কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জমে উঠেছে প্লট ও ফ্ল্যাট মেলা ॥ লোভনীয় অফারে ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

রহিম শেখ ॥ গ্যাস ও বিদ্যুত সংযোগ পেতে বিড়ম্বনা, পুঁজিবাজারে ধস, আবাসনে ঘূর্ণায়মান তহবিল বন্ধ, ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদহারসহ নানামুখী সঙ্কটে ফ্ল্যাটের দাম গত কয়েক বছরে কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে অবিক্রীত পড়ে আছে হাজার হাজার ফ্ল্যাট। মন্দায় পড়া আবাসন খাতটি পুনরুজ্জীবিত করতে ফ্ল্যাট কেনায় অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগও দিয়েছে সরকার। কিন্তু আগ্রহীদের অসামর্থ্যরে কারণে বাড়ছে না ফ্ল্যাটের ক্রেতা। ক্রেতারা বলছেন, ফ্ল্যাটের দাম ও ঋণের সুদ আকাশছোঁয়ার কারণে আগ্রহ থাকলেও কেনা সম্ভব নয়। অন্যদিকে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নানামুখী সঙ্কটে আশানুরূপ বিক্রি না বাড়ায় গত তিন বছরে ফ্ল্যাটের দাম অনেকাংশে কমেছে। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুত সংযোগ স্বাভাবিক থাকায় ক্রেতাদের জন্য ফ্ল্যাট কেনার এখনই উপযুক্ত সময়। শুক্রবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত রিহ্যাব মেলার তৃতীয় দিনে ক্রেতা-বিক্রেতারা এসব কথা জানান।

রিহ্যাব মেলায় কথা হয় রাজধানীর সেগুনবাগিচার এক সরকারী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। বাড়িওয়ালার নানা অনুশাসনের কারণে নিজের ফ্ল্যাটে থাকতে চান তিনি। জনকণ্ঠকে বলেন, একটি ফ্ল্যাট কেনার ইচ্ছা দীর্ঘদিনের। কিন্তু অর্থাভাবে আর এগুতে পারিনি। তিনি বলেন, বিদেশে আবাসন খাতে ঋণের সুদ কম এবং ফ্ল্যাট ও বাড়ির দাম যৌক্তিক। এ কারণে ঋণ করে ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনলে বাড়িভাড়ার সঙ্গে অল্প কিছু যোগ করে ঋণের মাসিক কিস্তি পরিশোধ করে এক সময় ফ্ল্যাটের মালিক হওয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেশে এটা সম্ভব নয়। কারণ ফ্ল্যাটের দাম ও ঋণের সুদ আকাশছোঁয়া। অস্বাভাবিক আয় না থাকলে এখানে বেশিরভাগ মানুষই ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হন না বলে তিনি জানান। মাথাগোঁজার জন্য রাজধানীর মিরপুরে পছন্দের একটি ফ্ল্যাট কিনতে চান একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান এরিক। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, পত্রিকায় পড়লাম ফ্ল্যাটের দাম কমেছে। কিন্তু মেলা ঘুরে দেখলাম ফ্ল্যাটের দাম এখনও মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধ্যের বাইরে। তিনি বলেন, আবাসন খাতে নামমাত্র অর্থায়ন করছে হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন। বর্তমানে আবাসন খাতে ব্যাংক ঋণও পর্যাপ্ত নয়। অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহার আকাশছোঁয়া। তারপরও মাথাগোঁজার একটু জায়গার আশায় মেলা ঘুরে দেখছি। বসুধা বিল্ডার্সের স্টলে কথা হয় বেসরকারী ব্যাংক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম আতিকের সঙ্গে। ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ খুব একটা লাভজনক মনে করেন না এ ব্যাংক কর্মকর্তা। তার মতে, ঢাকার লালমাটিয়ায় ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের দাম ১ কোটি টাকা। এ মানের একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা। ১ কোটি টাকা ব্যাংক অথবা অন্য যে কোন খাতে বিনিয়োগ করলে অনায়াসে মাসে ১ লাখ টাকা পাওয়া যায়, যা দিয়ে ফ্ল্যাটের ভাড়াসহ পুরো সংসারের খরচ মেটানো সম্ভব। তিনি বর্তমান বাজারদরে ফ্ল্যাট কেনায় আগ্রহী নন।

এ প্রসঙ্গে রিহ্যাবের সহ-সভাপতি ও ব্রিক ওয়ার্কস ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ভূঁইয়া জনকণ্ঠকে বলেন, আবাসন খাত এ মুহূর্তে ধীরে ধীরে ভালর দিকে যাচ্ছে। এ খাতে হঠাৎ পরিবর্তন সম্ভব হবে না। তাছাড়া এর সঙ্গে অনেক খাত জড়িত রয়েছে। বিশ্বের সব দেশেই আবাসন খাতের মন্দার পরে ভালো হতে সময় লেগেছে। তবে এখন আগের চেয়ে অনেক ভাল অবস্থায় এসেছে। তিনি বলেন, বিশ্বের কোথাও আবাসন খাতের ঋণে ১৭-১৮ শতাংশ হারে সুদ দিতে হয় না। বরং এক্ষেত্রে সুদের হার ৪ শতাংশের মধ্যেই থাকে। অথচ বাংলাদেশে আবাসন খাতের ঋণে সুদ হার অনেক বেশি। ফলে ক্রেতারা ফ্ল্যাট কিনতে চাহিদা অনুযায়ী সহজ শর্তে ঋণ পান না। ২০০৯-১০ সালে ঋণের ওপর সিঙ্গেল ডিজিট সুদের ব্যবস্থা ছিল। এখন তা বন্ধ রয়েছে। এটা চালু হলে এ খাত ঘুরে দাঁড়াবে। ফ্ল্যাটের দাম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নানামুখী সঙ্কটে আশানুরূপ বিক্রি না বাড়ায় গত তিন বছরে ফ্ল্যাটের দাম অনেকাংশে কমেছে। এখন গ্যাস ও বিদ্যুত সংযোগ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এবারের রিহ্যাব মেলায় সবচেয়ে বেশি নজর দেয়া হয়েছে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের। মেলায় মধ্যম শ্রেণীর ক্রেতাদের জন্য কোম্পানিগুলো আলাদাভাবে প্রচুর অফার দিয়েছে। ক্রেতাদের এখনই ফ্ল্যাট কেনার সময় উল্লেখ করে লিয়াকত আলী বলেন, আবাসন খাতের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্যের দাম দিন দিন বাড়ছে। এগুলোর দাম অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকলে ফ্ল্যাটের দাম আবারও বাড়বে বলে তিনি জানান। রিহ্যাব মেলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আবাসন খাতে অনেক বড় বড় উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করছেন। গ্রাহকরাও আস্থা নিয়ে কেনাকাটা করছেন। আর এখন মেলা হচ্ছে। এটা গ্রাহকদের আস্থার একটা বড় জায়গা। এ মেলায় দেশের সবচেয়ে ভাল ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নিচ্ছে। তিনি বলেন, রাজউক ও রিহ্যাব এ মেলা মনিটর করেছে। এ জন্য মেলা যে কোন পণ্য কেনার সবচেয়ে ভাল জায়গা। এখানে গ্রাহকরা আস্থার সঙ্গেই কিনতে পারবেন।

শুক্রবার বিকেলে রিহ্যাব মেলা ঘুরে দেখা যায়, শীতের ঠা-া বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও জমে উঠেছে প্লট ও ফ্ল্যাটের মেলা। লোভনীয় অফার দিয়ে ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা করছে আবাসন খাতের কোম্পানিগুলো। দীর্ঘদিন স্থবির থাকায় বিভিন্ন অফার ও উপহার দিয়ে বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন মেলায় অংশ নেয়া স্টল মালিকরা। ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রিতে ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আকর্ষণীয় মূল্যছাড় দেয়া হচ্ছে। বসুধা বিল্ডার্সের সহকারী ব্যবস্থাপক (বিপণন) নন্দ দুলাল পাল জনকণ্ঠকে জানান, ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। বসুধা সিটি নামে একটি চমকপ্রদ প্রকল্প তাঁরা মেলায় এনেছেন। ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ে সংলগ্ন সোনারগাঁও এলাকায় প্রায় ৫ হাজার বিঘা জমির ওপর এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রামে আরও ১০টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক সাখাওয়াত হোসেন জানান, এবার তারা মেলায় ৪৫ প্রকল্পের ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস প্রদর্শন করছেন। ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ছাড় দেয়ার কথা জানান তিনি। ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বিপণন ইনচার্জ মোহাম্মদ ফরহাদুজ্জামান বলেন, মেলায় ১৭ আবাসিক ফ্ল্যাটে ৫ শতাংশ ও তিনটি বাণিজ্যিক প্রকল্পে ১০ শতাংশ মূল্যছাড় দেয়া হচ্ছে। এ সুবিধা শুধু মেলায় বুকিং দিলে পাওয়া যাবে। কোম্পানির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বাড়াতে তারা মেলায় হাজির হয়েছেন। আইডিয়ালের প্রদর্শন করা ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলোতে মেলায় ১০ শতাংশ ছাড় দেয়া হচ্ছে বলে জানান সহকারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল হাসান। আইডিয়াল সিটির ৫০টি ফ্ল্যাট ও ৪০টি দোকান বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে মেলায় আসে তার প্রতিষ্ঠান। ইম্পেরিয়াল রিয়েল স্টেট মেলায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দিচ্ছে বলে জানান মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক কর্মকর্তা। প্লট বুকিংয়ে বিশেষ ছাড় দিচ্ছে নিউ ভিশন গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুসনি মোবারক জানান, কিস্তিতে কেনার ক্ষেত্রেও ছাড় রয়েছে। মেলায় নির্মাণ সামগ্রী বিক্রিতেও নানা অফার রয়েছে। কমপ্রিহেনসিভের বিপণন ও বিক্রয় কর্মকর্তা কেএম আশরাফুল বলেন, তাদের তৈরি অটো ব্রিকসে প্রতি হাজারে ২৫০ টাকা ছাড় রয়েছে। এবার মেলায় নতুন পণ্য হিসেবে বিদ্যুত সাশ্রয়ী লিফট প্রদর্শন করছে এক্সপ্রেস ইঞ্জিনিয়ারিং।

শুক্রবার রিহ্যাব মেলায় চিত্র জগতের বেশ ক’জন নায়ক-নায়িকাকেও দেখা গেছে। বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ এসেছেন মেলা থেকে কম মূল্যে বুকিং দিতে। রাজধানীর বনশ্রী থেকে এসেছেন সারওয়ার জাহান। বললেন, এখানে ঘণ্টা দুয়েক ঘুরে এক সঙ্গে সব কোম্পানির তথ্য জানা যায়। যা অন্য সময় সম্ভব হয় না। এ প্রসঙ্গে মেলা কমিটির কো-চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার সরওয়ার্দী ভূইয়া জনকণ্ঠকে বলেন, এবারের মেলা অন্যবারের তুলনায় ব্যতিক্রম। কারণ, আবাসন খাতে দীর্ঘ স্থবিরতা বিরাজ করায় এখন মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে ক্রেতাদের জন্য ফ্ল্যাট কেনার এখনই উপযুক্ত সময়। আর মেলায় দর্শক উপস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে অনেকেই সুযোগটি গ্রহণ করছেন। তিনি বলেন, আশার কথা যে পূর্তমন্ত্রী বলেছেন, রাজউক আর কোন প্লট দেবে না। তাতে করে জমির দাম সমন্বয় হবে এবং ফ্ল্যাটের দামও কম থাকবে। আমাদের দাবি ছিল আবাসন খাতের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেয়া হোক। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন পূর্তমন্ত্রী। যা এ খাতের জন্য ইতিবাচক হবে। ২০ হাজার কোটি টাকা অর্থায়নের ব্যাপারেও তিনি উপর মহলে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন। তাতে ক্রেতাদের জন্য ফ্ল্যাট সহজলভ্য হবে।

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

২৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: