পরিষ্কার, তাপমাত্রা ১৭.৮ °C
 
২২ জানুয়ারী ২০১৭, ৯ মাঘ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের একজন অভিভাবক

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের  একজন অভিভাবক
  • ইব্রাহিম নোমান

আমাদের শিশুসাহিত্যের একজন অভিভাবক ছিলেন এখ্লাস ভাই। তাঁর সৃষ্ট তুনু আর কেঁদো বাঘ শিশুসাহিত্যের খুদে পাঠকদের পরিচিত ও প্রিয় চরিত্র। গদ্য-পদ্য মিলিয়ে বিপুল তাঁর রচনাসম্ভার। সেই কবে সম্পাদনা করেছিলেন ‘ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ’। ওরকম একটি সঙ্কলনের সমকক্ষ কোনো ছড়া সংকলন দুই বাংলায় দ্বিতীয়টি আর হয়নি। মাঠপারের গল্প, হঠাৎ রাজার খামখেয়ালি, বাজাও ঝাঁঝর বাদ্যি কতো কতো বই তাঁর! দীর্ঘদেহী গৌড়বর্ণের চিরকুমার সুদর্শন মানুষটি পরিপাটি পোশাকে সজ্জিত ঝকঝকে রুচিশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজস্ব একটা ইমেজ তৈরি করেছিলেন।

১৯৪০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেয়া এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ দীর্ঘদিন কাজ করেছেন দৈনিক জনকণ্ঠে ফিচার এডিটর ও ঝিলিমিলির বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে। তাঁর লেখা একদিকে শিশু-কিশোরদের নির্মল আনন্দ দিয়েছে, অন্যদিকে তুলে ধরেছে দেশ ও সমাজের নানা অসঙ্গতি। কখনও আবার ছন্দে বাঁধা রাজনৈতিক প্রতিবাদও ধারণ করেছে তাঁর ছড়া।

তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ‘এক যে ছিল নেংটি’; ‘হঠাৎ রাজার খামখেয়ালী’; ‘কাটুম কুটুম’; ‘ছোট্ট রঙিন পাখি’ এবং তনু ও তপু সিরিজের কয়েক ডজন বই।

সঙ্কলনের মধ্যে রয়েছেÑ ‘বাছাই করা গল্প উপন্যাস’; ‘দুই বাংলার ছোটদের শ্রেষ্ঠ গল্প’; অশোককুমার মিত্রের সঙ্গে সম্পাদিত ‘দুই বাংলার নির্বাচিত কিশোর গল্প’; ‘সমগ্র ও সংকলন-১’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদের সম্পাদনায় প্রকাশিত শিশু-কিশোরদের মাসিক পত্রিকা ‘টাপুর টুপুর’ উনিশশ’ ষাটের দশকে শিশু সাহিত্যের যাত্রাকে নতুন গতি এনে দেয়।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখা প্রথম কিশোর উপন্যাস ‘সীমান্তের সিংহাসন’ ওই পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়।

শুধু ছড়া নয়, শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প, উপন্যাসও লিখেছেন এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ। তার সৃষ্টি ‘তুনু’, ‘তপু’ ও ‘কেঁদো’ চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে শিশুদের বন্ধু। নানা দেশের গল্প, ছড়া ও কবিতার সঙ্কলনের সম্পাদনা করেও তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।

প্রতিবাদীচেতনা বাংলাদেশের ছড়া সাহিত্যের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। ঔপনিবেশিক শাসক আর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এমন কিছু পঙ্ক্তি রচিত হয় এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদের হাতেÑ ‘হরতাল-/আজ হরতাল/পেটা ঢাক ঢোল/ছোঁড় সড়কি/আন বল্লম/ধর গাঁইতি/ধর বর্শা/দাও হাতে হাত/এই কাঁধে কাঁধ/তোল ব্যারিকেড/ গড়বো প্রতিরোধ/কালো দস্যির/ভাঙো বিষ দাঁত/ধরো হাতিয়ার/করো গতিরোধ/... খোল করতাল/ আজ হরতাল (হরতাল)।’

ষাটের দশকে বাংলার সাহিত্য আন্দোলনের পুরোভাগে যারা ছিলেন, এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ ছিলেন তাঁদেরই একজন। এখ্লাসউদ্দিনের সম্পাদনায় মাসিক কিশোর পত্রিকা ‘টাপুর টুপুর’ প্রকাশিত হতে লাগল। সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশে শিশুসাহিত্য প্রকাশনায় যেন বিপ্লব এনে ফেললেন।

শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০০ সালে সরকার তাকে ভূষিত করে একুশে পদকে। কেবল একুশে পদক নয়, শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৬২ সালে পশ্চিমবঙ্গ যুব উৎসব পুরস্কার, ১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৬ সালে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে শিশু একাডেমি পুরস্কার, ২০০৪ সালে কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং ২০০৭ সালে ইউরো শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।

এখ্্লাসউদ্দীন আহ্মদ আর আমাদের মধ্যে নেই। আর কোনদিন তিনি লিখবেন না শিশু-কিশোরদের জন্য। তবে আমরাও তাঁকে অনুভব করব প্রবলভাবে। আর আন্তরিকভাবে আশা করব, তিনি যেখানেই যেভাবেই থাকুন না কেন আমাদের জন্য, শিশুদের জন্য ভাববেন বৈকি। আর এ জন্যই তো তিনি আমাদের একজন অভিভাবক।

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

২৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: