মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

রাজশাহীর ৪২ শহীদ জায়া একাত্তরে হারিয়েছে সর্বস্ব

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • ৪৩ বছরেও শহীদের স্বীকৃতি মেলেনি

মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী থেকে ॥ গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ৪৩তম উৎসব পালিত হয়েছে দেশজুড়ে। যাদের রক্তে দেশের এ বিজয় তাদের অনেকের আজও মেলেনি সামান্য স্বীকৃতিটুকুও। নাম না জানা হাজারো শহীদ বীরদের স্ত্রীরা আজও জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন চরম অবহেলায়। কেউ খোঁজ পর্যন্ত রাখে না। এমনই অবহেলিত ৪২ বীর শহীদের স্ত্রীর সন্ধান মিলেছে রাজশাহীর দুর্গাপুরে। এখন এ বীর শহীদ জায়াদের জীবন কাটছে ভিক্ষে করে।

এ শহীদ জায়ারা রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার যুগীশো পালশা গ্রামের। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ওই গ্রামের হিন্দু পল্লী থেকে স্থানীয় রাজাকারের সহযোগিতায় পাক বাহিনীর সদস্যরা ৪২ জনকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এরপর বিধবা হয় ৪২ নারী। তখন যৌবন ছিল তাদের। বয়সের ভারে এখন তারা ন্যূব্জ। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সময় অনেক পেরিয়েছে। অনেক কিছু বদলে গেছে। কিন্তু বদলায়নি ওই ৪২ পরিবারের ভাগ্য।

যুদ্ধে বাড়ির অভিভাবকদের হারিয়ে পরিবারগুলো হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ। তারা যে কূল হারিয়েছে স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরে আর তা খুঁজে পায়নি। বিধবা ৪২ নারীর মধ্যে জীবিত ৩৫ জনের সবাই ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে।

সম্প্রতি গিয়ে দেখা মেলে শীতের সকালে যুগীশো গ্রামের হিন্দু পল্লীর ৭/৮ জন নারীর দল সাদা কাপড় পরে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। সবার বয়স ৬০ থেকে ৮০’র কাছাকাছি। কাছে গিয়ে জানা গেল তারা সবাই ভিক্ষা করার জন্য বের হয়েছেন। এই দলের একজনের নাম নিয়তি বালা দাস। বয়স ৮০র কাছাকাছি। এই বয়সে ভিক্ষা করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় তার স্বামী বিভারণ চন্দ্র প্রামাণিককে নির্মমভাবে হত্যা করেছে পাক-হানাদার বাহিনী। সে থেকে তাদের পরিবারে শনির দশা নেমে আসে। পরিবারের ঘানি টানতে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির পথই বেছে নিতে হয়েছে তাকে।

নিয়তি বালা দাসের চামড়া জড়ানো চোখের কোণে জল লক্ষ্য করা গেল। কিছুক্ষণ চেষ্টা করলেন কান্না থামানোর। কিন্তু পারলেন না। অবশেষে কাঁদতে লাগলেন। তিনি মাঠের মধ্যেই মাটিতে বসে পড়েন। তার সঙ্গী ছিলেন শহীদ শিতল দাসের স্ত্রী পঞ্চমী দাস (৭২), শহীদ নগেন চন্দ্র দাসের স্ত্রী সুধাংশু বালা (৭০), শহীদ ঘেতন চন্দ্র দাসের স্ত্রী সুশীলা বালা (৭১), শহীদ বিভারণ চন্দ্র দাসের স্ত্রী নিয়তি বালা (৬৮), শহীদ নিবারণ চন্দ্র দাসের স্ত্রী সুন্দরী দাস (৭০), শহীদ শ্রীকান্ত দাসের স্ত্রী তরু বালা (৭২), শহীদ যোগেন্দ্র নাথের স্ত্রী অনন্ত বালা (৬৯), শহীদ যদুনাথ চন্দ্র দাসের স্ত্রী প্রমীলা দেবী (৬৬) ও নগেন্দ্র নাথ কর্মকারের স্ত্রী যমুনা বালা কর্মকার। তারাও নিয়তি বালার সঙ্গে বসে পড়লেন।

নিয়তি বালা দাস ১৯৭১ সালের কথা বলতে না পারলেও বাংলা সালের হিসেবে ১৩৭৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর সে দিনের সে নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা স্মরণে রেখেছেন। ওইদিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, সেদিনের কথা কি আর ভুলা যায় ক্যা। দিনটি আছিল অবিবার (রবিবার)। সূর্য মাথার ওপরে উঠিছে এ সময় দুইটি গাড়িতে পাক বাহিনী গাঁয়ে (গ্রামে) ঢুকি পড়ে। পাক বাহিনীর গাড়িতে সেদিন ছিল বখতিয়ারপুর গাঁয়ের পিস কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সরকার। সেদিন আজিজ সরকারের নির্দেশে আমাদের গাঁয়ের মানুষকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় বাঁশ ঝাড়ের কাছে। নিয়তি বালা বলেন, বাঁশ ঝাড়ের কাছে নিয়ে গিয়ে মাটির দিকে মুখ করে শুইয়ে দেয়া হয় ওই ৪২ জনকে। এরপরে চলে বুট আর বেয়োনেট দিয়ে নির্যাতন। এভাবে কিছুক্ষণ নির্যাতন করার পরে ব্রাশফায়ার করে ৪২ জনকেই হত্যা করা হয়। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাক বাহিনী চলে গেলেও বখতিয়ারপুর গ্রামের পিস কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সরকারের নেতৃত্বে সেদিন সমস্ত হিন্দু পল্লীতে আগুন ধরিয়ে লুটপাট চালানো হয়। যারা বেঁচে ছিল তারা প্রাণ বাঁচাতে ওই রাতেই ভারতে পালিয়ে যায়।

ঘটনার দিনের ভয়াবহতা বর্ণনা দিতে গিয়ে তারা জানান, যতীন্দ্র নাথ নামে তার একজন আত্মীয় আছে। তার ৯ বছরের এক ছেলে ছিল। সেই ছেলেকে রেখে যতীন্দ্র নাথ কিছুতেই পাক বাহিনীর সঙ্গে যেতে চাইছিলেন না। ছেলেটাও যতীনের লুঙ্গি টেনে ধরছিলেন পেছন থেকে। এ দৃশ্য দেখে পাক বাহিনীর কয়েকজন সদস্য রেগে গিয়ে ৯ বছর বয়সী ছেলেকে গুলি করে যতীনকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যায়।

স্বাধীনতার পরে তারা দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু এসে দেখা যায় কোন কিছুই তাদের নেই। বাড়ি-ঘর সব খোলা মাঠ হয়ে গেছে। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল যা ছিল সব লুটপাট করা হয়েছে। ফসলী জমি দখল হয়ে গেছে। কোন রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করে তখন থেকে ভিক্ষা করে সংসার পার করতে হচ্ছে তাদের।

শহীদ শিতল দাসের স্ত্রী পঞ্চমী দাস অভিযোগ করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বামীদের এভাবে হত্যা করা হলেও আজও মেলেনি শহীদের স্বীকৃতি। এমনকি যুদ্ধপরবর্তী সময়ে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবনধারণের জন্য দেয়া হয়নি সরকারী কোন অনুদান। তাই বাধ্য হয়ে জীবন জীবিকার তাগিদে ও পরিবারের সদস্যদের মুখে দুই বেলা দুই মুঠো ভাত তুলে দিতেই ভিক্ষা করছি। তবে এ শেষ বয়সে এসে আর ভিক্ষাবৃত্তি করতে চান না নিয়তি বালা কিংবা পঞ্চমী দাসরা। তাদের দাবিÑ বর্তমান সরকার তাদের জন্য না হলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবেন এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

২৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: