আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

উন্নত প্রযুক্তির কাছে ল্যান্ডফোন হেরে যাচ্ছে

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • অনেকেই ছেড়ে দিচ্ছেন, নতুন সংযোগও কেউ নিচ্ছেন না

ফিরোজ মান্না ॥ সরকারী কোম্পানি বিটিসিএলের গ্রাহক সংখ্যা দিন দিন কমছেই। টেলিফোন সংযোগ ফ্রি দিয়েও কোম্পানিটি গ্রাহক বাড়াতে পারছে না। গ্রাহক বাড়ানোর জন্য ল্যান্ডফোনে ইন্টারনেট সংযোগ দিচ্ছে। এরপরও অনেকে ল্যান্ডফোন সংযোগ ছেড়ে দিচ্ছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক থেকে অলাভজনক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির মোবাইল ফোনের কারণে বিটিসিএল এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বলে বিটিসিএল মনে করছে। সারাদেশে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৩৮৬টি সংযোগ দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। বিটিসিএলের বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা ১০ লাখের নিচে চলে এসেছে। সারাদেশে ৬৯৩টি এক্সচেঞ্জ আছে। এর মধ্যে উপজেলা ডিজিটাল এক্সচেঞ্জ রয়েছে ৪৫৬টি। ২৫টি গ্রোথ সেন্টারে ডিজিটাল এক্সচেঞ্জ আছে ১৮৭টি। বিটিসিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, মোবাইল ফোনের জনপ্রিয়তা গ্রাস করেছে এক সময়ের জনপ্রিয় ল্যান্ড টেলিফোনকে। মোবাইল ফোন কোম্পানির দেয়া নানা সুযোগ-সুবিধা, বোনাসসহ নানা সুবিধার কারণে এখন মানুষ ল্যান্ডফোন কম ব্যবহার করছে। আমাদের আগে যে আয় ছিল, এর বড় অংশ আসত কল থেকে। এখন তা অনেক কমে গেছে। বিটিসিএল এখন ইন্টারনেট, ব্রডব্যান্ড, ব্যান্ডউইথ, গেটওয়েসহ নানা সেবা দিচ্ছে। ল্যান্ডফোনে ইন্টারনেট, ইন্টার কানেকশন, গেটওয়ে, ডাটা লিংক, ওয়েব সার্ভিস ও টেলিকম ইন্টারসেকশনসহ নানা সার্ভিস চালু করা হয়েছে। তারপরও আয় আগের মতো বাড়েনি। ২০০৭ সাল পর্যন্ত এটি বিটিটিবি নামে ছিল। পরে এটি কোম্পানিতে পরিণত করে নাম রাখা হয় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড। নাম পরিবর্তন করে লোকবল কমানো ছাড়া আর কোন লাভ হয়নি। আগের চেয়ে নতুন নতুন সেবা যোগ হলেও বিটিসিএল দিন দিন নিচের দিকেই চলে যাচ্ছে। সাবমেরিন, ইন্টারনেট, গেটওয়ে- এসব খাতেও আয় খুব একটা হচ্ছে না। উন্নত প্রযুক্তির কাছে প্রতিনিয়ত ল্যান্ডফোন হেরে যাচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, বিটিসিএল (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড) গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছর রাজস্ব আয় ৫শ’ কোটি টাকা কম হয়েছে। বিটিসিএলের হাতে নেয়া টার্গেট কোনভাবেই পূরণ করতে পারেনি। সরকার বিভিন্ন জেলা, থানা ও গ্রোথ সেন্টারগুলোতে ল্যান্ডফোন সংযোগ প্রায় ফ্রি করে দিয়েছে। এরপরও গ্রাহক পাওয়া যাচ্ছে না। বিটিসিএলের ইতিহাসে এমন করুণ দশা আর কখনও দেখা যায়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে কোম্পানিটি একদিন বন্ধ ঘোষণা করতে হবে। ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক কল থেকে ৭০০ কোটি ৩৯ লাখ, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৬৯০ কোটি ৪০ লাখ, ২০১১-২০১২ অর্থবছরে ১০৭১ কোটি ৮৭ লাখ এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরের নয় মাসে ৩২৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। বিটিসিএলের এমন রাজস্ব আয় নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিটিসিএলের কর্মকর্তা। সরকারের বিভিন্ন তরফে ভুল তথ্য দিয়ে তারা বোঝাতে চাইছেন, সব ঠিক আছে। কোন সমস্যা নেই। বিটিসিএলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটটি বিটিসিএলকে নানাভাবে ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিটিসিএলের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিটিসিএলে শীর্ষ পদে মুখচেনা কিছু দুর্নীতিবাজের পদায়ন করা হয়েছে। তাই বিটিসিএলে আয় বৃদ্ধি দূরের কথা, রাজস্ব আয় এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে যে, কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত দিতে পারছে না। এফডিআর ভাঙ্গিয়ে বেতনসহ অন্যান্য কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

এদিকে, এমন দিন ছিল একটি ল্যান্ড টেলিফোন পেতে তদ্বির ও টাকা ছাড়া কাজ হতো না। ছিল না ভোগান্তির কোন শেষ। তারপরও মানুষ একটি টেলিফোন নিত। কিন্তু এখন আর ওই দিন নেই। প্রায় চার লাখ টেলিফোন লাইন পড়ে থাকলেও কেউ নিচ্ছে না। ল্যান্ড ফোন নেয়ার সংখ্যা হাতেগোনা। টেলিফোন অফিসে আগের মতো মানুষের ভিড় নেই। এখন বিটিসিএল ফ্রি দিয়েও গ্রাহক পাচ্ছে না। অপ্রত্যাশিতভাবে ল্যান্ড ফোনের গ্রাহক কমেছে, ফোনের ব্যবহার কমে যাওয়া, এ কারণে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়া, ভাল সেবা দিতে না পারা সেই সঙ্গে মাঝে মাঝেই টেলিফোন বিকল করে রাখার ভোগান্তি ও কষ্টের পাশাপাশি ভাল মানের সেবা না পাওয়ার কারণে গ্রাহক নেই।

জানা গেছে, ডিজিটাল ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিফোন এক্সচেঞ্জগুলোর বেশিরভাগ অংশই অকেজো পড়ে থাকছে। ল্যান্ডফোন উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে পৌঁছানোর লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা সদরের আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে টেলিফোন সংযোগ ফ্রি দিচ্ছে। কোন সংযোগ ফি নেয়া হচ্ছে না। তারপরও মানুষ ল্যান্ডফোন নিচ্ছে না। বিটিসিএল উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল এক্সচেঞ্জ স্থাপন করেছে। মানুষ এখন মোবাইল ফোনের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। তাদের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। বহন করতে সুবিধা। মোবাইল অপারেটরা কম পয়সায় নানা অফার দিচ্ছে। পাচ্ছে ফ্রি এসএমএস সুবিধা। একটি মোবাইল ফোনের সিম মিলছে ৫০ থেকে ১৫০ টাকায়। সেই সঙ্গে ৫শ’ এসএমএস, কথা বলার জন্য ১৫০ মিনিট ফ্রি। কেবল একটি সেট কিনলেই হচ্ছে। এত সুবিধা পেয়ে মানুষ কেন ল্যান্ডফোন নেবে? রাজধানী ঢাকায় ল্যান্ডফোন নিতে এক হাজার টাকা সংযোগ ফি ও এক হাজার টাকা ডিপোজিটসহ মোট ২ হাজার টাকা লাগে। বিভাগীয় ও জেলা শহরে এর পরিমাণ এক হাজার টাকা। আর উপজেলা পর্যায়ে মাত্র ৬শ’ টাকা। উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ে কানেকশন ফ্রি। কলরেট বিটিসিএল টু বিটিসিএল মিনিটে ৩০ পয়সা। অন্য অপারেটরে ৬৫ পয়সা মিনিট। মোবাইল ফোনের মতো রমনা, গুলশান, মিরপুর, শেরেবাংলা নগর, উত্তরা, নীলক্ষেত ও মগবাজার এক্সচেঞ্জের আওতায় ১০ হাজার প্রি-পেইড ফোনও রয়েছে। এই ফোনগুলোও গ্রাহক পাচ্ছে না বিটিসিএল।

সূত্র জানায়, বিটিটিবি থেকে বিটিসিএল নাম পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। এখানে সবকিছুই আগের মতো আছে। বিশেষ করে দুর্নীতি। বিটিসিএলে দুর্নীতি চরম পর্যায়ে রয়েছে। দুর্নীতি বন্ধ করতে বিটিসিএলকে কোম্পানি করা হয়েছিল। কোম্পানি করে দুর্নীতিও বন্ধ হয়নি, আবার প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থায়ও যায়নি।

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

২৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: