মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

জয়নুল আবেদিন ও বাংলাদেশের শিল্পচর্চা

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪
জয়নুল আবেদিন ও বাংলাদেশের শিল্পচর্চা
  • গণেশ হালুই

কোন ইতিহাসই বিশেষ কোন দিনে বা তারিখে শুরু হয় না। বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাসও ১৯৭১ সালের কোন বিশেষ তারিখে শুরু হয়নি। ইতিহাস সহস্রসূত্রে গাঁথা থাকে। আমরা অতীতে দাঁড়াই, বর্তমানে হাঁটি, ভবিষ্যতের উড়ি- এইভাবে আমাদের জীবনের ধারা বয়। তাই পূর্বসূরিদের গ্রহণ-বর্জনের ভেতর দিয়েই আমাদের চলার গতি অব্যাহত থাকে। ছবি আঁকা দেখেই ছবি আঁকা শিখি- একথা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আত্মীকরণ ও অনুকরণে অনেক তফাত। কারও ছবি দেখে উদ্বুদ্ধ হওয়াতেই আমরা কিছু না কিছু নিজের মতো করে আত্মস্থ করি। অনুকরণ-অনুসরণ করে মাত্র। অনুকরণ-আবরণের মতো আমাদের ঢাকে। কিন্তু আত্মীকরণে অভিসিক্ত হই। তাই যে কোন যুগের, যে কোন রাসোত্তীর্ণ ছবিতে আমরা মুগ্ধ হই। তখন প্রাচ্য, প্রতীচ্য কিংবা পাশ্চাত্যের মধ্যে পার্থক্যের কোন ভেদ থাকে না। বিনিময়ের অভ্যন্তরীণ স্রোত বইতে থাকে।

যেমন- আমরা শিশু অবস্থা থেকে পৌঢ়ত্বের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। ভিন্নতার মাঝে অভিন্ন হয়ে থাকি। তাই আজ বাংলাদেশের সমকালীন যে শিল্প প্রবাহ তার উৎস সন্ধানে আমরা জয়নুল আবেদিনকে পাই। কেমন করে পাই- আজ তাঁরই ৯০তম জন্মতিথিতে মূল্যায়ন করার দিন। মূল্যায়নের পথ ধরে পুনরায় উদ্দীপ্ত হওয়ার দিন।

আমার কাছে জয়নুল আবেদিন একজন দ্বিধাহীন, অবিচলিত, দৃঢ় প্রত্যয়ে ভরপুর, অত্যন্ত আত্মসচেতন নির্ভেজাল মানসিকতার মানুষ। বিশুদ্ধ মাটির মানুষ। ‘মাটির টান’ কথাটি আমাদের কাছে বড় তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রকৃতিতে ছোটবেলার কৌতূহলী দৌরাত্ম্য কৈশোরের হেঁয়ালিপনা-যৌবনের পালে প্রত্যয়ের বুনিয়াদ, কল্পনার বিস্তার- প্রৌঢ়ত্বের প্রজ্ঞা সব মিলেমিশে যে টানের সঞ্চার হয়- সেখানে কোন জাতিভেদ, ধর্ম, ছোট-বড়’র বিচার থাকে না; প্রিয়-অপ্রিয় ব্যবধানে থাকে না। এই টানেই যাকে অবহেলায় পাশে ঠেলে রেখেছিলাম অনেকদিন- তাই রাত্রির অন্ধকারে প্রজ্বলিত শিখার মতো পরিস্ফুট হয়। আমরা মায়া-মমতায় আচ্ছন্নগ্রস্ত হই এবং এ রূপ ঘোর আচ্ছন্নতা থেকেই একটি বিশুদ্ধ জাতীয়তাবোধ আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। যেখানে সেই খাঁটি মাটির গন্ধ থাকে। এই মাটির টানেই উদ্ভূত যে জাতীয়তাবাদ- সেই জাতীয়তাদের আহ্বানেই আমরা নির্ভীক প্রতিবাদমুখর হই। আর যে প্রতিবাদের সম্মুখীন হতে দেখি জয়নুল আবেদিনকে।

তাঁর জীবনবোধের দুটো দিক আমরা প্রত্যক্ষ করি। প্রথমটি ধর্ম-নিরপেক্ষতা ও দ্বিতীয়টি হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। তিনি কলকাতা থাকাকালীন ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পীসংঘের সদস্য ছিলেন। দেশ বিভাগের সময় ১৯৪৭ সালেই ছোটদের ‘পয়ারে বালা কল্যাণী দত্তের কৃত্তিবাসী রামায়ণের জন্য রামচরিত কথা চিত্রিত করেন। এখানেও দেখি তাঁর বলিষ্ঠ ছন্দিত নিশ্চিত রেখা।’ সে দিনের নিদারুণ দুর্ভিক্ষের দলিলের যে বলিষ্ঠ রেখা তাই বার বার ফিরে আসতে দেখি তাঁর পরবর্তী অনেক ছবিতে। যে রেখাগুলোতে তাঁর দৃঢ় নিশ্চিত প্রত্যয়ের স্বরূপ উদঘাটিত হয়। আসন্ন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ‘দুই মুখ’ আঁকা তারুণ্যের ছবিতেও যা স্পষ্টত বর্তমান।

জীবনের পথে- কিছু দেখা-পড়া-শোনা, আজীবন আমাদের মধ্যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। আমিও জয়নুল আবেদিনের মতো বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলারই ছেলে। পড়তাম জামালপুর সরকারি হাইস্কুলে। সেখানেই পেয়েছিলাম আমার মাস্টার মশাই ‘নায়েব আলী’ স্যারকে। তিনি বলতেন সারাদিনে অন্ততপক্ষে একটা ভাল কাজ করবি- দেখবি ভাল লাগছে। যেমন : হাটে-বাজারে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে যারা আসে তাদের মাথায় যে বোঝা থাকে তাই তুলতে-নামাতে হাত লাগাবি। অন্ধ যারা রাস্তা পার করাবি। এমনি ছোটখাটো কাজ। ‘গফুর মিঞা’ যিনি ড্রিল করাতেন; ড্রইংয়ের ক্লাসও নিতেন। ক্লাসে এসেই যীশুর ক্রুশের মতো ব্ল্যাক বোর্ডে সাদা খড়িতে একটি বড় আকারের ক্রস আঁকতেন। বলতেন, জানিস, এটা যে কোন জিনিসের মেরুদ-। এই বলে তিনি বাঁ-দিক, ডান-দিকে, নিচে-উপরে, প্রতিসম আঁকর কেটে অনায়াসে কখনও গ্লাস, চায়ের কাপ, পেয়ারা, লাউ, মানুষের মুখ ইত্যাদি ম্যাজিকের মতো এঁকে দেখাতেন। এখন বুঝি যে কোন ছবির সত্য সত্যই একটা মেরুদ- আছে। তা নাহলে সে বিকলাঙ্গ হয়। কলকাতার বুকে ফুটপাথে আজও যখন ছুড়ে ফেলা কলার খোসা, ইটের ছাই পা দিয়ে সরিয়ে ফেলি- নায়েব আলী স্যার এখনও সে কাজ করিয়ে নেন।

তেমনি শিল্পী অবনীন্দ্রনাথের কথা ‘প্রকৃতির নিয়মও মানা হচ্ছে না, অথচ প্রকৃতিকে বাদ দিয়েও চলা হচ্ছে না।’ ... ‘মানুষের মধ্যে ডুব দিয়ে তা বিদ্যমানের মধ্যে বিদ্যমানকে ধরলেÑ সে হলো শিল্পী। ‘শাহাজাহানের মৃত্যু’ তাঁর আঁকা ছবিটি সম্পর্কে বলছেন, মেয়ের মৃত্যুর যত বেদনা বুকে ছিল সব ঢেলে দিয়ে সেই ছবি আঁকলুম।’

আর্ট কলেজ থেকে অবসর নেয়ার সময় ‘সুনীল দা’ (ভাস্কর সুনীল পাল) প্রফেশন- কাকে বলে এই নিয়ে একটা কথা বলেন ‘একটি মন্দির নির্মাণে কাজ হচ্ছে। অনেক শিল্পী কারিগর কাজ করছেন তাতে দিনরাত। ঠিকাদার মাঝেমধ্যে তদারকিতে আসেন। একদিন দেখেন দেয়ালসংলগ্ন প্রায় একটি থামের পেছন দিকটায় অতিকষ্টে একজন কারিগর ছেনি দিয়ে নক্সার কাজ তুলছেন। তিনি কারিগরটিকে বললেন, থামের ওই দিকটায় কে দেখতে যাবে এই কাজ। ঠিকাদারের এই প্রশ্নে উত্তরে কারিগর বললেন, আর কেউ না দেখুক- উপরে ঈশ্বর আছেন, তিনি তো দেখবেন আমি আমার কাজে কোথাও ফাঁক রাখিনি। সুনীল দা বললেন, একেই বলে সত্যিকারের প্রফেশন, যেখানে নিজের কাজের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা-নিষ্ঠা ও সততা একাগ্রীভূত হয়।

কথগুলো এখনে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও আমার কাছে প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, পঞ্চশ দশকে আমি যখন আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলাম সেই সময় ঠিক এভাবেই আমার জীবনে যিনি গভীর ছাপ ফেলেছিলেন তিনি শিল্পী জয়নুল আবেদিন। ছবিগুলো যেন আমার মাতৃভূমির প্রতি ভালবাসার আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছিল আমার সম্মুখে। যে ছবি আমি আজও ভুলিনি। তার একটি জলরঙে রেখাধর্মী কাজ ক্ষেতে ‘মই দেয়া’, অন্যগুলো বাঁধন ছিঁড়ে ফেলায় উদ্যত ‘গাভী, প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে থমকে থাকা সময়ের মতো ফেরির জন্য অপেক্ষমাণ পিতা-পুত্রের দৃশ্য। ‘কালবৈশাখীর’র ঝড়। এই রকমই দিগন্তের কালো ধূম্রপুঞ্জের মতো ধেয়ে আসা ঝড়ের সঙ্কেতে মাঠ পেরিয়ে পালানোর ছোঁয়া লেগেছিল সেই ছবিতে। যে ছোঁয়াতে আজও আমি জয়নুল আবেদিন থেকে অভিন্ন হয়ে আছি। যার জন্য আমার মনে এখনও সেই মাটির গন্ধ পাওয়ার কান্না থাকে। আমিও জন্মে ছিলাম ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে।

সম্ভবত ১৯৭৩ সাল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ভারতে আসেন। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানজনক ডিগ্রী লাভ করেন। সেই সময় তিনি কলকাতাতেও আসেন। সঙ্গে ছিল ৩০ ফুট দীর্ঘ ‘মনপুরা ৭০’ নামে আঁকা সামদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে মুড়ি-মুড়কির মতো মৃত্যুর কোলে ঢলেপড়া আকীর্ণশবের সমন্বিত হাহাকার। আমার মনে হয় শিল্পী জয়নুল আবেদিনের জীবনে এত মৃত্যু ও মৃত্যুর মুখোমুখি বাঙালীর অসহায়তার ছবি আর কেউ আঁকেনি। ছবিটি সেদিন একাডেমি অব ফাইন আর্টসের প্রদর্শনী কক্ষে প্রদর্শিত হয়। সেদিন আমার প্রথম ও শেষ দেখা জয়নুল আবেদিনকে।

সেবার আমাদের কলেজের প্রিন্ট-মেইকিং ঘরে একটা বড় লিথোস্টোনের ওপর মোটা বলিষ্ঠ রেখায় একটি তারুণ্যের মুখছবি এঁকেছিলেন। যার সঙ্গে মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আঁকা দুই তারুণ্যের আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়। ছবিটি কলেজের সংগ্রহে আছে।

দেশে ফেরার মতো কলকাতার প্রতিটি জিনিস শোনা ও দেখার প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর। গেলেন সোসাইটি অফ কন্টেম্পরারি আর্টিস্টদের ঘরে। ঘরটি একটি ভাঙাচোরা পুরনো বাড়িতে। পাঁচমিশালি বাজারের মতো নানা ধরনের কাজ হয় সেখানে। খাড়া সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ছোট্ট পরিসরের ঘর। তাতেই ছিল ছাপাই ছবির মেশিন ও যাবতীয় সরঞ্জাম। যে সোসাইটি এখান থেকেই ভারতে প্রথম উৎকৃষ্টমানের ছাপাই ছবির ভূমিকা নিয়েছিল। জয়নুল আবেদিন মুগ্ধ হয়ে দেখলেন। উল্লসিত হয়ে বললেন, আমাদের ছেলেরা বিদেশের মতো সুবিধা না পেয়েও এমন উৎকৃষ্ট কাজ করতে পারে, তিনি অবাক হন!

১৯৯৩ সাল। পঞ্চাশের মন্বন্তরের পঞ্চাশ বছর। এই উপলক্ষে আমি ও নিখিল বাবু (সম্প্রতি প্রয়াত নিখিল সরকার, লেখক ‘শ্রীপান্থ’ নামে পরিচিত) ‘দায়’ নামে একটি ছোটগোষ্ঠী করে মন্বন্তরের ওপর ভারতীয় জাদুঘরের ‘আশুতোষ শতবার্ষিকী হল’-এ (৩ থেকে ১০ অক্টোবর, ১৯৯৩) একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করি। ছবি ছাড়া সঙ্গে তৎকালীন বিস্তর লেখালেখির সংগ্রহ ও দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে প্রাপ্ত মর্মান্তিক স্থিরচিত্র। এই উপলক্ষেই জয়নুল আবেদিনের স্ত্রী জাহানারা আবেদিনকে অতিথিরূপে আহ্বান জানাই, তিনি সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে কলকাতা এসেছিলেন। সঙ্গে এনেছিলেন জয়নুলের দুর্ভিক্ষের ওপর আঁকা দুটো মূল কাজ ও একটি ছাপাই করা এ্যালবাম। স্বভাবতই প্রদর্শনীতে অন্যান্য ছবির মাঝে এই ছবিগুলো প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠে। এই প্রদর্শনীর ওপর ভিত্তি করে নিখিল বাবু ‘দায়’ নামে তথ্যমূলক একটি বই লেখেন। যাতে প্রকাশিত সব ছবিই ছাপা হয়।

ঢাকা শিল্পাঙ্গনের কর্ণধার জনাব ফয়েজ আহমেদও আমাদের অনুরোধে কলকাতায় এসেছিলেন। এই প্রদর্শনীর মূলদ্বারে একটি কাঠের পাটাতনে তপ্ত লোহার শলকায় পুড়িয়ে বড় বড় অক্ষরে ভাস্কর রামকিঙ্করের একটি মর্মস্পর্শী লেখা আমরা লিখেছিলাম।

লেখাটি এই রকমÑ ‘প্রত্যক্ষ রাজনীতির কথা বুঝি না, এত দ্রুত ভোল বদলায়। কিন্তু শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি কিছু না কিছু দায়িত্ব বর্তে যায়ই। যিনি শিল্প করেন, তিনিও তো একজন মানুষ, সামাজিক জীব। এবং তাঁর সব জাগতিক এবং আত্মিক অনুভূতি। সুতরাং দাঙ্গা, দেশ বিভাগ, মন্বন্তর যুদ্ধ, যেখানে যত মানুষের প্রতি অপমান, শিল্পীকে আন্দোলিত করবেই। রবীন্দ্রনাথ বার বার আন্দোলিত হয়েছেন। যে কোন মহান শিল্পীই হবেন। শিল্পীদের উচিত তাই আলোর কথা, ক্লেদ উত্তীর্ণ জগতের, জীবনের কথা ঘোষণা করা।’

মানুষের প্রতি অপমানে রামকিঙ্করের মতো শিল্পী জয়নুল আবেদিনও ক্লেদ মুক্ত জগত ও জীবনের কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আজও আমরা এপার-ওপার দুই-বাংলার বাঙালী যারা ‘আক্যাইলা’ ‘দুইখ্যা’ হয়েই রইলাম। আজ এই মহান শিল্পীর ৯০তম শুভ জন্মবার্ষিকীতে আসুন সব ভেদাভেদের উর্ধে বাঙালী জাতির সার্বিক মঙ্গল কামনা করি।

সূত্র : শিল্পকলা ষাণ্মাসিক বাংলা পত্রিকা

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪

২৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: