মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

গাজীপুরে টেস্ট কেসও ব্যর্থ ॥ বিএনপির পিঠটানে শাসক দল উজ্জীবিত

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪
  • জনমনে স্বস্তি
  • হরতাল ডেকেই আত্মপ্রসাদ লাভের চেষ্টা বিএনপির

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ব্যর্থতার বেড়াজাল থেকে বের হতেই পারছেন না খালেদা জিয়া। গাজীপুরে জনসভা করতে না পেরে বিএনপির ললাটে ফের ব্যর্থতার চিত্রই যেন নতুন করে আঁকলেন তিনি। সপ্তাহজুড়ে হুঙ্কার-হুমকি দেয়ার পর শুধু ছাত্রলীগের প্রতিরোধের ঘোষণায় বিএনপির মাঠ ছেড়ে পিছুটানের ঘটনায় দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে যেমন হতাশার সৃষ্টি করেছে তেমনি সরকারী শিবিরে মিলেছে স্বস্তি। অতীতের মতোই বিএনপির রাজনৈতিক পরাজয় আর ‘ব্যাকফুটে’ যাওয়ার ঘটনায় উজ্জীবিত করে তুলেছে শাসক দলের নেতাকর্মীকে। তারা এটিকে সরকারের বর্ষপূতির আগে আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপির আরেকটি রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবেই দেখতে চাইছে।

কার্যত গাজীপুরের ঘটনায় আবারও হতাশ বিএনপি, উল্লসিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। উৎকণ্ঠা ছাপিয়ে স্বস্তিতে দেশের মানুষ। আর বিএনপির ব্যর্থতার ইতিহাস ক্ষমতাসীনদের এক বছর না হতেই দেশবাসীকে নতুন করে ফের মনে করে দিয়েছে। নির্বাচনের আগে মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি কর্মসূচীর নামে আন্দোলনে ঢাকাসহ দেশবাসীকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। কিন্তু তার ডাকে সে সময় দেশবাসী কেন, নিজ দলের নেতাকর্মীদেরই রাজপথে দেখা মেলেনি। সেই ব্যর্থতার বর্ষপূর্তির একদিন আগে যেকোন মূল্যে গাজীপুরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

তবে গ্রেফতারের আতঙ্কে দলটির অধিকাংশ নেতার আত্মগোপন আর ছাত্রলীগের প্রতিরোধের হুমকির মুখে শেষ পর্যন্ত গাজীপুরে না গিয়েই নামকাওয়াস্তে ওই জেলায় হরতাল ডেকেই মাঠ ত্যাগ করে কার্যত আরেকটি পরাজয় মেনে নেন বিএনপির চেয়ারপার্সন। আওয়ামী লীগের একটি ছাত্র সংগঠনের কাছে খালেদা জিয়া ও বিএনপির এমন আত্মসমর্পণ ঘটনা দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীর মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে। তবে ব্যর্থতা ঢাকতে আগামীকাল সোমবার আবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি। গাজীপুরে ডাকা হরতালের মাঠে বিএনপির কোন নেতাকর্মীকে দেখা যায়নি। গাজীপুর ছেড়ে সব স্থানীয় নেতাই এখন ঢাকায়, কেউবা আত্মগোপনে। তাই ব্যর্থতা ঢাকতে আগামী সোমবারের হরতালেও বিএনপি যে তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারবে না, তা এখন দেশবাসীর সামনে অনেকটাই স্পষ্ট।

শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের প্রতিরোধের হুমকির মুখে হঠাৎ করেই কেন বিএনপির এই ‘ইউটার্ন; এ নিয়ে রাজনীতির মাঠে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। আর গাজীপুরের ঘটনায় মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য খোদ বিএনপির শিবিরেই তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। শুক্রবার সকালেও প্রেসব্রিফিং করে মির্জা ফখরুল হুঙ্কার দিয়েই বলেছিলেন, গাজীপুরে জনসভা করার জন্য খালেদা জিয়াসহ আমরা অবশ্যই যাব। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ নিশ্চিত করা। বিএনপির নেত্রীর গুলশান কার্যালয় থেকেও সকালে বলা হয় গাজীপুরে যেতে ‘ম্যাডাম’ প্রস্তুত।

কিন্তু ছাত্রলীগের প্রতিরোধের হুমকির মুখে ১২ ঘণ্টা না যেতেই রাতেই সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে মাঠ ছাড়ার ঘোষণা দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম গাজীপুরে যাব। কিন্তু সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য জনসভাস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করেছে, জনসভা বানচাল করতে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই আমরা নির্ধারিত জনসভা স্থগিত করে গাজীপুরে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচী ঘোষণা করছি। তবে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকটি সূত্রই নিশ্চিত করেছে, পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে গাজীপুরে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে শনিবার জনসভা করতে গেলে দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এটি বুঝতে পেরেই শুক্রবার রাত আটটার দিকে খালেদা জিয়া দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে কর্মসূচী স্থগিতের নির্দেশ দেন। আর শনিবার হরতাল ডেকেও গাজীপুরে বিএনপির নেতাকর্মীদের রাজপথে দেখা যায়নি।

এদিকে গাজীপুরের ঘটনায় শাসক দল আওয়ামী লীগ শিবিরে স্বস্তি ও উল্লসিত মনোভাব দেখা গেছে। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার মতে, বিএনপি যে ‘কাগুজে আন্দোলনের দল’, তা আবারও প্রমাণিত। নীতিহীন, সুবিধাবাদী ও আদর্শহীন নেতাকর্মী নিয়ে গঠিত বিএনপির যে আন্দোলন করার কোনই সামর্থ্য বা সাংগঠনিক শক্তি নেই সেটিও দেশবাসীর সামনে প্রকাশ পেয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া অন্তত ১০ বার সরকার পতনের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। কিন্তু তার ডাকে দেশের মানুষের সাড়া দেয়া তো দূরের কথা, নিজেদের নেতাকর্মীকেই মাঠে নামাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। আওয়ামী লীগের কৌশল, রাজনীতি আর সাংগঠনিক শক্তির কাছে আগেও বিএনপি কোনদিন দাঁড়াতে পারেনি, আগামীতেও পারবে না।

আগামীতেও খালেদা জিয়ার জনসভা প্রতিরোধ করা হবে কিনা জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা প্রতিরোধ বলতে চাই না। গাজীপুর ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচী দিয়েছিলাম। এখন আমরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচী সফল করার কাজে ব্যস্ত। তবে বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে দুর্নীতিবাজ তারেক জিয়া জাতির অস্তিত্বে আঘাত হেনেছে। তাই তারেক জিয়া জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচী অব্যাহত থাকবে।

এদিকে যেকোনো মূল্যে গাজীপুরে জনসভা করার ঘোষণা দিয়ে পিছু হঠার কারণ জানতে চাইলে বিএনপির একটি উচ্চ পর্যায়ের সূত্র জানায়, বকশীবাজারে অনেক প্রস্তুতি নিয়েও ১০ হাজার নেতাকর্মীকে জড়ো করা সম্ভব হয়নি। ছাত্রলীগের একটি অংশের প্রতিরোধে সবাইকে পিছু হটতে হয়েছে। আর গাজীপুরের ঘটনায় ছাত্রলীগের পাশাপাশি প্রশাসনও যেমনভাবে হার্ডলাইনে অবস্থান নিয়েছে তাতে খালেদা জিয়া সব বাধা উপেক্ষা করে রওনা হলেও জনসমাগম আদৌ হতো কিনা, এ আশঙ্কা-সন্দেহ থেকেই গাজীপুর যাত্রা স্থগিত করা হয়েছে। আর ৫ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত বিএনপি কোন সহিংসতায় যেতে চায় না বলেই এমন সিদ্ধান্ত এসেছে।

বিএনপি নেতাদের এমন যুক্তি মানতে নারাজ বিএনপির মাঠের নেতারা। তাদের মতে, প্রশাসন থেকে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারী কলেজ মাঠ এবং এর আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। ইচ্ছা করলে গাজীপুরের আগে টঙ্গীতে অথবা যাত্রাপথের যেকোন জায়গায় জনসভার চেষ্টা করতে পারতেন খালেদা জিয়া। জনসভা করতে না পারলেও ঢাকা থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে খালেদা জিয়া রওনা দিলে স্থানীয় নেতাকর্মীর মধ্যে যেমন উৎসাহ-উদ্দীপনা বাড়ত তেমনি সারাদেশের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অন্যরকম এক মেসেজ যেত। সরকার ও প্রশাসনও চাপে থাকত। কিন্তু কিছুই না করে হরতাল ডেকেই সিনিয়র নেতাদের আত্মগোপনে যাওয়ার ঘটনা কার্যত খালেদা জিয়া আরেকটি পরাজয়ই মেনে নিলেন।

আগামী ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় নির্বাচনের বছরপূর্তি হচ্ছে। ঘটা করেই বিএনপির তরফে জানুয়ারি থেকেই দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতনের হুমকি দেয়া হয়েছে বেশ ক’বার। হুমকির অংশ হিসেবে টেস্ট কেস হিসেবে রাজধানীর বকশীবাজারকেই বেছে নিয়েছিল বিএনপি। সেখানে ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় টেস্ট কেস হিসেবে গাজীপুর বেছে নিয়েছিল তারা। বছরের শেষ কর্মসূচী গাজীপুর জনসভা থেকে সরকারবিরোধী বড় ধরনের আন্দোলনের কর্মসূচীর ডাক দেবেন খালেদা জিয়া- বিএনপি থেকে এমন প্রচার ছিল গত এক সপ্তাহ ধরেই। দেশবাসীর দৃষ্টিও ছিল তাই গাজীপুরের দিকে। কিন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেয়া আপত্তিকর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ ছাত্রলীগের কঠোর অবস্থান আর বিএনপির পলায়নপর রাজনীতির কারণে বছরের শেষটাও ভাল গেল না খালেদা জিয়ার।

রাজধানীর বকশীবাজার এবং গাজীপুরের ‘টেস্ট কেস’ ব্যর্থ হওয়ায় বিএনপির দৃষ্টি এখন ৫ জানুয়ারি। কিন্তু শাসক দল আওয়ামী লীগ আগেই ঘোষণা দিয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকেই রাজপথ দখলে রাখবে আওয়ামী লীগ। ৫ জানুয়ারি রাজধানীসহ দেশের ৩শ’ আসন এলাকায়ই বড় ধরনের শোডাউন করবে তারা। আওয়ামী লীগের এমন ব্যাপক প্রস্তুতি আর বার বার রাজনৈতিক কৌশলে পরাজিত বিএনপি কিভাবে ৫ জানুয়ারি মোকাবেলা করবে, তা নিয়ে দলটির হাইকমান্ড বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। জানা গেছে, দলটির নীতিনির্ধারক নেতারা অনেকটা অসহায় অবস্থাতেই জানান দিচ্ছেন যে, ৫ জানুয়ারি সবচেয়ে সহজ কর্মসূচী হরতাল আহ্বান ছাড়া তাদের সামনে এখন কোন বিকল্প পথ নেই। এখন সেদিকেই হাঁটতে চাইছে বিএনপি।

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪

২৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: