায় এবং আমদানি শুল্ক ইত্যাদি সব খাতেই কম প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অবশ্য শুধুই টাকার অভাব নয়, পদ্ধতিগত ঝামেলাও সরকারী খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণ।

২০১৪ সালে বিদ্যুত সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। বিদ্যুতের দাম কত, সেটি অন্য বিষয়। দামের প্রশ্ন বাদে সরবরাহ প্রশ্নে কোন বিঘœ সৃষ্টি হয়নি। শহরাঞ্চল যেমন বিদ্যুত পেয়েছে, কৃষি খাতও পেয়েছে বিদ্যুত। একইভাবে গ্যাস খাতেও কোন বড় রকমের বিঘœ ঘটেনি। ২০১৪ সালে গ্যাসের মূল্যও বাড়েনি। ২০১৪ সালে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোলের দাম কমতে পারত। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এসবের দাম অনেক কমেছে। এর সুবিধা জনগণকে দেয়া যায়নি। এসব ভাল-মন্দ খবরের পাশাপাশি একটা সুখবর আছে। সেটা হচ্ছে শিল্প ঋণ সম্পর্কিত। ২০১৪ সালের শেষের দিকে এসে দেখা যাচ্ছে শিল্পঋণ বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বছরের শেষ তিন মাসে শিল্পঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। এটা নিঃসন্দেহে একটা আশাপ্রদ খবর। কারণ শিল্পঋণই হচ্ছে দেশের শিল্পায়নের নিয়ামক শক্তি। শিল্পঋণ তো এমনিতেই বাড়ে না। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বৃদ্ধি পেলেই শিল্পাঋণ বাড়ে। বছরের শেষ তিন মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে এই আমদানি বেড়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুত খাত, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্টিল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে। লক্ষণীয়, একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদী শিল্পঋণ ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে ওয়ার্কিং ক্যাপিট্যালের সরবরাহ। এই ক্ষেত্রে বৃদ্ধির পরিমাণ ৬০ শতাংশের ওপরে।

২০১৪ সালে অবশ্য ব্যবসাবাণিজ্যের খবর তত আশাপ্রদ নয়। খবর হচ্ছে যে, আমাদের ‘কর্পোরেট সেক্টর’ মাত্রাতিরিক্ত ঋণে জর্জরিত। তাদের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা নিঃশেষিত। ঋণ পুনঃতফসিলেও কোন কাজ হচ্ছে না। এখন অনেক বড় ব্যবসায়ী হাউজেরই প্রয়োজন হচ্ছে ঋণ পুনর্গঠনের। অনেক ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়েছে। শিল্প-বিল্ডিং, ব্যবসা, শিল্প-ব্রেকিং ব্যবসা, চিনির ব্যবসা, সয়াবিনের ব্যবসায় মন্দা চলছে। স্টিল মিলসের ব্যবসা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে বড়দের হাতে। ছোট ও মাঝারিরা হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। তুলা ও সুতার ব্যবসায় অস্থিরতা শুরু হয়েছে। আবাসন শিল্পের অবস্থা কি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই শিল্পের মন্দা অনেক দিনের। অনেকের ফ্ল্যাট ও জমি কেনার টাকা আছে। অজানা ভয়ে তারা ক্রয় থেকে বিরত। কি গ্রামে, কি শহরে আবাসন শিল্প ও জমির ব্যবসায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। গত সপ্তাহেরই খবরÑ বাংলাদেশের একটি বড় গুঁড়োদুধ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান জমির ব্যবসায় ঢুকে এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। আবাসন শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ক কমপক্ষে ৫০-৬০টি শিল্পের ভবিষ্যৎ যেমন : কাঠ, লোহা, বালু, সিমেট, ইস্পাত, ইট, গ্লাস ইত্যাদি থেকে শুরু করে রং, বৈদ্যুতিক সাজ সরঞ্জামদি। সর্বোপরি এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান। অতএব ২০১৪ সাল জুড়ে আবাসন শিল্পের মন্দা অনেক শিল্পকে কাহিল করে ফেলেছে। বড়বড় মলে ও শপিং সেন্টারে খুচরা বিক্রয় হ্রাস পেয়েছে বলে ওদের সংগঠন দাবি করেছে। এসব খবর দেখেশুনে মনে হচ্ছে, ২০১৪ সালটি ছিল মিশ্রজাতের বছর। একে বলা যায় গোধূলির মতো অবস্থা, যার থেকে ২০১৫ সালের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করা খুবই কঠিন। তবু এরই মধ্যে আশা করা হচ্ছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ওপরেই হবে।

সাবেক প্রফেসর, বিআইবিএম

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪

২৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: