কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মানবিকতার জয় মনুষ্যহীনতার ক্ষয়

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • সৈয়দা রাজিয়া বেগম

একটি জাতির উৎস এবং পরিচয় তার মানচিত্রে খোদাই হয়ে থাকে। থাকে সে জাতির সত্তা, অন্তরঙ্গ সময় এবং স্বাধীনতার আনন্দ একটি সার্বভৌমত্বে। বলাকার ডানার মতো আকাশে স্বদেশের পতাকা উড়িয়ে, শঙ্খচিলের স্বাধীনতায় কণ্ঠে কণ্ঠে যে সঙ্গীতের দৃপ্ত মূর্ছনা- সে তো আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। বিশ্বের যে কোন কৃতিত্বে যখন বাংলাদেশের নাম শীর্ষে উঠে আসে। তখন তার অহঙ্কারী পরিচয় ফুটে ওঠে পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীতে। জীবন এক পরাক্রম শক্তি। যে শক্তি জগতের সুনির্মল কল্যাণে হয় নিবেদিত। আর এই শক্তি হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ। ব্যক্তিত্ব যখন স্ফুলিঙ্গ হযে ওঠে, তখন কোন ডর, ভয়, সঙ্কোচ, আশাহীনতা মানুষকে স্পর্শ করে না। মানুষ শুধুই এগিয়ে যায় সম্মুখে। রাখে সম্মানের বেদিতে জয়ের ফুল।

পেছন ফিরে তাকালে চোখে ভাসে কালো বাদুড়ের স্পর্ধিত দৌরাত্ম্য। একাত্তরে একটি কাঁচা সবুজ ভূমি পরিপূর্ণ অন্ধকারের বিষণœতায় ছিল নিমজ্জিত। সেই দুঃসহ সময়ে দুর্বার দেশপ্রেমী সৈনিকেরা শুধু জীবন দিয়েই নয়, দুর্জন দুশমনদের জীবন ছিনিয়ে বিতাড়িত করে ভোরের আলো ছড়ানো রক্তলাল সূর্যকে করেছে প্রতিষ্ঠা। সে সূর্য প্রতিদিনের আশার শিখা হয়ে জেগে ওঠে পূর্ব দিগন্তে। ভালবাসা যেখানে এক ঠাঁই। সে ভালবাসার রং একাত্তরÑ সে তো আমাদেরই প্রিয় জন্মভূমি, মাতৃভূমি। দুর্দমনীয় সাহসে সে ভালবাসাই অপলক চোখ রাখতে পারে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তে।

দূরে তেপান্তরের মাঠ ছাড়িয়ে সবুজ প্রান্তর। সুনীল জলের পরশে কত আপন সব নদী। মন জুড়ানো নামের বৈচিত্র্যে নদীগুলো দিনরাত্তির ছড়ায় সোহাগ, সলতে তোলা কুপি থেকে আনন্দের আলো ঝরে ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে। সেই ফুলঝুরি খেলাঘরে দুর্বৃত্ত, কসাই, হত্যাকারীরারা নামায় কালরাত্রি। নদী আর সাগরের স্বচ্ছ জলে অঝোর ধারায় গড়িয়ে নামে রক্তিমধারা। তারপর, অতঃপর ন’মাস সেই রক্তস্নাত জলে বাঁধ দিয়ে মুখ তোলে স্বাধীনতা। স্বাধীনতার সৈনিকরা কণ্ঠে জয়বাংলা, অন্তরে বিজয়ের প্রতিজ্ঞা নিয়ে জেগে উঠেছিল। রক্ত এবং সম্ভ্রমের দরে তারা কেড়ে নিয়েছিল আপন বসতি। নিশ্চিন্ত ভুবন উপহার দিয়েছিল আমদের। সেই যোদ্ধাদের আমরা কখনই ভুলব না। ভুলে যাব না। এমন অঙ্গীকার আমাদের করতেই হবে। সর্বক্ষণ, সর্বসময় প্রীতিময় রূপময় সোহাগে জড়িয়ে রাখে যে মা। সেই মায়ের সন্তানের সাদর শরীর নির্মম, নিষ্ঠুর যাতনায় পিষ্ট করে অসুর দানব। আর অসহায় মা স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় সমগ্র শক্তি বিছিয়ে ছড়ায় শুধু কান্না। জানে না তার কোন প্রতিরোধের উপায়। এইসব দেখে দেখে মায়ের চোখের অশ্রু মুছিয়ে দেশের সব সন্তান হয়ে ওঠে স্বাধীনতার প্রতিজ্ঞায় কঠিন পাথর, তুলে নেয় হাতে হাতিয়ার। কণ্ঠে, চেতনায় ফুঁসে ওঠে প্রতিবাদের অস্ত্র। স্নেহতীর্থে বসবাসী মায়ের দুর্ভাবনা করে দূর। মুক্ত দাওয়ায় বিছিয়ে দেয় স্বাধীনতার আঁচল।

সন্তানের যেমন অভিভাবক, তেমনি জনতার প্রতিপালনের দায়িত্বে থাকেন সরকার। কিন্তু সেই অভিভাবক নামক সরকার যখন হয় অনর্থক স্বেচ্ছাচারী, করে অযথা বলপ্রয়োগ অখন তার ক্ষেত্রটা হয় নৃশংস অধিপতির, বেআইনী বিচারপতির। যা একাত্তরের স্বৈরাচারী সরকার হত্যা, খুনের বাণিজ্যে নামিয়েছিল নরাধম, পাপিষ্ঠদের। যারা গোটা দেশটাকেই করতে চেয়েছিল বধ্যভূমি। করতে চেয়েছিল অঙ্গার। করতে চেয়েছিল নাশকতার কালো আঙ্গিনা। সবকিছুই তারা করেছিল। অমানবিকতার শেষ প্রান্তে যেতেও তাদের হৃদয় কাঁপেনি। কারণ তাদর আত্মা তখন ছিল কালিমালিপ্ত। স্রষ্টার অমোঘ নিয়মের কাছে মানবজাতি দায়বদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ঔদ্ধত্যকারীরা। কিন্তু সময়ের হিসেবে দাঁড়াতে হয়েছে কাঠগড়ায়। আস্ফালন, হুঙ্কার লুটিয়ে পড়ছে এখন ফাঁসির দ-ে। মানবিকতার জয় এখানেই। অনৈতিক মনুষ্যহীনতার এভাবেই ক্ষয়।

কত কষ্টের, কত যন্ত্রণার ইতিকথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট ভূখ-ে। ভোর সকাল। রান্নাঘরের দাওয়ায় পিঁড়ি পেতে, পানি ভাতে নুন, মরিচ মেখে মুখে গ্রাস তুলছে ক্ষেতশিল্পী। মাথায় ঘোমটা টানা লাজবধূ। সারাদিনের পরিশ্রমে কাতর হবে যে মানুষটি তাকে তালপাতার পাখার বাতাসে করে তোল স্নিগ্ধ। চিরায়ত এই ছবি মুছে যায় একাত্তরে। ক্ষেতশিল্পীর হাতের লাঙ্গলের ফলা গেঁথে থাকে মাটিতে। অদক্ষ হাতে তুলে নেয় অস্ত্র এবং চিরকালের জন্য একটি ফুলকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জীবন উৎসর্গ করে পরাজিত করে দানব শক্তিতে। একটি মুখের হাসির জন্য যুদ্ধ করে। লাশ হয়ে যেতেও করে না এতটুকু দ্বিধা। এই হচ্ছে শত দুঃখী বাঙালীর ঋব্ধ অন্তর সুষমা।

একটি দেশ যার মাটি এবং মানুষ ভীষণ স্পর্শকাতর। মাটি যদি কঁকিয়ে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে মানুষও বিহ্বল হয়। একাত্তরে সেই মাটি, যখন জবরদখলের উন্মত্ত হিংস্রতায় অত্যাচারিত। তখনও রক্তের সাগরে ডুবতে ডুবতেও খুঁজছিল নিরাপদ ডাঙার। রেখেছিল মানচিত্রের বিশাল চৌকাঠে একটি বিন্দু হৃদয়ের স্পর্শে তা হয়ে ওঠে সোনাঝরা মাটি। সে নিঃসংশয় বসতির নাম স্বাধীনতা। নতুন, অনন্য স্বদেশের নাম বাংলাদেশ। রক্তের অক্ষরে লেখা এই এক চিলতে দেশটাকে, দেশের অস্তিত্বকে আমরা সম্মান করব, ভালবাসব, আর সে শ্রদ্ধাবোধের প্রীতিময়তা থেকে মনে রাখব, ভুলব না, কখনই ভুলতে পারব না জাগরণী সঙ্গীতের মতো শ্যামল বাংলাদেশকে। মন মাতানো সোনার বাংলাকে।

গ্রহ গ্রহান্তরে কত বিপুল আয়োজন। কত শক্তিমত্তা। সেই অসাধ্য ক্ষমতাকেও জয় করে চলেছে মানুষ। চাঁদে মঙ্গলগ্রহে বসবাসের স্বপ্নও বাস্তবতার নাগালে, হয়ত আগামী ভবিষ্যতে, অনাগত শতাব্দীতে পৃথিবীও হযে যাবে পুরনো, প্রাগৈতিহাসিক শহরের মতো একটি আবাসভূমি। কিন্তু এই পৃথিবীর এক কোণের একটি ছোট্ট-ক্ষুদ্র দেশ বাংলাদেশের সুদূর প্রজন্ম তখনও অহমবোধে উজ্জ্বল হয়ে বলবে আমরা বাংলা মায়েরই সন্তান। এভাবেই জন্মভূমি, মাতৃভূমির প্রতি থাকবে শিকড়ের একান্ত অনুভব, ভালবাসা।

বাঙালীকে সহজে এবং নির্বিগ্নে শ্ঙ্খৃলিত করার অপপ্রয়াস চলে এসেছে যুগে যুগে, কালে কালে, বেহিসেবী অত্যাচারের ভারিপাাথরে থেঁতলে, দুমড়ে মুচড়ে জখম করলেও আবার ক্ষত মুছতে মুছতে জীবনীশক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে আত্মবোধে উজ্জ্বল বাঙালী। শৃঙ্খল ভেঙ্গে সম্মুখে এগিয়েছে। ভেঙ্গেছে নিধুয়া পাথার। শত শত দেশ। কোটি কোটি মানুষ। কত রং। কত উপাচার, চোখ ধাঁধায়। কিন্তু মন জুড়োয় না। এক রত্তি সবুজ দেশ। কেড়ে নেয় হৃদয়। শ্রান্তির দুকূল ছাপিয়ে একটু বিশ্রাম ওই সবুজে। প্রদীপ জ্বলা মনের ঘরে। সব প্রশ্নের একটাই জবাবÑ আমার বাংলাদেশ। সেই ভূমিতে আকাশজুড়ে ছিল কালো চিলের ডানার ঝাপট। সেই দুঃস্বপ্নের, অন্ধকারের অবসানে এসেছে সোনারং ভোর। এবার হায়নামুক্ত হবে সজীব গৃহকোণ। ধীরে ধীরে দূর হবে দারিদ্র্য, অভাব, ভালবাসায় পূর্ণ হবে অঞ্জলি।

এত পরিপূর্ণ নিবেদন। এমন ব্যাকুল করা কৃতজ্ঞতার আরতি। কখনোই আর কোন দেশের কোন নাগরিকই করেছে বলে মনে হয় না। ইতিহাসই বলে দেয় সে কথা। কারণ জড়োসড়ো শীতের রাত উজাড় করে ছেঁড়াকাঁথায় শুয়েও নেই কোন অভিযোগ। বারবারই ওই দেশটির বন্দনায় থাকে মুখর। যে দেশটিতে জন্মেছে সেই দিকটিই যেন এক নক্ষত্র। সে দেশটিই তার মা। একেবারেই অন্যরকম। যান্ত্রিক সভ্যতার রূঢ়তা, কঠোরতা ওখানে নিরিবিলি সেইসব, গাঁয়ে নয় স্পষ্ট। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ। বুনো গন্ধে ব্যাকুল সবুজ প্রকৃতি। শোভিত বর্ণিল প্রজাপতি। অরণ্যের আবাসী পশুপাখি, আর তারই উৎসব মাদলের একটানা মূচ্ছনায়। পাহাড়ী কন্যা হলুদ গাঁদা আর পলাশ ফুলের লাল ছোপ অলঙ্কারে নিজেকে সাজায়। তাল ঠোকে পায়ের নূপুরে। গড়িয়ে পড়ে নিশ্চুপ শব্দরাশি। স্নিগ্ধতার প্রফুল্ল উতরোলে। তারাও হারায় সম্ভ্রম। হারায় আপনজন।

শুভ্র এবং সুন্দর কোনদিন মলিন হয় না। জীবনের ক্ষয় আছে কিন্তু কল্যাণের জাগরণ বয়ে চলে নদীর মতো আপন বেগে। আকাশের মতো অসীম নীলিমা। পাহাড়ের মতো ঔদার্য নিয়ে আমাদের হৃদয়ে ঝঙ্কার তোলে অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের জয়ের বীণায় মুখরিত হয় নক্্শীকাঁথায় জড়ানো দেশপ্রেমী মানুষের অন্তর। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং সম্ভ্রব হারানো নয়, দেশের সম্ভ্রম বাঁচানো সেই সব সূর্যকন্যার জন্য আজও আমাদের চোখে ঝরে উদাস কান্না। এক নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত মানুষ পৃথিবীতে অবস্থান করে। তারপর ফিরে যায় অন্য কোথাও। কারও জানা নেই কোথায় সে গন্তব্য। কই সে ঠিকানা। এভাবে হাজার কোটি বছর আড়াল হয়ে যায় জন্ম এবং মৃত্যুর গতিধারা। এইসব, এতসব মানুষের মধ্যে কিছু কৃতী প্রাণ হয়ে যায় অনবদ্য অমর। মাটির ঘরে ঘুমিয়ে থাকা একাত্তরের অনন্য মুক্তিসেনাদেরও হবে না ক্ষয়। হবে না বিনাশ। অমরত্বের অমরাবর্তীতে তারা হবে অমলধবল শুভ্র মানুষ।

আবহাওয়া এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যে ব্যতিক্রমী একটি দেশ। নিরীহ নির্ঝঞ্জাট একটি জাতি। হাজার হাজার বছর পথ হেঁটেছে শক্ত পায়ে। না, কখনোই মসৃণ ছিল না সে পথ। ছিল দুর্গম, এবড়ো, থেবড়ো। কতবার ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ছিনিয়ে নিয়েছে ঘরের চাবি। করেছে অবরুদ্ধ। শত নির্যাতনেও মুখবুঁজে সহ্য করা সেই মানুষগুলোই অতর্কিতে, চকিতে হয়ে ওঠে বলীয়ান, শক্তিমান। একেবারে রুদ্ররোষে এই জাতিই কাঁপিয়ে তুলল প্রাচীরঘেরা বদ্ধ পৃথিবীকে।

আমাদের বিজয়। আমাদের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি কখন যে অতিক্রম করেছে চার দশকেরও বেশি সময় তার হিসাব মেলানো সত্যিই দুঃসাধ্য এক কর্মকা-। স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা- বাংলাদেশ- যুদ্ধজয়ী অবিচল বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সুখী একটি দেশ হয়ে উঠুক। মনের দিগন্তে আলো ছড়িয়ে, মাস্তুলে দাঁড়িয়ে আলোকবর্তিকার মতো আমাদের শিকড়, আমাদের স্বজন, আমাদের উত্তর প্রজন্ম সর্বক্ষণ তরতাজা থাকুক, সত্য, সুন্দর, কল্যাণ এবং শুভ্রতায় মোহনীয় হোক সবার জীবন। গৌরবের অহঙ্কারে জয়ী একাত্তর, শাশ্বত এবং আনন্দময় বাংলাদেশের জন্য হয়ে থাকবে অনন্তকালের মাইলফলক। পৃথিবী কবে ধ্বংস হবে জানি না। তবে সেই দিনটি পর্যন্ত অক্ষয় এবং অম্লান থাকবে আমাদের দেশÑ বাংলাদেশ।

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪

২৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: