রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

এখনও যৌতুক!

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪
এখনও যৌতুক!
  • সিরাজুল এহসান

প্রতিদিন যদি ৪০-৫০ নারী তাদের নির্যাতনের ফিরিস্তি নিয়ে বিচারপ্রার্থী হয়ে সরকার অনুমোদিত কোন প্রতিষ্ঠানে প্রতিকারের জন্য আসেন তাহলে বুঝতে বাকি থাকে না নারী নির্যাতন কোন্ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে! আর এ কথাও বলার অপেক্ষা রাখে না নারী নির্যাতন প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপে কোথায় যেন একটা গলদ বিদ্যমান। গড় হিসাবটা এমন হলে প্রতিমাসে দাঁড়াচ্ছে প্রায় দেড় হাজারের মতো। এটা অনুমানভিত্তিক বা মনগড়া কোন পরিসংখ্যান নয়, রাজধানীর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে জমা পড়া চিত্র। এ বিষয় নিয়ে দৈনিক জনকণ্ঠ শীর্ষ প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।

অনুসন্ধানী ওই প্রতিবেদনে নির্যাতিত নারীদের জীবনের যে করুণ চিত্র উঠে এসেছে তাতে যে কোন সহৃদয় মানুষমাত্রই মানসিকভাবে আহত হবেন। এসব নারী বেশিরভাগই কিন্তু যৌতুকের শিকার। ভাবতে অবাক লাগে আমাদের সমাজের এই বিষাক্ত ব্যাধির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে প্রতিরোধের যুদ্ধ কিন্তু আজকের নয়। বলতে গেলে চার দশকের বেশি সময় ধরে এ চলমান যুদ্ধ সবশ্রেণী পেশার মানুষকে পূর্ণ সচেতন করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে অবশ্য একটি কথা থেকে যায়Ñ কাউকে সচেতন করা দুরূহ ব্যাপার; যদি না সে নিজ থেকে হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও এর ফল আশানুরূপ নয়, তা বলে দেয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে জমা পড়া অভিযোগের বহর। চলতি দশকের শুরুর বছর অর্থাৎ ২০১১ সালে জমাপড়া অভিযোগের সংখ্যা দেখলেই বোঝা যাবে এ অপরাধ কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ওই সালে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে অভিযোগ জমা পড়ে ১৩,৩৫৪টি।

নারী নির্যাতনের ধরনও বিচিত্র। শুরুতে আমরা উল্লেখ করেছি যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতনের প্রসঙ্গ। এ ক্ষেত্রে বলা প্রয়োজনÑ যৌতুকপ্রথা আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সে বেশ পুরনো কথা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের প্রায় মাঝামাঝি সময়ে এই অভিশপ্ত প্রথার কথা যদি শুনতে হয় এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে! এ বিষয় নিয়ে আশা ছিল এর ঠাঁই হবে সমাধিতে কিন্তু তা না হয়ে সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে এখনও ধরে আছে; শুধু ধরে আছে বললে কম বলা হবে, প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করছে সমাজদেহ। বিধ্বস্ত করছে, বিনষ্ট করছে, চূর্ণ হচ্ছে কত সংসার, জীবন। এমনকি সরাসরি বা প্রকারান্তরে ধ্বংস করছে আগামী দিনের ভসিষ্যত নাগরিক বা কা-ারি শিশুকে। সংসার ভাঙ্গার পর সেখানে সন্তান থাকলে তার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার শারীরিক-মানসিক ক্ষতির সমূহ আশঙ্কা থাকে প্রবল।

ভাবতে অবাক লাগে বিয়েতে এখনও যৌতুক প্রথা বহাল থাকে কিভাবে? এর নেতিবাচক অনুষঙ্গ বিয়ের মধ্যে ঢুকে নারী জীবনে প্রবাহিত হয় কী করে? কেননা বিয়ে ব্যাপারটি এমন সামাজিক ও আইনী নিয়ম যেখানে গোপনীয়তার কোন সুযোগ নেই বরং প্রকাশ্য এবং অতি প্রকাশ্য। এখানে যৌতুক প্রদান-গ্রহণের বিষয়টি গোপন থাকে না। গোপন থাকে না বিয়ের শর্তাবলীও। কেন যে এ প্রকাশ্য সামাজিক আইনী প্রথার মধ্যে একটি বেআইনী দুষ্ট ক্ষত ঢুকে পড়ে, তা বোধগম্য নয়। অঙ্কুরেই যা বিনাশ হতে পারে, তা কেন চারা গাছ হয়ে ঢুকে পড়ে? যৌতুকের কথা তো আর গোপন থাকার কথা নয়। তা হলে চোখের সামনে, প্রকাশ্যে এ অপরাধকে কি আমরা মেনে নিচ্ছি?

এ প্রসঙ্গে একটি প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। বিয়ের রেজিস্ট্রেশন থেকে আনুষ্ঠানিকতা পর্যন্ত একজন স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির লিখিত সুপারিশে তার প্রতিনিধি, স্থানীয় পুলিশ বা নির্বাহী প্রশাসনের একজন উপস্থিত থেকে নিশ্চিত করবেন যে বিয়েতে যৌতুকের মতো কোন অপকা- ঘটেনি। সে সঙ্গে যিনি যে যে ধর্মানুসারীর বিয়ে নিবন্ধন করবেন সেই নিবন্ধনকারীর কাছে, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা যিনি করেন এই যেমনÑ মোল্লা, কাজী, পুরোহিত, ফাদার এ জাতীয় ধর্মনেতাদের কাছে বর-কনে বা উভয়পক্ষের অভিভাবকদের শপথ করতে হবে যৌতুক বা এ প্রসঙ্গ তুলে কেউ কাউকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করবে না। অন্যদিকে আরেকটি পথ অবলম্বন করা যেতে পারে। বিয়ের আইনী প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে আনুষ্ঠানিকতা পর্যন্ত সরকারী কোন নির্বাহী কর্মকর্তা বা ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার সম্পন্ন কোন কর্মকর্তার কাছে লিখিত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে যে, বিয়েতে যৌতুক দেয়া-নেয়া হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। এ অঙ্গীকারনামায় বর-কনেসহ তাদের অভিভাবকদেরও স্বাক্ষর ও সম্মতি থাকবে। ব্যাপারটি আইনের মধ্যেও থাকল, প্রক্রিয়াটির কথা শিকড় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ল।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন অত্যাবশ্যক। এই যৌতুকের কারণে সামাজিক অবক্ষয় তো ঘটেই পাশাপাশি আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। আইনকে অমান্য করার স্পর্ধা যাতে কেউ দেখাতে না পারেন সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সরকারের। সাধারণ মানুষের মধ্যে গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত জরুরী। এক্ষেত্রে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা, গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। সরকারী তত্ত্বাবধানে তা পরিচালিত হতে পারে।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে মাসে যে অসংখ্য নারী আসেন বিচারের প্রত্যাশায়, তার বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র নারী গোষ্ঠী। বিনা অর্থব্যয়ে সমাধানের আশায় আসেন তাঁরা। প্রতিরোধ সেলে জনবল কম থাকায় অভিযোগ দ্রুত সমাধান হয় না। জমে থাকে স্তূপাকারে। দিনের পর দিন তারিখ পড়াতে তাঁরা বার বার আসতে বাধ্য হন। সময় ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন তাঁরা। তার ওপর আছে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। পদবি ম্যাজিস্ট্রেট হলেও তার ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার না থাকায় অপরাধী বা বিবাদীর আস্ফালন যায় বেড়ে। গ্রেফতারি পরোয়ানা, জেল-জরিমানার ক্ষমতা না থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখে গুরুত্বহীনভাবে । বাদিনীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যসহ হেনস্তা করার খবর গণমাধ্যমে দেখা যায়। বিবাদী একরকম প্রতিরোধ সেলের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। প্রকারান্তরে সরকারের আদেশ বা নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তার অবস্থান।

প্রতিরোধ সেলে অভিযোগকারী নারীরা বেশিরভাগই যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে স্বামীনির্ভর, সেহেতু অভিযোগ করার পর তার যে দুর্বিষহ জীবন শুরু হয় তা অবর্ণনীয়; তার স্থান হয় প্রধানত পিত্রালয়ে, ভাইদের কাছে নতুবা নিকটাত্মীয়-স্বজনদের কাছে। অন্যের গলগ্রহ জীবন যে তিক্তময়, দুঃখ-কষ্টের তা বলাই বাহুল্য। সন্তান থাকলে তো সেই পরিস্থিতির আরেক ধাপ অবনতি ঘটে। বিড়ম্বনার শেষ থাকে না।

এই নারী নির্যাতন শুধু নিম্নবিত্তের মধ্যে বেড়েছে তা কিন্তু নয়, উচ্চবিত্তের মধ্যেও তা ‘সংক্রমিত’ হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে বৈকি। এটা সামাজিক অস্থিরতার বহির্প্রকাশ। সেখানে শুধু যৌতুক নয়, নানারকম অনৈতিকতাও জড়িত। ভাঙছে ঘর, ধসছে জীবনের পাড়। এখনই এ দশা থেকে মুক্তি না মিললে আগামী দিন শুধু নারী নয়, দেশ-জাতিরও ক্ষতির সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। কেননা... ‘যা কিছু মহান চিরকল্যাণকর/অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪

২৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: