আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিকষ কালো অন্ধকারের বগুড়ার গ্রাম এখন আলো ঝলমল

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪
নিকষ কালো অন্ধকারের বগুড়ার গ্রাম এখন আলো ঝলমল
  • বাড়ি বাড়ি বায়োগ্যাসের লাইন, বিদ্যুত পেলেই জ্বলে ওঠে বাল্ব

সমুদ্র হক ॥ দৃশ্য ও অদৃশ্যমান সম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহারে মাঠ পর্যায়ের সার্বিক উন্নয়ন যে কত দ্রুত হতে পারে তার বড় উদাহরণ বগুড়ার নিভৃত একটি গ্রাম। যে গ্রামে গোবর তৈরি গ্যাসে প্রায় প্রতিটি ঘরের গৃহবধূ সিঙ্গল ও ডবল বার্নার চুলোয় রান্না করে। একদার হেঁসেল (মাটির চুলা) উঠে যাচ্ছে। ওই গ্রামে কোন লোড শেডিং নেই। পল্লীবিদ্যুত সমিতি (পবিস) লোডশেড করলে গোবরে তৈরি গ্যাসের জেনারেটরে প্রতিটিঘরেই বিদ্যুত দেয়া হয়। গ্রামের মানুষ এখন আর রাসায়নিক সার ব্যবহার করে না। মাটির জৈব সারের ঘাটতি মিটিয়েছে তারা ফেলে দেয়া বর্জ্যরে বাইপ্রোডাক্ট দিয়ে। ফলে এই গ্রামে প্রতিটি ফসলে অধিক ফলন মেলে। গ্রামের এই উন্নয়ন হয়েছে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) গবেষণার একটি প্রকল্পে। কাগজেকলমে প্রকল্পের নাম আলাদা। তবে গ্রামের মানুষ ও কর্মকর্তারা জানে, এর নাম এবিসিডি। এই নামেই পরিচিতি পাচ্ছে। প্রকল্পের উপপরিচালক সমির কুমার সরকার জানালেন, এবিসিডি অর্থÑ এ্যাসেটবেজড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট। মাঠ পর্যায়ে উন্নয়নের যে কত সম্পদ আছে তা না দেখে বোঝা যাবে না। কিছু সম্পদ দৃশ্যমান। কিছু অদৃশ্য, যা খুঁজে বের করতে হয়। এবিসিডি সেই কাজটি করছে। বগুড়া জেলাশহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বের নিভৃত এক গ্রাম শেরপুর উপজেলার পারভবানীপুর। কিছুটা রাস্তা এখনও কাঁচা। তারপরও গ্রামের মানুষ নিজেদের উদ্যোগে কাঁচারাস্তা মাটি কেটে সমান করেছে। উপজেলা প্রশাসন এই গ্রামের অভাবনীয় উন্নয়ন দেখে বাকি কাঁচারাস্তা পাকা করে দেয়ার ব্যবস্থা করছে এবং ইউনিয়ন পরিষদও এগিয়ে এসেছে। বগুড়া আরডিএর মহাপরিচালক এম এ মতিন জানান, প্রতিটি সম্পদের সদ্ব্যবহার করে উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। আরডিএর পরিচালক (সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা) মাহমুদ হোসেন খান, প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম জানালেন, উন্নয়নের একটি ধারা শুরু করলে তার শাখা-প্রশাখা বের হয়ে আসে। আরডিএ এই শাখা-প্রশাখাকে সমৃদ্ধ করে গ্রাম উন্নয়নে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই বিষয়ে উপপরিচালক সমির কুমার সরকার বললেন, দৃশ্য ও অদৃশ্যমান (আইডেন্টিফায়েড ও আনআইডেন্টিফায়েড) এ্যাসেট বা সম্পদ প্রতিটি ঘরেই আছে। মেধা দিয়ে শুধু তার সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন দরকার। তিনি উদহারণ দিলেন গোবর দিয়ে। পারভবানীপুর গ্রামে প্রথম গোবর দিয়ে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করা হয়। তবে ব্যতিক্রমী। প্রতিটি বাড়ি বা কয়েক বাড়ি মিলে একটি প্ল্যান্ট না করে ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মতো একটি বড় প্ল্যান্ট করা হয়। ওই প্ল্যান্টে গ্রামের প্রায় দুই শ’ গরুর গোবর সংগ্রহ করা হয়। প্রতিদিন গোবর সংগ্রহ করার জন্য সাইকেলভ্যান আছে। তারা গেরস্তবাড়িতে গিয়ে গোবর নিয়ে আসে। কোন কৃষকের দুটি বা তিনটি গরু থাকলে তাদের গরুপ্রতি মাসে এক শ’ টাকা করে দেয়া হয় গোবরের জন্য। প্রতিদিনের এই গোবর ও হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে বায়ো-গ্যাসপ্ল্যান্ট চলে। প্ল্যান্ট ক্যাপাসিটি ১৩০ ঘনমিটার গ্যাস। গোবর বেশি মিললে তা আরও বাড়বে। এই গ্যাসেই গভীর নলকূপ ও জেনারেটর চলে (যার ক্ষমতা ৪ দশমিক ৪ কেভিএ)। প্ল্যান্টের পাশেই আছে ওভারহেড পানির ট্যাঙ্ক ধারণক্ষমতা ৫ হাজার লিটার। এই গ্রামেই কমিউনিটি টয়লেটের ব্যবস্থা আছে (যা অনেক শহরে নেই)। প্ল্যান্টের মাধ্যমে দেড় কিলোমিটার এলাকার মধ্যে প্রতিবাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের লোডশেড হলে গ্যাস স্টেশনের জেনারেটরে বিদ্যুত উৎপাদন করে তা পৌঁছে দেযার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্লাস্টিকের গ্যাস পাইপলাইন বসানো হয়েছে দেড় হাজার ফুটের বেশি। নিরাপদ পানি সরবরাহ লাইন বসেছে প্রায় ১ হাজার ৩শ’ ফুট। দিনে দিনে সমস্ত কর্মকা- বাড়ছে। গ্রামের নারী-পুরুষ এখন বাথরুমের ঝর্ণায় গোসল করে। প্রায় প্রতিঘরে ফ্রিজ-টিভি (কেবল সংযোগসহ) তো আছেই ডেক্সটপ ল্যাপটপ কম্পিউটারও আছে। গ্রামে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার বেড়েছে। সবচেয়ে বড় যে কাজ হয়েছে তা হলো, মাটির জৈবশক্তি বৃদ্ধি (জৈব পদার্থের হার বেড়েছে)। বায়ো-গ্যাসপ্লাটে গোবর ব্যবহারের পর শুকনো যে পদার্থ মেলে তা বায়ো-গ্যাসের বাইপ্রোডাক্ট, এই জৈব সার। সমির কুমার জানালেনÑ আরডিএর গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে আবাদি জমিতে অন্তত ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকার কথা সেখানে দেশের ৭০ শতাংশ আবাদি জমিতে জৈব পদার্থের হার ১ থেকে দেড় শতাংশে নেমে এসেছে। কোথাও এক শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। এই অবস্থায় কোন একটা সময়ে মাটির উর্বরাশক্তি কমে গিয়ে ফসল উৎপাদন কমে যাবে; যার প্রমাণ ওই গ্রামে দেখা যায়। যে জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়েছে তার সবজি আবাদ যে কম তা খালি চোখেই বোঝা যায়। যে জমিতে বায়ো-গ্যাসের জৈবসার ব্যবহার হয়েছে সেখানে থোকায় থোকায় সবজি ফলেছে। কৃষক যাতে সাশ্রয়ী দামে এই জৈবসার পায় সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে। যেমন, যে কৃষক প্রতিদিন গোবর দিয়ে মাসে এক শ’ টাকা করে পাচ্ছে সেই কৃষককে তিন মাস অন্তর বিনামূল্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জৈবসার দেয়া হবে (গোবর থেকে প্রাপ্ত অর্থের মান অনুযায়ী)। গ্রামের কৃষক বললেন, আগে তারা চাষের জন্য বলদ পালত। বর্তমানে সকলেই পাওয়ার টিলারে চাষ করে। ক্রস ব্রিডে আরডিএর বিদেশী জাতের বাছুর এনে তারা দুধপ্রাপ্তি ও গোবর বায়ো-গ্যাস প্লান্টে দেয়ার জন্য লালনপালন করে। কৃষকদের ঘরে এভাবে মিনি-ডেয়ারি ফার্ম গড়ে উঠেছে। গ্রামের বায়ো-গ্যাস প্লান্টের স্বত্বাধিকারী ফজলুল হক সরকার দুদু গ্রাম ঘুরিয়ে দেখালেন। বললেন, একটি প্রকল্প থেকে তিনি আরও কয়েকটি প্রকল্প তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রকল্পটি চালু হয় এ বছরের মার্চে। নয় মাসের মধ্যে গ্রামের ৩৭ পরিবারে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। প্রতিমাসে এসব পরিবার গ্যাসের বিল পরিশোধ করেন ৫শ’ টাকা করে। যেখানে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম লাগত ১৩শ’/১৪শ’ টাকা, তাও পুরো মাস চলত না সেখানে ৫শ’ টাকায় তারা তিনবেলা স্বচ্ছন্দে রান্না করে। গ্যাস ব্যবহারেও নিয়ম মানা হয়। যেমন, প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও রাতে নির্দিষ্ট সময়ে তিন ঘণ্টা করে গ্যাস বিতরণ করা হয়। গ্যাসের প্রেসার প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে কোন অংশে কম নয়। বিদ্যুতের লোডশেড হলে গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই গ্যাস জেনারেটরের বিদ্যুত পৌঁছে দেয়া হয়। এ জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা আছে প্রতিঘরেই। এই গ্রামে বছরকয়েক আগেও কেউ ভাবেনি গ্যাসে রান্না করবে। এখন গৃহবধূরা এত খুশি যে, রান্নার সময় কমে যাওয়ায় তারা বাড়তি কাজ করার (যেমন কাঁথা সেলাই, মেশিনে অন্যের পোশাক তৈরি করে দেয়া, শাকসবজি আবাদ ইত্যাদি) সুযোগ পাচ্ছে। গ্রামে শিক্ষিতের হার প্রায় শতভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও আছে অনেক। নারী শিক্ষার হার যেমন বেশি তেমনই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামে বাল্যবিয়ের কোন খবর মেলে না। সবচেয়ে বড় কথা, কোন বাড়িতে বিয়ের কথাবার্তা হলে গ্রামের লোকই খোঁজ নেয়, কোন বালিকা বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছে কিনা। তারা প্রতিরোধ করে। আরডিএর উপপরিচালক সমির কুমার জানালেণ্ড এই এবিসিডি মডেল দেশের প্রায় ৮৬ গ্রামে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আরডিএর মহাপরিচালকের কথা, পল্লী জনপদ নামে যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নাধীন (অর্থাৎ উন্নয়নে ওয়ানস্টপ সার্ভিস) এবিসিডি প্রকল্প এক সময় পল্লী জনপদ প্রকল্পের মধ্যেই থাকবে।

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

২৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: