মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

তরুণ শিল্পীদের চোখে শিল্পাচার্য

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪
তরুণ শিল্পীদের চোখে শিল্পাচার্য
  • অঞ্জন আচার্য

রুহুল করিম রুমী

প্রভাষক, চারুকলা ইনস্টিটিউট

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দূরদর্শী চিন্তার ফসল আজকের আমাদের এই চিত্রকলা। অগণিত কাজ করার অদম্য সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও খুব বেশি কাজ করেননি তিনি। তিনি কাজ করে গেছেন চিত্রকলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে, চিত্র-আন্দোলনে। তবে তিনি যা এঁকে গেছেন তার শক্তি অসীম। তাঁর রেখার শক্তিময়তা এখনও আমাদের আন্দোলিত করে। তাঁর প্রতিটি শিল্পকর্ম এখন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথের একটি কথা আছেÑ সহজ কথা যায় না বলা সহজে। সেই কাজটিই স্যার করতে পারতেন সাবলীলভাবে। তাঁর চিত্রকলায় ছিল সরলীকরণের ছাপ, যার সৌন্দর্য আমাদের বিস্মিত করে আজও।

গৌতম ঘোষ

তরুণ চিত্রশিল্পী

শুধু ছবি এঁকে আপামর গণমানুষের কাছে পৌঁছানো যায় কিনা আমার জানা নেই। তবে জয়নুল আবেদিন তা পেরেছেন। আমার কাছে তাঁকে মনে হয় একটি প্রকা- বটগাছ, যার ছায়াতলে আশ্রয় নিতে পারেন উত্তরপ্রজন্মের প্রতিটি শিল্পী। আমি মনে করি, তাঁর শক্তি এমনই যে, তাঁর আঁকা দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা, বিদ্রোহী, মনপুরা কিংবা নবান্ন চিত্রকর্মগুলো বাদ দিলে বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস শিকড়-হারা হয়ে পড়বে। তাঁর প্রত্যেকটি ছবিতে প্রচুর শক্তি আছে, অনেক মায়া আছে।

আমজাদ আকাশ

চিত্রশিল্পী, লেখক

জয়নুল আবেদিন হচ্ছেন আমাদের নায়ক। বাংলাদেশ তথা বাংলার চিত্রকলার পুনর্জাগরণে তাঁর ভূমিকা অল্প কথায় বলা সম্ভব নয়। ব্রিটিশপরবর্তী পাকিস্তান শাসনামলে নানা প্রতিবন্ধকতায় তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে একটি শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুভূত হয়। শিল্পাচার্যের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পুরান ঢাকার জনসন রোডের ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের একটি জীর্ণ বাড়িতে মাত্র ১৮ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু হয় গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউটের। তিনি ছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানের প্রথম শিক্ষক। ১৯৫১ সালে সেটি স্থানান্তরিত হয় সেগুনবাগিচার একটি বাড়িতে। ১৯৫৬ সালে গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট শাহবাগে স্থানান্তর করার পর ১৯৬৩ সালে সেটি একটি প্রথম শ্রেণীর সরকারী কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তখন এর নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় নামে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় নামে পরিচিতি পায় সেটি। ১৯৪৯-১৯৬৬ সাল পর্যন্ত জয়নুল আবেদিন দায়িত্ব পালন করেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে। ১৯৮৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর এই সরকারী কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। এতসব কাজ কিন্তু একদিনেই ঘটে যায়নি। এর জন্য শিল্পাচার্যকে মেনে নিতে হয়েছে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা। ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা লাভের লোভ তাঁর ছিল না। তিনি তাঁর সমগ্র জীবন ব্যয় করেছেন দেশ ও জাতির কল্যাণে, শিল্পের বিকাশে। বাঙালীর মুক্তি আন্দোলনের পুরোধা এ মানুষটি আমাদের আদর্শ। সংস্কৃতি মানুষের মানসিক বিকাশের হাতিয়ার। আর এ বিকাশের কাজটিই করে গেছেন তিনি।

চারু পিন্টু

চিত্রশিল্পী

বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে প্রথমেই যাঁর নাম বলতে হয়, তিনি হলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। বাংলাদেশের তথা বাংলার চিত্রকলার তিনি পথিকৃৎ। একসময় বাংলাদেশে চারুকলার কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। সেসময় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা-কেন্দ্রিক ছিল এ বিষয়ক শিক্ষা-দীক্ষার সকল কার্যক্রম। আমি মনে করি, শারদীয় দুর্গাপুজোয় যেমনভাবে দেবীপ্রতিমাকে বোধনের মধ্য দিয়ে চক্ষুদান করা হয়, তেমনই বাংলার চিত্রকলার চক্ষুদান করেছেন শিল্পাচার্য। চিত্রকলায় তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা বাংলার পরবর্তী হাজার বছরেও টিকে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। তৎকালীন মুষ্টিমেয় কয়েকজন চিত্রশিল্পীর মধ্যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন অগ্রদূত। তাঁর কাজ অত্যন্ত শক্তিশালী ও ধারালো। রেখার টানে ক্ষুধার্ত মানুষের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি। শিল্প ও শিল্পীদের বোধ তৈরিতে কাজ করেছেন তিনি, যা অটুট থাকবে বহুকাল। তাছাড়া বইয়ের প্রচ্ছদে তিনিই প্রথম বাংলাদেশে স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন, অম্লøান থাকবে তাও।

আবু হাসান

তরুণ শিল্পী ও কার্টুনিস্ট

বাংলাদেশের চিত্রশিল্পীদের শিল্পচর্চার ক্যানভাসটা শিল্পাচার্যের কঠিন সংগ্রামের ফসল। দেশের শিল্পকলা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদাতা তিনি। তাঁর প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সোনারগাঁয়ে লোককারুশিল্প ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির কাজ লোক ও কারুশিল্প সংগ্রহ, প্রদর্শন, সংরক্ষণ ও গবেষণা। বাঁশ, বেত, মাটির তৈরি জিনিসপত্রের উৎপাদন ও ব্যবহার ইদানীং কমে যাচ্ছে। দিন দিন বেড়ে চলেছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। কুটিরশিল্পের সঠিক ব্যবহার ও উৎপাদন নিশ্চিত করলে পরিবেশবান্ধব জিনিসপত্রের ব্যবহার সুদৃঢ় হতো। নিত্যপণ্যের জায়গা দখল করা প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস করতে শিল্পচার্যের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। না হলে তাঁর স্বপ্নের কুটিরশিল্পে প্লাস্টিকের রাজত্ব কায়েম হবে। শিল্পগুরুর জন্মশতবর্ষে স্মরণ করছি বিনম্র শ্রদ্ধায়।

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪

২৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: