কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অন্ধকার, অন্ধকার এবং অন্ধকারের গল্প

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

শাখাইতি বাজারটা ছোট্ট গ্রামের বাজার হলেও লোক সমাগম কম হয় না। চারপাশের ছোট ছোট যতসব গাঁও-গেরাম আছে, সেসব গ্রামের মানুষ অন্যত্র না গিয়ে এখানেই জিনিসপত্র বেচাকেনা করতে আসে। এ বাজার থেকে আবার টাউনের দূরত্ব খুব বেশিও নয়। আবার কমও নয়। গ্রামের সাধারণ মানুষ এই শাখাইতি বাজার থেকেই মাছ, তরিতরকারি, চাল, ডাল, লবণ, তেল অর্থাৎ নিত্যদিনের জিনিসপত্র কিনে থাকে। জেলা শহরে যেতে বাসভাড়া চলে যায় পনের থেকে সতের টাকার মতো। সিএনজি অটোরিকশা ওয়ালারা নিয়ে নেয় বাইশ টাকার মতো। তাই চারপাশের গরিব লোকগুলো পয়সা খরচ করে শহরে যেতে চায় না। তারা জানে এই গাড়ি ভাড়ার পয়সা দিয়ে একটা পাতিলাউ কিনে নিতে তাদের কষ্ট হবে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই শাখাইতি বাজারে যে মাছটা যে দামে পাওয়া যায়, সেই মাছ শহরের পুরানবাজারে একই দামে বিক্রি হয়। তাই মানুষ কোন দুঃখে শহরে যাবে। শুধু মামলা-মোকদ্দমার জন্য যারা শহরের কোর্ট-কাচারিতে যায়, তারা ফেরার সময় সুযোগ পেলে এটা-ওটা কিনে নিয়ে আসে। এছাড়া এখন সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। পল্লীবিদ্যুত আর সৌরবিদ্যুতের বদৌলতে বাজারের ব্যবসায়ীদের আর কুপিবাতি জ্বালিয়ে ব্যবসা করতে হয় না। ঘরে ঘরে এখন বৈদ্যুতিক বাতি ঝলমল করে। বাজারে কেনাকাটা চলে বলতে গেলে প্রায় রাত দশটা-সাড়ে দশটা পর্যন্ত। তবে এই গল্পটা বাজার নিয়ে নয়। গল্পের কাহিনী হচ্ছে অন্য জায়গায়।

শাখাইতি বাজারের পাশ দিয়ে যে ছোট্ট নদীটা চলে গেছে তার কোন নির্দিষ্ট নাম নেই। কেউ বলে এটা নদী নয়। এটা বাজারের খাল। সারাদেশে একবার খাল কাটার উৎসব শুরু“হয়েছিল তখন আমাদের চেয়ারম্যান সাব এই খালে কোদালের কয়েকটি কোপ দিয়ে ঢাকা গিয়ে পুরস্কার এনেছিল। চেয়ারম্যান সাব সেই পুরস্কার আনার পর থেকে এই বাজারের খালের নাম হয়ে যায় পুরস্কার নদী। বর্ষায় খুব বেশি বৃষ্টি হলে নদীটা উঠতি বয়সী কোন কিশোরীর মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে। এর বাইরে কোন ধরনের উন্মত্ততা এই পুুরস্কার নদীর মধ্যে দেখা যায় না। বাজারের মনা পাগলা বলে, শালার চেয়ারম্যানের ভাগ্য! খালের মাঝে কোদালের দুয়েকটা কোপ দিয়ে পুরস্কার পেয়ে প্রথম হয়ে গেল। ঢাকা গিয়ে বড় বড় মানুষের সঙ্গে ছবি তুলে নেতা বনে গেল। মনা পাগলার কথায় কেউ কান দেয় না। তাই চেয়ারম্যানের ছেলেপেলেরাও কিছু মনে করে না।

সকাল থেকে বাজারে গুঞ্জন চলছে, পুরস্কার নদীতে একটা নয় দুইটা নয়, চার-চারটা লাশ ভাসছে। ছোট্ট বাজারের গুঞ্জন বাতাসে ভর করে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পঙ্গপালের মতো চারদিক থেকে মানুষ ছুটে আসতে থাকল। আইনের বড় বড় লোক দুই টাকা, তিন টাকা, চার টাকা, সাত টাকা, আট টাকা দামি পত্রিকার সাংবাদিকসহ টেলিভিশনের সাংবাদিকরাও ছুটে এসেছে খবর পেয়ে। সবাই ভিড় জমিয়েছে পুরস্কার নদীর দুইপাড়ে। পুলিশের লোকজন কারও কারও আবার ধমকাচ্ছে। কারও কারও কাছ থেকে জেনে নিতেও চাইছে নদীতে এ রকম লাশ আগে কখনও ভেসে এসেছে কি-না।

সমবেত জনগণ পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে বলেছে, আমরা কেন, আমাদের মৃত পূর্বপুরুষরাও কখনও এই খালে বা তার আশপাশে এ রকম বেওয়ারিশ লাশ দেখেনি। আমরা তো দূরের কথা। একটা পুলিশ কনস্টেবল, মনা পাগলার উত্তরসূরি বাজারে নতুন আসা পাগলটাকে জিজ্ঞেস করে, বল তো এতগুলো লাশ কিভাবে এখানে ভেসে এলো। পুলিশের কথা শুনে পাগলাটা ভেংচি কেটে বলে, মরেছে, মরেছে। কেউ মেরেছে। তাই ভেসে এসেছে। পুলিশ পাগলাটার পাছায় একটা বারি দিয়ে বলে, ভাগ শালা। পাগলামির সময় এখন নয়। পাগলাটাও বলে, ঠিক বলেছ, তোমাদের পাগলামির সময় এখন নয়।

থানা পুলিশের বিভিন্ন শাখার লোকেরা এখানে এসেছে। চারপাশে এত লোকজন হয়েছে যে, তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, সবাইকে একে একে জিজ্ঞাসাবাদ করে সবকিছু জেনে নেয়া। একজন সেকেন্ড অফিসার মুখ ফসকে বলে ফেলে, এদের এত জিজ্ঞাসাবাদ করে কি হবে। খুনতো আর ওরা করেনি। অন্য কোথাও থেকে মেরে এনে হতভাগাদের লাশ এখানে ফেলে দিয়েছে।

সেকেন্ড অফিসারের কথা শুনে উর্দিপরা অন্য একজন অফিসার (সম্ভবত থানার ওসি হবে) রাগান্বিত হয়ে সেকেন্ড অফিসারকে বলেন, মাসুম তুমি এত কথা বল কেন। এখনও ঘটনার তদন্তই হয়নি। আর তুমি একটা সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলে। ধমক খেয়ে মাসুম নামের অফিসারটি কাচুমাচু হয়ে বলল, সরি স্যার ভুল হয়ে গেছে। এমনটি আর হবে না। এবারের মতো মাফ করে দেন।

-এমনটি হবে না মানে। তোমার মনে নেই, তোমাকে নিয়ে বাস ডাকাতির একটা তদন্ত করতে গিয়ে কি বিপদে পড়েছিলাম। আমি কয়েকজন লোককে ধরে গাড়িতে তুলতে যাব, তখন তুমি বললে, স্যার এদের ধরে কি হবে। ওরাতো আর বাসে ডাকাতি করেনি। যারা করেছে, তারা পালিয়ে গিয়েছে।

-ওরা স্যার নিরীহ মানুষ ছিল। তাই বলেছিলাম।

-চুপ কর।

-আচ্ছা স্যার।

-আচ্ছা স্যার কি আবার? তুমি কোন কথা বলবে না।

-ঠিক আছে স্যার মুখ বন্ধ করলাম।

দু’জনের কথাবার্তায় বুঝা গেল, যে লোকটা মাসুম নামের অফিসারটাকে ধমকাচ্ছে সে তার উর্ধতন কর্মকর্তা হবে।

পুলিশের লোকজন পুরস্কার নদী থেকে লাশ তুলে তাদের সব কাজকর্ম সেরে হতভাগা চারজনের লাশ নিয়ে মর্গে যেতে যেতে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। লাশগুলো যখন নদীরপাড়ে তোলা হলো তখন বিকট গন্ধে কেউ কাছে ঘেঁষতে পারেনি। কেউ নাকে রুমাল দিয়ে, কেউ বা নাকে হাত দিয়ে মৃত মানুষগুলোকে চেনার চেষ্টা করছিল। কিন্তু মৃত ব্যক্তিদের কারও পক্ষে চেনা সম্ভব হয়নি। কখনও তাদের এই তল্লাটে দেখা যায়নি। কয়েকজন সুইপার নাকে-মুখে শরীরে কেরোসিন মেখে এবং গলায় পাগলা পানি (দেশী বাংলা মদ) ঢেলে মাতলামি করতে করতে লাশগুলো পুলিশের গাড়িতে তুলল। বড় অফিসারটি বাজার কমিটির নেতাদের সঙ্গে কি সব কথা বলে এবং একটা কাগজে তাদের টিপ দস্তখত নিয়ে চারটি যুবকের লাশ নিয়ে চলে যায়। মৃত যুবকদের শরীরে কোন কাপড় ছিল না। পুলিশরা বলাবলি করছে, দেখে মনে হয় ওদের শ্বাসরোধ করে কিংবা বিষ প্রয়োগ করে মেরেছে। শরীরে তো কোন জখমের চিহ্ন নেই। যে পুলিশের লোকটা মৃত চার যুবকের সুরতহাল করেছে, সে বাজার কমিটির নেতাদের বলেছে, এখন কিছু বলা যাবে না। ময়নাতদন্ত করলে আসল রহস্য বের হয়ে আসবে। মাসুম নামের সেকেন্ড অফিসারকে যে অফিসারটি ধমকাচিচ্ছল, সেই অফিসারটি গাড়িতে উঠার আগে, জড়ো হওয়া লোকদের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের নেতাদের মতো একটা বক্তব্য দিয়ে সবাইকে আশ্বস্ত করার জন্য বলতে থাকল, আপনারা এখন বাড়ি যান। এসব কিছুই না। দুষ্কৃতকারীরা মাঝে মধ্যে আমাদের আইন-শৃঙ্খলায় ব্যাঘাত ঘটাতে চায়। এমনিতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিকই আছে। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপরাধীদের ধরে ফেলব। বাড়িতে গিয়ে চা-নাস্তা করেন। আপনারা অনেক কষ্ট করেছেন। রাতের খাবার খেয়ে শান্তিমতো ঘুমান। ভয় পাবেন না। দেশে শান্তি বিরাজ করছে।

পুলিশ লাশগুলো নিয়ে যাবার পর শাখাইতি বাজার এখন নীরব। যেসব দোকানপাট রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত খোলা থাকে, সেই দোকানগুলোও সন্ধ্যা রাতে বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশের গ্রামগুলোতেও কোন কোলাহল নেই। শিশুরাও কান্নাকাটি করতে ভয় পাচ্ছে। যুবক, বয়স্করা ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। এই সন্ধ্যা রাতের অন্ধকার আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়ে চারদিকে অন্ধকারের চাদর বিছিয়েছে। তরুণী রাত্রির এই ঘন অন্ধকার গ্রামের বয়স্করাও কখনও দেখেনি। গ্রামে-গঞ্জে যেন অঘোষিত কারফিউ চলছে। কারও মুখে কথা নেই। কথা বলতেও মানুষগুলো ভয় পাচ্ছে। এ অঞ্চলের গ্রামের মানুষ কখনও নদীতে লাশ ভেসে আসতে দেখেনি। তার মধ্যে একটা নয়, দুটি নয়, চার-চারটি লাশ পুরস্কার নদীতে ভেসে এলো কোথা থেকে। এটার তো তেমন স্রোতও নেই। কারও কারও কাছে এটা নদীও নয়। খাল বিশেষ। খালকাটার অভিযানের সময় বড় নদীর সঙ্গে অর্থাৎ খোয়াই নদীর সঙ্গে খালটাকে যোগ করা হয়েছিল।

শাখাইতি বাজারের চারপাশে প্রায় কয়েকদিন থেকেই শ্মশানের মতো নীরব নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কোথাও জনমানবের কোন কোলাহল নেই। মানুষগুলো ভয়ে হাসি-ঠাট্টা করে রাতের খাবারের কথা সব ভুলে গেছে। এখনও শিশুরা কান্নাকাটি করতে ভয় পাচ্ছে। বড়দের মুখে আতঙ্কের ছবি দেখে শিশু বালক-বালিকা আর কিশোর-কিশোরীরাও যেন বুঝতে পেরেছে গ্রামের মানুষের সামনের দিনগুলো ভাল যাবে না। তার মধ্যে আবার অনেক বাড়ি থেকে পুরুষরা উধাও হয়ে গেছে। এক কথায় বাজারের আশপাশের অর্থাৎ পুরস্কার নদীর দু’কূলের গ্রামগুলোর জনমানবের প্রতিদিনের জীবনযাপনের গতিধারায় ছন্দপতন ঘটেছে যেন। মানুষগুলো নির্বাক। সবার মনে আশঙ্কা কখন কাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। এর মধ্যে যারা কোর্ট কাচারিতে আসা-যাওয়া করে মামলা মোকদ্দমার অভিজ্ঞতা আছে, তারা বলে গেছে মুখ বন্ধ করে চলতে। বেশি কথা বললে বিপদে পড়তে হবে। হাটে-বাজারে বসে লাগাম ছাড়া কথা বললে কপালে খারাপি আছে। এখন পুলিশের বাণিজ্যের সময়। উল্টাপাল্টা কথা বললেই পুলিশ মামলায় ফাঁসিয়ে দেবে। পুলিশ যদি একবার কাউকে মামলায় ঢুকাতে পারে তবে তার আর নিস্তার নেই। শুরু“হবে তাদের বাণিজ্য। মামলায় আসামি করে রিমান্ডের ভয় দেখিয়েও পুলিশ পয়সাকড়ি নাকি খেয়ে থাকে। এমন কথাও মানুষ শুনেছে। গ্রামের টাউটারও কম নয়। তারাও পুলিশের ভয় দেখিয়ে গ্রাম-গঞ্জের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে থাকে। শাখাইতি বাজারে ব্যবসা করে কাজী বাড়ির লোকজন প্রায় তিন পুরুষ ধরে। তাদের ছেলে ফরাশ কাজীকে পুলিশ নাকি কি বলেছে। এলাকার চোর বদমাশ ডাকাতদের নাম জানতে চেয়েছে পুলিশের এক লোক। ফরাশ কাজী পুলিশের কথায় ভয়ে ভয়ে বলেছে- আমাদের গ্রামে কোন চোর-ডাকাত বদমাশ নেই। পুলিশ যাবার সময় ফরাশ কাজীকে বলে গেছে থানায় যেতে। এ কথা শুনে গ্রাম্যজীবনে আরও শীতলতা নেমে এসেছে। যেন ঘন কুয়াশার শীতের রাত্রির নির্জনতার মতো ভয়ার্ত নির্জনতা সবাইকে চেপে ধরেছে। ফরাশ কাজী থানায় গেছে কি-না কেউ জানে না। কেবল উত্তরপাড়ার জাভেদ আলীর ছেলে আকবর আলী দেখেছে ফরাশ কাজী ঢাকার গাড়িতে করে কোথায় চলে গেছে। ঢাকার গাড়িতে করে ফরাশ কাজী থানায় যাবে, না ঢাকায় যাবে আকবর আলী জানে না।

গ্রামের মানুষগুলো যেন আজ প্রাণ খুলে কথা বলতে ভুলে গেছে। ভয় তাদের হৃৎপিন্ডটাকে একেবারে ভেতরমুখী করে ফেলেছে। মানুষগুলো যেন শামুকের মতো আচরণ করছে। তারা সঙ্কুচিত হতে হতে প্রাণহীন জড়বস্তুর মতো হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের রহিম বেশি কথা বলে। কথা না বলে এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। সেও যেন বোবা হয়ে গেছে। নতুন কেউ দেখলে অর্থাৎ যারা রহিম মিয়াকে আগে থেকে চেনে না, তারা এখন তাকে দেখলে মনে করবে লোকটা বোধ হয় কথা খুব কম বলে। পৌষের শীতের রাত্রি যেমনভাবে সবকিছুকে স্থবির করে ফেলে ঠিক তেমনি করে গ্রামের মানুষকে পুলিশি আতঙ্ক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মাঝে নিমজ্জিত করে চিরকালের জন্য স্থবির করে ফেলেছে। এর মধ্যে আবার গ্রামের ছেলে জজ কোর্টের নিয়াজ ঊকিল গ্রামের মানুষকে সাবধান করে দিয়েছে। বেশি কথা গ্রামের মানুষ যেন না বলে। এই সময়ে অচেনা মানুষের ঘোরাঘুরি পুরস্কার নদীর আশপাশে বেড়ে যাবে। পুলিশের লোকজন এখন ছদ্মবেশে ঘুরাফেরা করবে। নিয়াজ উকিলের সাবধান বাণী শুনে গ্রামের মানুষ অচেনা কাউকে দেখলেই আরও বেশি করে ভীতু আতঙ্কগ্রস্ত লোকদের মতো কথা বলছে। এক কথায় মানুষের জীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের আনন্দ পুরস্কার নদীতে ভেসে আসা চার-চারটি লাশের অদেখা বিমূর্ত আগুন পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। সবার মনে আজ একই ভয় মন্ত্রী নয়, প্রধানমন্ত্রী নয়, রাষ্ট্রপতি নয়, এখন সকল ক্ষমতা পুলিশের কাছে। পুলিশ যাকে ইচ্ছে ধরতে পারবে। যাকে ইচ্ছে মামলায় লাগিয়ে দিতে পারবে। তারাই পুরস্কার নদীর দু’কূলের গ্রাম-গঞ্জের মানুষের দ-মু-ের কর্তা। পুলিশের দয়ায়ই এখন তাদের বেঁচে থাকতে হবে। এছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই।

রাতের গভীরে ঘন অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কার নদীর দু’কূলের মানুষের জীবনে ভয়াবহ নীরবতা নেমে এলেও উত্তরপাড়ার মুচিপাড়ায় ঠিকই ভাত পচানো বাংলা মদের আসর বসে। সেখানে আশপাশের এলাকার কিছু ভদ্রলোকেরাও আসা-যাওয়া করে থাকেন। রাতের আঁধারে মুখ ঢেকে ঊনারা যান। ভাবেন গ্রামের আর দশজন তা জানে না। অনেক সময় ভাল ভাল মানুষের ছেলেরাও শহরে ফেনসিডিলে আকাল পড়লে এই মুচিপাড়ায় আসে ভাত পচানো বাংলা মদ গলায় ঢেলে অন্তরে নেশার তুফান তুলে নির্লজ্জ আনন্দকে জাগিয়ে তুলতে। পুরস্কার নদীতে যেদিন লাশ ভেসে এসেছিল, তার কয়েকদিন পর থেকেই মুচিপাড়ার কারিগররা তাদের কর্মকা- থেকে অবসর নিয়েছিল। ওরা জানে কোনকিছু ঘটলে পুলিশের প্রথম হামলার তুফান মুচিপাড়ায় বসানো মদের আড্ডার ওপর দিয়েই যায়।

আজ সন্ধ্যাটা খুব সুন্দর। সন্ধ্যা মিলাবার সঙ্গে সঙ্গে বড় থালার মতো হেমন্তের পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে উঠেছে। চারদিকের নীরবতার মাঝে যেন অনেকদিন পর আবার আনন্দের মাদকীয় বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। নীরব নির্জনতায় ভরা প্রকৃতির মায়াময় ছন্দ সবকিছুকে আবার নতুন করে আবৃত করছে। মুচিপাড়ার এই কয়েকদিনের নির্জীব ভাবও কেটে যাচ্ছে। মদ বানানোর কারিগররা গা ঝাড়া দিয়ে আবার তাদের নিত্যদিনের কাজ শুরু করেছে।

মুচিপাড়ার মদের আড্ডায় আজ পাঁচজন মিলিত হয়েছে। তাদের এলাকার সবাই চিনে। এই পাঁচজনের মধ্যে প্রথমজনকে এলাকার মানুষ সিঁধেল চোরের সর্দার বলেই বিবেচনা করে। দ্বিতীয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে রাতের বেলায় যেসব পাগলিণীরা ঘুরে বেড়ায় তাদের যৌন ত্রাণকর্তা। অভাগিণী পাগলিণীদের পেটে সে মানুষ জন্মবার বীজ সুনিপুণভাবে বপন করে থাকে। এছাড়া এই দ্বিতীয়জন কয়েকটি ধর্ষণ মামলারও বিচারাধীন আসামি। তৃতীয়জনকে পুলিশ সময়ে সুযোগ মতো পেলে সন্দেহজনক ব্যক্তি হিসেবে গ্রেফতার করে থাকে। কেননা ওই তৃতীয়জন দিনরাত ছব্বিশ ঘণ্টা বাড়িঘর ছাড়া মানুষের মতো রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়। কখনও রেলস্টেশনে, কখনও বাসটার্মিনালে, কখনও বা দোকানঘরের বারান্দায় ধুলোমাটি কাদায় ঘুমায় কিংবা বিশ্রামের আশায় চিত হয়ে শুয়ে থাকে। যদিও এলাকার মানুষ তাকে পাগল কিংবা মানসিক বিকারগ্রস্ত লোক হিসেবে জেনে আসছে। চতুর্থজন মাঝে মধ্যে মারদাঙ্গা করে। সুযোগ পেলে মেয়েদের গলা থেকে সোনার চেইন ছিনতাই করে থাকে। যদিও সে এই কাজে পাকাপোক্ত নয়। প্রায়ই ছিনতাই করতে গিয়ে মেয়ে লোকের হাতে ধরা পড়ে এবং জনতার গণধোলাই তার কপালে জোটে। ছিনতাই করতে গিয়ে একবার সে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল এবং কয়েকদিন হাজতও খেটেছিল। ওই যে পুলিশের হাতে একবার ধরা পড়েছিল তার রেশ আজও তাকে ভোগ করতে হয়। তার কপাল এতই মন্দ যে, ভাল হবার জন্য পানের দোকান দিয়েও সে ভাল হবার সুযোগ পায়নি। এখনও কোথাও ছিনতাই বা ছোটখাটো চুরি-চামারি হলে পুলিশ মূল আসামিকে না পেলে তাকেই খুঁজতে আসে। ঠিকমতো হাতের কাছে পেলে পাছায় লাথি দিয়ে ধরে নিয়ে যায়। পঞ্চমজনের বিরুদ্ধে একবার রোড ডাকাতির অভিযোগ এনেছিল যথাযথ কর্তৃপক্ষ। তাকেও কোথাও ডাকাতি হলে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়।

ওরা সবাই রঙ্গিলা মুচির ঘরে ভাত পচানো ময়লার গন্ধযুক্ত বাংলামদের আসর বসিয়েছে। ময়লার গন্ধযুক্ত এই মদের নেশাই তাদের সবকিছু থেকে অর্থাৎ দুঃখ-কষ্ট অভিমান থেকে ক্ষণিকের জন্য দূরে সরিয়ে রাখে। এটাই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র বিনোদন। প্রথমজন বাংলামদের নেশায় মত্ত হলেও বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেনি। সে আজকের মদের আসরের বাকি চারজন সাথীকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, তোরা নিশ্চয়ই শুনেছিস পুরস্কার নদীতে চারটি লাশ ভেসে এসেছে। তোরা সবাই সাবধান থাকিস।

প্রথমজনের কথা শুনে বাকি চারজন বলতে গেলে এক সঙ্গে বলে উঠল, আমরা কেন সাবধান থাকব। আমরা কি লাশ হয়ে ভেসে আসা চারজন মানুষকে মেরে নদীতে ভাসিয়েছি। আমাদের কি খেয়ে কোন কাজ নেই।

প্রথমজন বাকি চারজনের কথা শুনে বলল, কে মেরেছে তার বিচার করবে আদালত। আমি, তুই, পুলিশ কেউ বিচার করার মালিক নই। পুলিশের কাজ পুলিশ করবে। কোর্টের কাজ কোর্ট করবে। কাউকে যখন খুঁজে পাবে না, তখন দেখবি আইনের লোকেরা নিজেদের গা বাঁচাবার জন্য তোকে, আমাকে এক কথায় আমাদের মতো সাধারণ মাতালদের এই মামলায় ঢুকিয়ে দিয়েছে।

তৃতীয়জন নেশায় উন্মুক্ত হয়ে চোখমুখ লাল করে বলে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। দেখিস না কোথাও চুরি-চামারি হলেই আমাকে ধরে নিয়ে যায়। কয়েকদিন হাজত খেটে আসি। কয়েকটা দিন মন্দ যায় না। কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে দিনগুলো ভালই কাটে। আমার আর ভয় করে না। পুলিশের এমন আচরণ আমার গায়ে লাগে না। সহ্য হয়ে গেছে।

মদের আড্ডার সঙ্গীদের কথা শুনে চতুর্থজন টিনের গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে প্রচ- রকমভাবে ক্ষেপে গিয়ে বলে উঠে, আজকের এই আনন্দের দিনে মন খারাপ করার কথা বাদ দাও। অনেকদিন পর আমরা আবার মিলিত হয়েছি। আমরা তো জানি আমাদের এই সমাজ একবার পাছায় লাথি দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তুলে হাজতে ঢুকায়। আবার ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে অপরাধী হতে শেখায়।

পঞ্চমজন রঙ্গিলা মুচির কাছ থেকে আরেক গ্লাস মদ চেয়ে নিয়ে বলে, আমাদের মতো সাধারণ অপরাধীর জন্মই তো হয়েছে পৃথিবীর সকল পাপের ভার বইবার জন্য।

প্রথমজন আবার তার মদের আড্ডার সাথীদের উদ্দেশ্য করে বলল, তারপরও বলছি সাবধানে থাকিস। এখন সময় কারও জন্যই ভাল নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের এই পাঁচজন ছাড়া এই নেশার আড্ডা জমে না। প্রথমজনের কথা শুনে বাাক চারজনই একসঙ্গে বলে উঠল, ঠিক আছে। ঠিক আছে। ঠিক আছে। ঠিক বলেছ। ঠিক বলেছ। ঠিক বলেছ।

তার একটু পরেই বন্ধ দরজায় ঠক ঠক ঠক করে তিনটি আওয়াজ হলো। বার বার একই রকম আওয়াজ করে কেউ যেন দরজায় টোকা দিচ্ছে। এখানে পাঁচজনের বাইরে আরেকজন ছিল। তা এই পাঁচজন খেয়াল করেনি। মনে হয় রঙ্গিলা মুচি জানত। সেতো মাঝে মধ্যে পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ করে থাকে। সেই পাঁচজনের বাইরের ছয় নম্বর ব্যক্তিটি মদের আড্ডার পাঁচজনকে উদ্দেশ্য করে বলল, ওরাই, মানে পুলিশ হয়ত এসে গেছে। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। তোমরা পালাবার জন্য কিংবা ধরা পড়ার জন্য তৈরি হয়ে যাও।

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪

২৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: