আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ক্যাম্পাসে প্রথম দিন

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪
ক্যাম্পাসে প্রথম দিন
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জুয়েল রানা। পড়ছেন ফাইন্যান্স বিভাগে। থাকছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। ঝিনাইদহ থেকে পড়তে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাক্সিক্ষত বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় তার আনন্দ যেন আকাশছোঁয়া। ক্যাম্পাসের প্রথম দিনের অনুভূতি কেমন ছিল? এমন প্রশ্নে হাসিমাখা মুখে সোজা উত্তর, এর চেয়ে বড় আনন্দের দিন আর হয় না। এরপর একটানা বলতে থাকলেন জুয়েল, কলেজে থাকতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকবার ঘুরেছি। কিন্তু এই ক্যাম্পাসে ভর্তির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে ক্লাস করতে যাওয়ার দিনটিকে ভুলতে পারব না কোন দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের ক্যাম্পাস ভাবতে পারার অনুভূতিটা বলে বোঝাতে পারব না। তবে ওইদিনে বিভাগের শিক্ষক মোসাররফ হোসেন স্যারের একটি কথা মনে হয় সারা জীবন মনে থাকবে। স্যার বলেছিলেন, ‘জীবনে যত বাধাই আসুক না কেন মনে বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। তাহলে সাফল্য নিশ্চিত। মনে রাখবে, এখানে ভাল শিক্ষার্থীরা ভর্তি হলেও শেষে অনেকেই ঝরে যায়।’

সাগর সাহরিয়ার। পড়ছেন আইন বিভাগে। গ্রামের বাড়ি যশোর। ক্যাম্পাসের প্রথম দিনটি কেমন ছিল? জানতে চাওয়া মাত্র উত্তর, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিনের অনুভূতির সঙ্গে ‘ঢাকা শহর’ নামটি জড়িয়ে আছে আমার স্মৃতিতে। কারণ, আমি ছিলাম ফার্মগেটে বড় ভাইয়ের বাসায়। ফার্মগেট থেকে বাসে ওঠার পর যানজটের শহরের চিত্র ফুটে উঠল সামনে। কারওয়ান বাজার ও বাংলামোটরের জট কাটতেই পার হয়ে যায় অনেকটা সময়। শেষে শাহবাগে নেমে রিকশাযোগে চলে যাই কাজী মোতাহার হোসেন ভবনের ১০১ নম্বর কক্ষে। সেখানে গিয়ে আমার ভাবনার জগত যেন সীমানা ছাড়িয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষার্থী আমি। নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য এই প্রশ্নটি করি। নয়-ছয় ভাবতে ভাবতেই ক্লাসে গিয়ে বসি। আমার পাশেই ছিল নওশীন জোয়ারদার। আমার ব্যাগে পানি দেখে প্রথম বন্ধু হয়ে হাত বাড়াল পানির আশায়। উষ্ণ আবেশে তার হাতে তুলে দিলাম হৃদয় শীতল করা পানির বোতলটি। হয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বন্ধু। এভাবেই বলে যাচ্ছিলেন সাগর। তবে ওইদিন ডিন ম্যাম তাসলিমা মনসুরের একটি কথা জীবনে ভুলতে পারব না। আমাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম দায়িত্ব হলো আইনকে সংরক্ষণ করা।’ ক্যাম্পাস জীবনের এভাবেই প্রথম দিনের স্মৃতির কয়েকটি পাতা পড়ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী সাগর।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ইমদাদুল হক সোহাগ। পড়ছেন হিসাববিজ্ঞান বিভাগে। গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা। বর্তমানে থাকছেন রাজশাহী নগরীতে একটি মেসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনটি বিশাল ক্যাম্পাস হওয়ায় আমার আনন্দ ছিল অনেক অনেক বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রকলা ভবনের ১১৯ নম্বর কক্ষে ছিল আমার ক্যাম্পাসের প্রথম ক্লাস। ওইদিন সবাই সবার সঙ্গে পরিচয় হচ্ছিলাম। পাশে থাকায় খুব তাড়াতাড়ি কথা হয়ে যায় মাগুরার শাহজাহান, ঝিনাইদহের ফয়সাল ও কুড়িগ্রামের আসাদের সঙ্গে। এরপর থেকেই তারা আমার বিভাগে এখন ভাল বন্ধুও বটে। তাই প্রথম দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করার পাশাপাশি নতুন কারও বন্ধু হওয়ার মজাটাও কম ছিল না। এভাবেই ক্যাম্পাসের প্রথম দিনের কথাগুলো বলছিলেন সোহাগ।

তবে ওই দিনে আবদুল্লাহ আল হারুন ও শাহেজ্জামান স্যারের কিছু উপদেশ কখনও ভুলতে পারব না। রোকসানা ম্যামের উপস্থাপনায় বিশ্বদ্যিালয়ের প্রথম দিনটি ছিল সত্যিই অনেক আনন্দের।

রবিউল ইসলাম তুষার। পড়ছেন আইন বিভাগে। বাসা বগুড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার প্রথম দিনটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তুষার জানান, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পাওয়ায় মনে হচ্ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। তবে বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলাম না। এত কষ্ট করে পড়াশোনা করা, মনে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন লালন করে ভর্তি হব জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে? শেষ পর্যন্ত ভাগ্যে জোটে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ। এতে আমি খুব খুশি। সঙ্গে আমার পরিবারের সদস্যরাও। তাই স্বভাবতই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিনের ক্লাস আমার কাছে একটু ভিন্ন আনন্দ বয়ে এনেছিল এটা আর বলে বোঝাতে হবে না নিশ্চয়। আইন বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে প্রথম ক্লাসে যাই বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর থেকে। রবীন্দ্রকলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে হয় আমাদের প্রথম পরিচিতিমূলক ক্লাস। অফিস সহকারীদের সহায়তায় ভবনে আমাদের ক্লাসটি চিনতে ওইদিন কষ্ট হয়নি বলছিলেন তুষার। তবে এনামুল জহির স্যারের একটি কথা প্রথম দিন থেকেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমায়। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রথম বর্ষকে হেলায় কাটিও না।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মনিরুজ্জামান বাবু। পড়ছেন ফাইন্যান্স এ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে। ক্যাম্পাসের প্রথম দিনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে খোলামেলা উত্তর, যশোরে গ্রামের বাড়ি থেকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেই পাহাড়ে ঘেরা এই ক্যাম্পাসের প্রেমে পড়ে যাই।

ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ (এফবিএ) ভবনের চতুর্থ তলায় প্রথম ক্লাস করতে সকাল ১০টায় যখন কটেজ থেকে বের হই তখন থেকেই যেন আনন্দ পিছু হটছিল না। এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম অনেক দিন থেকে। ক্লাসে গিয়ে বসার সঙ্গে সঙ্গেই মনের মাঝে আনন্দময় একটি ভাবনা উঁকি দিল, আমি আজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আর কলেজে পড়ি না। এটা ভাবতে অনেক ভাল লেগেছিল। যা বলে বোঝাতে পারব না।

প্রথম দিনে তানভির মোহম্মদ হায়দার স্যারের একটি কথা আমি কখনও মন থেকে সরাতে পারব না। তিনি বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ হলো ঘোড়ার মতো, আর আমেরিকানরা বানরের মতো। কারণ, আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়।’ এখনও কাজে হাঁপিয়ে গেলে স্যারের সেই কথাটি মনে করে সামনে চলার সাহস পাই।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

শারমীন আক্তার। পড়ছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাট। এখন থাকছেন রংপুরের খামারমোড় এলাকায় মৌ ছাত্রীনিবাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর প্রথম দিনটি কেমন ছিল? জানতে চেয়েছিলাম তার কাছে। একেবারে সোজা-সাপটাভাবে বলতে থাকেন শারমীন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করাটা আমার কাছে ছিল স্বর্গসুখের মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনটির জন্য অনেক রাত ঘুম আসেনি আমার। ভর্তির পর যখন বাসায় ছিলাম তখন আম্মুকে বার বার বলতাম, আমার ক্লাস কবে শুরু হবে? কবে আমি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে পারব? আরও কত কি। ক্যাম্পাসের প্রথম দিনটি আমার কাছে আনন্দ ও দুঃখের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে। কারণ, আমি প্রথমে ভর্তি হই উইম্যান এ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিস বিভাগে। সকাল ১৯টায় প্রথম ক্লাস করতে যাওয়ার আগে মেসের বড় আপুকে খুব করে বলেছিলাম আমাকে ক্যাম্পাসে নিয়ে যেতে। কিন্তু তার পরীক্ষা থাকায় আমাকে সময় দিতে পারেননি। তারপর মনে উষ্ণতা ও বাইরে কিছুটা ভয় নিয়ে মেসের সামনে থেকে অটোরিকশায় একাই ক্যাম্পাসে যাই। হায়াৎ মাহমুদ ভবনের ৩০৪ নম্বর কক্ষে বসে শেষ করি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই স্বপ্নময় ক্লাস। এরপর বাইরে এসে বিভাগের নোটিস বোর্ডে দেখি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে আমার মাইগ্রেশন হয়ে গেছে। অথচ আমি ক্লাস করলাম উইম্যান এ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিস বিভাগে! বলতে বলতে মৃদু কণ্ঠে হাসছিলেন শারমীন।

এরপর সোজা চলে যাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। সেখানে ১২টা থেকে শুরু হয় প্রথম ক্লাস। যদিও আমার জীবনে ওটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় ক্লাস। তবে বিভাগের হল রুমে ওই দিনের ক্লাসে আমার দুঃখ হলো দেরিতে বিভাগে যাওয়ার কারণে সবার মতো আমি ফুল পাইনি। এই দুঃখ আমার সারা জীবন থাকবে বলেই মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে কথা শেষ করে শারমীন।

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪

২৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: