কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

একটানা ২৮ দিন যুদ্ধের পর বরিশালে পাক হানাদাররা আত্মসমর্পণ করে

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল থেকে ॥ মুক্তিযুদ্ধের মুজিব বাহিনী ও নিজাম বাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে জেলার গৌরনদী কলেজের পাক সেনাদের ক্যাম্পে আক্রমণের পর টানা ২৮ দিন যুদ্ধ শেষে পাক সেনারা পরাস্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর গৌরনদী কলেজে অবস্থানরত পাক সেনারা মিত্র বাহিনীর মেজর ডিসি দাসের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এরপরেই বিজয় পতাকা উড়েছিল গৌরনদী।

এতদাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বুলেট ছিন্টু জানান, ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাক সেনারা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক দিয়ে এ জনপদে প্রবেশের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তাদের প্রবেশের খবর শুনে গৌরনদীর স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীরা সাউদেরখালপাড় নামকস্থানে পাক সেনাদের প্রতিহত করার জন্য অবস্থান নেয়। হানাদাররা সেখানে পৌঁছলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সেদিন পাক সেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে প্রথম শহীদ হন গৌরনদীর নাঠৈ গ্রামের সৈয়দ আবুল হাসেম, চাঁদশীর পরিমল ম-ল, গৈলার আলাউদ্দিন ওরফে আলা বক্স ও বাটাজোরের মোক্তার হোসেন হাওলাদার। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে সেদিন আটজন পাক সেনা নিহত হয়েছিল। এটাই ছিল বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে স্থলপথে প্রথম যুদ্ধ এবং এরাই হচ্ছেন প্রথম শহীদ।

পাক সেনারা গৌরনদীতে প্রবেশের দ্বার মুখ খাঞ্জাপুর নামকস্থানে মোস্তান নামক এক পাগলকে গুলি করে হত্যা করেছিল। ২৫ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটজন পাক সেনা নিহত হবার পর তারা ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। ওই নরপশুদের গুলিতে সেইদিন দু’শতাধিক নিরীহ গ্রামবাসী মারা যায়। হানাদাররা গৌরনদী বন্দরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার শত শত ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছিল। মে মাসের প্রথম দিকে পাক বাহিনী গৌরনদী কলেজে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে। ক্যাম্পে ছিল আড়াই শতাধিক সৈন্য ও স্থানীয় অর্ধশত রাজাকার-আলবদর। গৌরনদীর বাটাজোর, ভুরঘাটা, মাহিলাড়া, আশোকাঠী, কসবাসহ প্রতিটি ব্রিজে পাক মিলিটারিদের ব্যাংকার ছিল। উত্তরে ভুরঘাটা, দক্ষিণে উজিরপুরের শিকারপুর, পশ্চিমে আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট, পূর্বে মুলাদী পর্যন্ত গৌরনদী কলেজ ক্যাম্পের পাক সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাদের দোসর ছিল এলাকার রাজাকার, আলবদর ও পিস কমিটির সদস্যরা। হত্যাকা-, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণসহ নানা কাজে এরা পাক সেনাদের সহযোগিতা করত। পাক সেনারা গৌরনদী কলেজের উত্তর পার্শ্বে একটি কূপ তৈরি করে সেখানে লাশ ফেলত। কলেজের উত্তর পার্শ্বে হাতেম পিয়নের বাড়ির খালপাড়ের ঘাটলায় মানুষ জবাই করে খালের পানিতে শত শত লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে। পাক সেনারা গৌরনদী গার্লস হাইস্কুলের পার্শ্ববর্তী পুল ও গয়নাঘাটা ব্রিজের ওপর বসে শত শত লোক ধরে এনে হত্যা করে লাশ খালে ফেলে দিয়েছে।সেইদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা গেছে, গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার ইতিহাসে সবচেয়ে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল ’৭১ সালের ১৫ মে। ১৪ মে দোনারকান্দিতে চিত্ত বল্লভের নেতৃত্বে স্থানীয় লোকজন ঢাল সড়কি নিয়ে পাক হানাদারদের মুখোমুখি ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ৪ পাক সেনাকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় শতাধিক পাক সেনা ক্ষিপ্ত হয়ে কসবার হযরত মল্লিক দূত কুমার পীর সাহেবের মাজার সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে চাঁদশী হয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে জনতার ওপর এলএমজির ব্রাশ ফায়ার করে পাখির মতো মানুষ মারতে থাকে।

পাক সেনাদের ভয়ে আশপাশের ৭/৮টি গ্রামের ৪ থেকে ৫ হাজার মানুষ সেদিন এদিক সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। রাংতার উত্তর পাশের সুবিশাল কেতনার বিলের ধান ও পাট ক্ষেতের মধ্যে আশ্রয় নিতে এসে পাক বাহিনীর গুলিতে ওইদিন ৫ শতাধিক নিরীহ গ্রামবাসী প্রাণ হারায়। নরপশুদের কবল থেকে সেদিন পশুরাও রেহাই পায়নি। শত শত ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ফলে বহু গরু-ছাগল ও হাঁস মুরগি মারা যায়। ওই বছরের ২ আষাঢ় আগৈলঝাড়ার কোদালধোঁয়া নামকস্থানে দি রয়েল বেঙ্গল সার্কাসের মালিক লক্ষণ দাস ও তার একটি পোষা হাতিকে পাক সেনারা একসঙ্গে গুলি করে হত্যা করে। পাক সেনারা এলাকায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাঁচ সহস্রাধিক নিরীহ জনসাধারনকে হত্যা ও তিন শতাধিক মা-বোনের ইজ্জত হরণ করে। জুলাই মাসে মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সেক্টরের গ্রুপ কমান্ডার নিজাম উদ্দিন আকন ও তার বাহিনীর নেতৃত্বে গৌরনদীর বাটাজোরে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে ১০ পাক সেনা মারা যায় এবং ৪ জন ধরা পড়ে। পাক সেনাদের গতিরোধ করার জন্য গ্রুপ কমান্ডার নিজামের নেতৃত্বে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের আশোকাঠী বাসস্ট্যান্ডের ব্রিজটি মুক্তিযোদ্ধারা ভেঙ্গে দিয়েছিল অক্টোবর মাসের শেষের দিকে। এর কিছুদিন পর নিজামের নেতৃত্বে হোসনাবাদে পাক বাহিনীর অস্ত্র ও মালবাহী বোটে হামলা চালিয়ে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছিল মুক্তিবাহিনী। ওইদিন যুদ্ধে প্রায় ২৫ পাকসেনা মারা যায়। ৯নং সেক্টরের গ্রুপ কমান্ডার নিজাম উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত নিজাম বাহিনীর সহকারী কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন বাদশা হাওলাদার, কুতুব উদ্দিন, তাহের কমান্ডার, হামেদ কমান্ডার ও আলাউদ্দিন মিয়া। নিজাম উদ্দিন কৃতিত্বের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯নং সেক্টরের গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

গৌরনদীর কসবায় আল্লাহর মসজিদের নিকট ২৭ নবেম্বর পাক বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ছাত্তার কমান্ডার গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। পরেরদিন একই স্থানে দক্ষিণ চাঁদশীর আলতাফ হোসেন শহীদ হন। গৌরনদী-আগৈলঝাড়া এলাকার কৃষক শ্রমিক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত (সাবেক মন্ত্রী) ও আ. করিম সরদার (সাবেক এমএলএ) সর্বপ্রথম স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেন। ওই দলের প্রধান ছিলেন গৈলার মতি তালুকদার।

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

২৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: